মত-বিশ্লেষণ

অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে রফতানি শুরু

আবুল কাসেম হায়দার: দেশের রফতানি খাতকে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর জন্য সরকার ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। দেশের শিল্পবিপ্লবকে সফল করার জন্য এই উদ্যোগ সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ ধরনের উদ্যোগ বহু আগে নেওয়া হয়েছে এবং ওইসব দেশ বেশ সফলতাও অর্জন করেছে, যা সময়োপযোগী।
বিনিয়োগে সুখবর দিচ্ছে দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনটি সরকারি ও ১০টি বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে মোট এক হাজার ৭৮৫ কোটি মার্কিন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি।
বিনিয়োগকারীরা সরকারি তিনটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৭৭টি কোম্পানি-নির্ধারিত ইজারামূল্যে জমি নিয়ে কেউ কারখানার কাজ শুরু করেছে, কেউ জমি হস্তান্তরের অপেক্ষায় আছে। সে তুলনায় বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো এগিয়ে। সেখানে ৩৯টি কোম্পানি বিনিয়োগের জন্য জমি নিয়েছে এবং ২০টি এরই মধ্যে উৎপাদন শুরু করেছে। চারটি অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে পণ্য বিদেশে রফতানিও শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত রফতানি হয়েছে ১০ কোটি ডলার। সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো বিনিয়োগকারীদের জমির সমস্যা কমিয়ে দিয়েছে। বিনিয়োগকারীরা অর্থনৈতিক অঞ্চলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সেবা সংযোগ এবং অবকাঠামোর নিশ্চয়তা পাচ্ছে।
সব মিলিয়ে সরকার ২০৩০ সাল নাগাদ ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির লক্ষ্য ঠিক করেছে। বেজা জানিয়েছে, এখন জোরেশোরে কাজ চলছে ২৮টির। এর মধ্যে ১৩টি সরকারি খাতে। বেসরকারি খাতে ১৫টি। অবশ্য বেসরকারি খাতে ১০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল চূড়ান্ত লাইসেন্স পেয়ে জমি বরাদ্দ ও বিনিয়োগ নিতে পারছে। অন্যদিকে সরকারি খাতে তিনটিতে এরই মধ্যে জমি বরাদ্দ শুরু হয়েছে, দুটিতে বরাদ্দের আবেদন নেওয়া হচ্ছে।
বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী বলেন, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জমি পাওয়ার দুর্ভোগ আর থাকবে না। বেজার হাতে এরই মধ্যে ৫০ হাজার একরের মতো জমি এসেছে। তিনি বলেন, ‘এখন যে বিনিয়োগ আসছে, সেগুলো শুধু প্রস্তাব নয়, বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে তারা জমি নিচ্ছে। এর বাইরে প্রচুর প্রস্তাব আছে। আমাদের এখন সহায়তা ও নীতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করে বিনিয়োগকারীদের কারখানা করার বিষয়টি নিবিঘœ করতে হবে।’
কোথায় কত বিনিয়োগ
চট্টগ্রামের মিরসরাই, সীতাকুণ্ড ও ফেনী ঘিরে ৩০ হাজার একর জমি গড়ে তোলা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে। সেখানেই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। বেজার হিসাবে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে এখন পর্যন্ত বিনিয়োগ প্রস্তাব এক হাজার ২৩৯ কোটি ডলারের। এতে জমি নিয়েছে ৬৯টি প্রতিষ্ঠান। মহেশখালী অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমি নিয়েছে দুটি প্রতিষ্ঠান। তাদের বিনিয়োগ প্রস্তাবের পরিমাণ ২৪৮ কোটি ডলার। অন্যদিকে শ্রীহট্ট অর্থনৈতিক অঞ্চলের পুরো জমি নিয়ে নিয়েছে ছয়টি প্রতিষ্ঠান। তাদের মোট বিনিয়োগ প্রস্তাব ১৩১ কোটি ডলার।
বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলের ছয়টিতে বিনিয়োগকারীরা কারখানা করছে। এর মধ্যে মেঘনা ইকোনমিক জোনে ১০টি, মেঘনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনমিক জোনে ১৫টি, সিটি ইকোনমিক জোনে ছয়টি, আবদুল মোনেম ইকোনমিক জোনে একটি, আমান ইকোনমিক জোনে পাঁচটি ও বে ইকোনমিক জোনে দুটি কোম্পানি কারখানা করছে। ৩৯টির মধ্যে উৎপাদন শুরু করেছে ২০টি কারখানা।
বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর সমিতির আহ্বায়ক ও আবদুল মোনেম ইকোনমিক জোনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএসএম মাইনুদ্দিন মোনেম বলেন, আমাদের কাছে প্রায় প্রতিদিনই বিনিয়োগ প্রস্তাব আসছে। তবে অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়নে আমরা অনেক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছি। বেজার মতো সরকারের অন্য সংস্থাগুলো সহায়তায় এগিয়ে এলে কাজটি সহজ হতো। কিন্তু মাঠপর্যায়ে অনেক কিছুই আটকে যাচ্ছে।
বিনিয়োগকারী দেশি-বিদেশি বড় প্রতিষ্ঠান
অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিনিয়োগের জন্য জমি নিয়েছে বিদেশি বেশ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রয়েছে জাপানের হোন্ডা মোটর করপোরেশন, দক্ষিণ কোরিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম কোম্পানি এস কে গ্যাস, বিশ্বের তৃতীয় বড় ইস্পাত উৎপাদক প্রতিষ্ঠান জাপানের নিপ্পন স্টিল, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে খেলনা রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান মেইগো লিমিটেড, ভারতের আদানি ও সিঙ্গাপুরের উইলমারের যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এডিবল অয়েল লিমিটেড, রং উৎপাদনকারী বার্জার ও এশিয়ান পেইন্টস, যুক্তরাজ্যের ইউরেশিয়া ফুডস এবং চীনের বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।
দেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এসিআই, পিএইচপি, বিএসআরএম, অনন্ত গ্রুপ, ডিবিএল গ্রুপ, এনার্জি প্যাক, সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট, বসুন্ধরা, টিকে গ্রুপসহ অনেক প্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমি নিয়েছে। দেশে অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন পাস করা হয় ২০১০ সালে। তবে শুরুতে কাজ তেমন কিছুই হয়নি। গতি পায় মূলত ২০১৫ সালে। বেজা জানিয়েছে, এখন সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে ভূমি উন্নয়ন, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবস্থা করা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে। বেজা বলছে, ২০২০ সাল নাগাদ বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর, মহেশখালী, শ্রীহট্টসহ কয়েকটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রচুর কারখানা নির্মাণ শুরু হবে। এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে ছয়টি কারখানার নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে।
সমান সুযোগের পরামর্শ
শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (আঙ্কটাড) ‘ট্রান্সন্যাশনাল করপোরেশনস’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৮৬ সালে বিশ্বের ৪৭টি দেশে ১৭৬টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) ছিল। এখন সেটা বেড়ে ১৪৭টি দেশে পাঁচ হাজার ৪০০টিতে উন্নীত হয়েছে।
এতে আরও জানানো হয়, ভিয়েতনাম ৩০০টির বেশি এসইজেড করার পর এখন সমন্বিত এসইজেড তৈরিতে নজর দিয়েছে। শ্রীলঙ্কা চারটি এসইজেড তৈরির জন্য ২৫০ কোটি রুপি বরাদ্দ দিয়েছে। মিয়ানমার চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বন্দর ও এসইজেড তৈরি করছে। ভারতের ৩০০টিরও বেশি এসইজেডে বিনিয়োগ টানার চেষ্টা হচ্ছে।
বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য জমি পাওয়া খুব কঠিন ও দীর্ঘসূত্রতার বিষয়। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জমির সমস্যা দূর করবে। পাশাপাশি অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, অবকাঠামোর অভাব ও পরিবেশদূষণের সমস্যা থেকেও মুক্তি পাওয়ার আশা করা যায়। তিনি বলেন, ‘আমি আশা করছি, অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিদেশি বিনিয়োগ বেশি আসবে।’
অর্থনৈতিক অঞ্চলে অভ্যন্তরীণ বাজারমুখী বিনিয়োগকারীদের বাড়তি করছাড় সুবিধা না দেওয়ার ফলে, জমি ও অবকাঠামোই বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করবে। বাড়তি করছাড় সুবিধা দিলে অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাইরের বিনিয়োগকারীদের জন্য সমান সুযোগ থাকবে না।
আরও কিছু উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন
১. দেশে সরকরি ও বেসরকারি উদ্যোগে ১০০টি রফতানি শিল্পাঞ্চল স্থাপনের পর শিল্পবিপ্লবের চমৎকার পরিবেশ সৃষ্টি হবে। বিনিয়োগকারীদের সহজে উপযুক্ত জমি সংগ্রহ করতে আর কষ্ট করতে হবে না। কম খরচে সব অবকাঠামোগত উন্নয়নসম্পন্ন শিল্পজমি দ্রুত সময়ের মধ্যে পাওয়া যাবে, যা উৎপাদন খরচকে কমিয়ে আনবে। যেখানে-সেখানে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও বেশ হ্রাস পাবে। দেশের পরিবেশও বেশ উন্নত হবে।
২. শুধু ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল নয়, পুরো দেশকে একটি বৃহৎ পরিকল্পনার আওতায় নিয়ে আসার জন্য বৃহৎ রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। আমাদের ভূমি খুবই কম, কিন্তু জনসংখ্যা অনেক। আমাদের জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভূমি বৃদ্ধি খুবই সামান্য। বরং নদীভাঙনে ভূমি কমে যাচ্ছে। এ জন্য ভূমি ব্যবহারে সুনিদিষ্ট নিয়ম না থাকলে ভবিষ্যতে দেশের অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে।
তাই পুরো দেশকে একটি পরিকল্পনার আওতায় আনা প্রয়োজন। এটি একটি বৃহৎ পরিকল্পনা হবে। হওয়া প্রয়োজন। আমাদের বর্তমানে ৫৫ হাজার বর্গমাইল ভূমিতে কোথায় কী হবে, ঠিক করে নিতে হবে। এলোপাতাড়ি স্থাপনা স্থাপন কোনো উন্নত দেশের কাজ নয়। ৬৪টি জেলাকে এই পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। যেমন আমরা ঢাকাকে রাজউকের আওতায় এনেছি। সরকারের পরিকল্পনানুযায়ী ঢাকা শহর গড়ে উঠেছে। সেভাবে পুরো দেশ পরিকল্পনার আওতায় নিযে আসা প্রয়োজন। তাতে থাকবেÑদেশে কোথায় কতটুকু জায়গা নিয়ে বাসস্থান হবে, কোথায় শিল্পস্থাপনা হবে, কোথায় কৃষি জমি থাকবে, কোন স্থান খালবিল-নদীনালার জন্য নির্দিষ্ট থাকবে, কোথায় রেললাইন ও রাস্তা হবে প্রভৃতি। এর ফলে যখন-তখন যেখানে-সেখানে স্থাপনা গড়ে উঠতে পারবে না। তাতে পরিকল্পনামাফিক দেশ গড়ে উঠবে। সমতা, প্রয়োজন ও চাহিদা অনুযায়ী ৬৪টি জেলা এগিয়ে যাবে। জনসংখ্যার ভারসাম্যও রক্ষা পাবে। এই বৃহৎ পরিকল্পনাটি প্রধানমন্ত্রীকে গ্রহণ করার জন্য বিনীত অনুরোধ করছি। আমি বিভিন্ন সময়ে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতে প্রকল্প গ্রহণের অনুরোধ করেছি, কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রকল্পটি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ আকারে উত্থাপিত হয়নি। এই নকশা না থাকায় রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে নদী দখল, ভূমি দখল ও যেখানে-সেখানে স্থাপনা গড়ে তোলা সুবিধাবাদীদের নিয়মে পরিণত হয়েছে। দেশের খালবিল ও নদী ভরাট করে দখলবাণিজ্য চলছে। উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে সরকারি জমি, নদী ও খাল উদ্ধার করার কিছুদিন পর আবার তা আগের অবস্থায় ফিরে যায়।
৩. মাত্র ১০০টি শিল্পাঞ্চল স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে এবং ২৮টির কাজ চলছে। মাত্র কয়েকটিতে শিল্পস্থাপনা তৈরি হয়েছে। তাতে আমাদের রফতানি বেড়ে গেছে। আর ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০টি শিল্পাঞ্চল পুরোদমে চালু হলে দেশের রফতানি খাতের উপার্জন কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। আমাদের মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শিল্প স্থাপনের শর্ত রয়েছে।

সাবেক সহসভাপতি, এফবিসিসিআই, বিটিএমইএ
বিজিএমইএ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ও ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড

সর্বশেষ..