দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন: পরিবারে নারীর মর্যাদা

ফরিদা হাফিজ: অল্প বয়সেই বিয়ে হয় শাহানার। বিয়ের এক বছরের মাথায় স্বামী বিদেশে পাড়ি জমায় জীবিকার তাগিদে। স্বামী বিদেশে যাওয়ার যাবতীয় অর্থের সংস্থান করতে হয় শাহানার পরিবারকে। অর্থের জোগান দিতে গিয়ে মানুষের কাছ থেকে ঋণ করে এবং তার বাবার নিজের সামান্য জমিটুকুও বিক্রি করে দেন। অর্থনৈতিকভাবে চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায় শাহানার পরিবার। সেই থেকেই সংসারে আর্থিক অনটন শুরু হয়। শাহানার স্বামী কয়েক মাস টাকা পাঠানোর পর হঠাৎ করেই টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেন। দিন গোনে শাহানা, কিন্তু টাকা আসে না। এরই মধ্যে মোবাইল ফেনে যোগাযোগও বন্ধ হয়ে যায়। কিছুদিন পর শাহানা তার গ্রামের আরেক প্রবাসীর কাছে জানতে পারে, তার স্বামী আরেকটি বিয়ে করে অন্যত্র সংসার করছেন। এ কথা জানার পর শাহানার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে!

শাহানা ভেঙে না পড়ে ভাবে কিছু একটা করতেই হবে। পরিবারের পাশে দাঁড়াতে হবে। ছোটবেলা থেকেই শাহানা হাতের কাজ (সেলাইয়ের কাজে) বেশ পারদর্শী ছিল। এই সেলাইয়ের কাজের পারদর্শিতাই হয়ে ওঠে তার পথচলার শক্তি, নতুনভাবে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা। সরকার গ্রামের পিছিয়ে পড়া নারীদের জীবিকা ও অর্থনৈতিক সচ্ছলতা আনার জন্য নানামুখী কারিগরি প্রশিক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। নারীদের কর্মমুখী ও দক্ষ করে তুলতে হাতে নিয়েছে বিভিন্ন পরিকল্পনা। শাহানা উপজেলা যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে সেলাইয়ের ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। ব্যাংক থেকে ক্ষুদ্রঋণের আওতায় ২৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে একটি ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শাহানার হাতের কাজের প্রশংসা ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের গ্রামগুলোতে। কাজের চাহিদা বেড়ে যায়। নারীরা বিভিন্ন কাজের অর্ডার নিয়ে আসতে থাকে। ব্যবসার পরিধিও বাড়তে থাকে। সংসারে সচ্ছলতা ফিরে আসে। শাহানা ভাবে গ্রামের অসচ্ছল নারীদের পাশে সহযোগিতার হাত বাড়াতে পারলে মন্দ হয় না। হাতের কাজে আগ্রহী এমন কয়েকজন নারীর তিনি নিজে প্রশিক্ষণ দেন। তারপর তাদের নিয়ে গড়ে তোলেন কুটির শিল্প। তাদের দেখে পাশের কয়েকটি গ্রামের দরিদ্র সুবিধাবঞ্চিত নারীদের নিয়ে গড়ে তোলেন কুটির শিল্প। এতে শাহানার উপার্জন যেমন বাড়ে, তেমনি গ্রামের অন্যান্য নারীদের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা আসে। গ্রামের নারীদের কাছে শাহানা হয়ে ওঠে একজন অনুকরণীয় নারী হিসেবে। সংসারে অবদান রাখতে পারায় নারীরা হতে থাকে ক্ষমতায়িত, পরিবারে বাড়তে থাকে তাদের মূল্যায়ন। গ্রামে নারী-পুরুষের ভেদাভেদ কমতে থাকে। পুরুষরা নারীদের এ কাজকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করে। পুরুষরাও নারীদের এ কাজে সহায়তা করে।

শাহানার পরিবার এখন একটি সচ্ছল পরিবার। মা-বাবাসহ পুরো পরিবার শাহানা একাই পরিচালনা করে। অন্যের ঋণের বোঝাও শাহানা পরিশোধ করেছেন। শাহানার পরিবার তার একক প্রচেষ্টায় দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে উঠে আসে মধ্যবিত্তের কাতারে। শাহানা বিয়ে করে নতুনভাবে জীবন শুরু করে। তার সন্তান সুশিক্ষায় বেড়ে উঠতে থাকে। সংসারে নেমে আসে শান্তির ছায়া। এভাবে এগিয়ে চলে একজন সংগ্রামী শাহানার জীবন। এভাবে এগিয়ে যাবেন বাংলার প্রতিটি নারীÑএমনটাই প্রত্যাশা আমাদের।

বর্তমান সমাজব্যবস্থায় নারী-পুরুষের ভেদাভেদ অনেকটাই কমে এসেছে। সংসারে অর্থনৈতিক উন্নয়নে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও সমান তালে এগিয়ে আসছেন, সরাসরি অংশগ্রহণ করছেন। এতে পুরুষের ওপর সংসার পরিচালনার চাপ বহুলাংশে কমে এসেছে। সংসারে ক্রমান্বয়ে সচ্ছলতা ও শান্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিবার পরিচালনায় শাহানার মতো বহু নারী সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এর সবই সম্ভব হয়েছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নারী উন্নয়ন নীতি এবং নারীদের উন্নয়নে বিভিন্ন সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণের কারণে।

নারীর নিজের জন্য, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের জন্য নারীর চিন্তা-চেতনার ইতিবাচক পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি। আমাদের সমাজের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বহু সাহসী, উদ্যোগী, মর্যাদাসম্পন্ন নারীর জীবনের গল্প কাহিনি। এসব গল্প আমাদের সত্যিকার অর্থে অনুপ্রাণিত করে, আমাদের নতুনভাবে বাঁচার স্বপ্ন জাগিয়ে তোলে। আমাদের মনে সাহস জোগায়।

বর্তমান সামাজিক প্রক্ষাপটে নারীর জীবনব্যবস্থা ও সামাজিক অবস্থানে আমরা আমূল পরিবর্তন দেখতে পাই। সরকার এসব পিছিয়ে পড়া ও কর্মমুখী নারীদের জন্য অসংখ্য ফলপ্রসূ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার সর্বক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি এবং নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করার জন্য নারীর অর্থনৈতিক সচ্ছলতা আনয়নে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। সরকারের এ ধরনের উদ্যোগের ফলেই নারী উদ্যোক্তাদের সংখ্যা বাড়ছে। তারা নিজেরাই নিজেদের কর্মসংস্থানের পথ খুঁজে নিচ্ছেন।

নারীর ক্ষমতায়ন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১০টি বিশেষ উদ্যোগের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি। নারীর সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে প্রণয়ন করা হয়েছে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১। নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিয়ে নারীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিনাসুদে ঋণ দিয়ে নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে সহায়তা করা, ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তাদের জন্য জয়িতা ফাউন্ডেশন গড়ে তোলা এবং তথ্য ও প্রযুক্তিতে নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন করে গড়ে তোলা হচ্ছে। সরকারি কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ৪০টি মন্ত্রণালয়ে জেন্ডার সেনসিটিভ বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। এছাড়া ২০২১ সালের মধ্যে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত সব নারীর যোগ্যতা অনুযায়ী, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। যাতে তারা উপযুক্ত কাজের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়।

নারীর উন্নয়নে উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি তাদের কাজের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরিতেও সহায়ক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নারী উদ্যোক্তা উন্নয়নে ২০১১ সালে জয়িতা ফাউন্ডেশন গড়ে তোলা হয়েছে। জয়িতা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে নারীর উৎপাদিত পণ্য বিক্রয়ের ব্যবস্থা সুগম হয়েছে। মহিলা হোস্টেল নির্মাণ, উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন, নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০ প্রণয়ন করা হয়েছে। এছাড়া তৃণমূল পর্যায়ে নারীদের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশব্যাপী সাড়ে ১৩ হাজারের বেশি কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত নারীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, মা ও শিশুর যতœসহ যাবতীয় বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাসে উন্নীত করা হয়েছে এবং দরিদ্র ও গর্ভবতী মায়েদের মাতৃত্বকালীন ভাতা দেওয়া হচ্ছে। সরকারি চাকরিতে নারীর প্রবেশের হার ২০২১ সাল নাগাদ ২৫ শতাংশে উন্নীতকরণের পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।

নারীর ক্ষমতায়নে অসামান্য অবদান রাখার জন্য ২০১৬ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফোরাম ‘এজেন্ট অব চেঞ্জ’ পুরস্কার এবং নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এক অনুষ্ঠানে ইউএন উইমেন ‘প্লানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন’ পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। এসব অর্জন আমাদের দেশের সব নারী এবং সব মানুষের অর্জনকে প্রতিনিধিত্ব করে।

বর্তমান সরকারের এসব উদ্যোগের কারণে নারীরা এখন আর আগের মতো পিছিয়ে নেই। ব্যক্তি সচেতনতা, পারিবারিক সচেতনতা এবং সরকারি উদ্যোগের ধারা অব্যাহত থাকলে নারীরা সব জায়গায় নিজেদের সক্ষমতা ও মেধার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হবে। পরিবারে, সমাজে এবং রাষ্ট্রে নারীর মর্যাদা বাড়বে। মাথা উঁচু করে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যাবে দেশ, সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয় নিয়ে।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..