প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

অর্থনৈতিক বিপ্লবের দ্বার উম্মোচন করেছে পদ্মা সেতু

শাহ মুনতাসির হোসেন মিহান : ১৯৭১ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে স্বাধীনতা অর্জন করে ছোট্ট একটি দেশ বাংলাদেশ। তৎকালীন সময়ে স্বাধীন দেশ হিসেবে দেশটির শুরু হয়েছিল একেবারে শূন্য থেকে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ হিসেবে ওই সময়ে দেশটির ছিল নানান রকম প্রতিবন্ধকতা ও সীমাবদ্ধতা। তার মধ্যে ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব ও নিরলস প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ তাদের লক্ষ্যপানে এগিয়ে যায়। সেই এগিয়ে যাওয়ার ধারাবাহিকতা এখনও বহমান রয়েছে তাঁরই যোগ্য উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচক্ষণতা ও নেতৃত্বে। সেই এগিয়ে যাওয়ার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে নিজ অর্থায়নে নির্মাণকৃত পদ্মা সেতু। 

রাষ্ট্রের উন্নয়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন। একটি দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা যত বেশি  উন্নত সে দেশের অর্থনীতি তত বেশি সমৃদ্ধ। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা দেশের অর্থনীতিক কাঠামো ব্যবস্থাকে অধিক সচল ও শক্তিশালী করে। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা দেশের অর্থনৈতিক সূচকগুলোকে বিনির্মাণ করতে সহায়তা করে। এতে একটি দেশের সামাজিক ও অর্থনীতিক অবস্থানে বিশাল পরিবর্তন আনে। কারণ নির্মাণকৃত যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় জড়িত থাকে। যেমন-বিনিয়োগ, সময়ের দূরত্ব, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, বিপণন বৃদ্ধি, অর্থনীতিক ও সামাজিক সুরক্ষা প্রভৃতি বিষয়ের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা একটি দেশের দৃশ্যমান উন্নয়নের চাবিকাঠি হিসেবে সর্বমহলে স্বীকৃত হয়। কারণ নতুন নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র, কর্মক্ষেত্র বৃদ্ধি, ব্যবসা বাণিজ্যিক বিকাশ ও সেবার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটা সম্ভব অত্যাধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে।

গত ২৫ জুন আমাদের দেশে উদ্বোধন হয়ে গেছে বহুল প্রতীক্ষিত ও আলোচিত পদ্মা সেতু। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে সর্বত্রই আলোচনার মূল বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে পদ্মা সেতু। এটি নেহাৎ কোনো ক্ষুদ্র অর্জন নয়। বাঙালি হিসেবে নিঃসন্দেহে বড় অর্জন আমাদের কাছে। তাছাড়া বিশ্লেষকদের মতে স্বাধীনতা অর্জনের পর এটি আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় অর্জন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলেও বিশেষভাবে প্রশংসিত হচ্ছে পদ্মা সেতু নির্মাণ।

স্বাভাবিকভাবে দক্ষিণবঙ্গের মানুষদেও কাছে পদ্মা সেতু আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। কারণ এটি দক্ষিণবঙ্গের মানুষের বহুদিনের আক্ষেপ ও হাহাকার মিটিয়েছে। দেশে নব্য অর্থনীতিক ও সামাজিক বিপ্লবের দ্বার উšে§াচন করেছে পদ্মা সেতু। এটি শুধু একটি সেতু নয়। এটি দক্ষিণ বঙ্গের ২১টি জেলাকে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে যুক্ত করে সৃষ্টি করেছে ইতিহাস। পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে আমাদের দেশের অর্থনীতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, ব্যবসা-বাণিজ্যের বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি দক্ষিণ বঙ্গে নতুন নতুন ইকোনমিক জোন তৈরি হবে। প্রতিটি দেশের ডেভেলপমেন্ট মডেল ও কনসেপ্ট সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমাদের দেশের অর্থনীতির মূল দুইটি সূচক হচ্ছে পোশাকখাত ও রেমিট্যান্স। পদ্মা সেতু নির্মাণে অর্থনীতির এই দুইটি সূচক থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাফল্য বৃদ্ধি পাবে এবং দক্ষিণবঙ্গ ও পশ্চিমাঞ্চলের তিন কোটি মানুষের আর্থসামাজিক জীবনযাত্রায় প্রভূত পরিবর্তন আসবে। তাছাড়া বর্তমানে প্রতিযোগিতার এই বাজারে পদ্মা সেতুর গুরুত্ব অত্যধিক। এতে দারিদ্র্য বিমোচন হ্রাস পাবে। আঞ্চলিক অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে। যার ফলে ২০৩০ সাল নাগাদ প্রায় ৫ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। স্থানীয় কৃষি কাজ থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের উন্নয়ন হবে পদ্মা সেতুর দরুন।ফলে সহজতর আমদানি ও রপ্তানি কর্মকাণ্ড বাড়বে আঞ্চলিক ক্ষেত্রে।

এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সেতুর মাধ্যমে শিল্পায়ন ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড প্রসারের লক্ষ্যে পুঁজির প্রবাহ বাড়বে, পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের জন্য অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এডিবির আরেক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, এই সেতু নির্মাণের ফলে দেশের আঞ্চলিক ও জাতীয় অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে লক্ষণীয় অগ্রগতি হবে। এই সেতুর ফলে মানুষ ও পণ্য পরিবহনের সময় ও অর্থ সাশ্রয় হবে, যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি ও আমদানি ব্যয় হ্রাস পাবে।

পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে আমাদের দেশের জিএনপি ১.২ হতে ১.৫-এ উন্নীত হবে। অপরদিকে জিডিপি বৃদ্ধি পাবে ২.৩ শতাংশ। দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তন, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুরক্ষার মান উন্নীত করার পাশাপাশি সরকার ঘোষিত রূপকল্প-২০৪১ এবং বদ্বীপ পরিকল্পনা -২১০০ কার্যকরের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে পদ্মা সেতু। তাছাড়া দক্ষিণ বঙ্গের পিছিয়ে পড়া ২১টি জেলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সেবার নিশ্চিতকরণ, শিল্পায়ন ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করবে পদ্মা সেতু।

দেশের পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে ভিন্ন মাত্রা যুক্ত করেছে পদ্মা সেতু। স্থানীয় জনগণ উন্নততর স্বাস্থ্য সেবা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য খুব সহজেই রাজধানী ঢাকা যেতে পারবে। সময় সাশ্রয় হওয়ায় দক্ষিণ বঙ্গের পর্যটন খাতের প্রচার ও প্রসার বহুগুণ বেড়ে যাবে। তাছাড়া ঢাকা-কলকাতা (ভারত) সংযোগ সড়কে অবস্থিত এই সেতু এশিয়ান হাইওয়ে এবং ইউরো-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্ক সিস্টেমের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হবে।

দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান প্রশংসনীয় ও রোলমডেল হিসেবে স্বীকৃত একটি দেশ। পদ্মা সেতু নির্মাণে সেই রোল মডেলের মাহাত্ম্য ও মহিমা আরও বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে বৈশ্বিক অবস্থান আরও শক্ত ভিত্তি স্থাপনের কারণে বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও বৈদেশিক সুযোগ সৃষ্টি হবে। পদ্মা সেতু আমাদের দেশের অর্থনীতি, সামাজিক খাতসহ প্রতি সূচকে যুগান্তকারী অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে সর্বত্র।

আমাদের দেশের অভূতপূর্ব এই অর্জনকে হাতিয়ার হিসেবে কাজে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যেতে হবে দেশের প্রতিটি খাত ও সূচকে। এর সুযোগ ও সুবিধাগুলো কাজে লাগিয়ে দেশে ভারসাম্য অর্থনৈতিক অবস্থান তৈরি করতে হবে। গতিশীল করতে হবে দেশের অর্থনৈতিক সূচকগুলোকে। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ও পর্যটনশিল্পের পরিপূর্ণ বিকাশ করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুনর্বাসনে বিশেষ পরিবর্তন আনতে হবে। দেশের চিহ্নিত সমস্যার প্রতিকার করতে হবে। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করে ঢেলে সাজাতে হবে। ফলে আঞ্চলিক প্রবাহ থেকে বিশ্বব্যাপী জয়জয়কার চলবে বাংলার। এর গর্বিত অংশীদার হবেন সব বাঙালি।

শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়