মত-বিশ্লেষণ

অর্থপাচার এবং মিসইনভয়েসিং

মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী, ‘‘অর্থ বা সম্পত্তি পাচার’’ অর্থ— (১) দেশে বিদ্যমান আইনের ব্যত্যয় ঘটাইয়া দেশের বাহিরে অর্থ বা সম্পত্তি প্রেরণ বা রক্ষণ; বা (২) দেশের বাহিরে যে অর্থ বা সম্পত্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ রহিয়াছে যাহা বাংলাদেশে আনয়ন যোগ্য ছিল তাহা বাংলাদেশে আনয়ন হইতে বিরত থাকা; বা (৩) বিদেশ হইতে প্রকৃত পাওনা দেশে আনয়ন না করা বা বিদেশে প্রকৃত দেনার অতিরিক্ত পরিশোধ করা।

আন্তর্জাতিক ব্যবসায় চালানের গড়মিলের মাধ্যমে যখন অর্থ পাচার করা হয়, তাকে মিসইনভয়েসিং বলে। এতে করে পণ্যের প্রকৃত মূল্য গোপন করে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হয়, একই সাথে বিরাট অংকের টাকা বিদেশে পাচার করা হয়ে থাকে। মিসইনভয়েসিং দুই ধরনের হয়ে থাকে। পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে আন্ডার ইনভয়েসিং (কম মূল্য দেখানো) ও আমদানির ক্ষেত্রে ওভার ইনভয়েসিংয়ের (বেশি মূল্য দেখানো)। প্রকারে ভিন্নতা থাকলেও, উদ্দেশ্য একটাই অর্থ পাচার।

মিসইনভয়েসিংয়ের আন্তজার্তিক ক্ষেত্রেও একটা মহামারী আকার ধারণ করে চলেছে। এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো বিপুল অংকের কর রাজস্ব হারাচ্ছে। তথ্য মতে, ২০০০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে স্বর্ণ রফতানির ক্ষেত্রে আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের মোট পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৮২০ কোটি ডলার, যা মোট স্বর্ণ রফতানির ৬৭ শতাংশ। ১৯৯৬-২০১৪ সময়ে নাইজেরিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে তেল রফতানির ক্ষেত্রে আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৯৮০ কোটি ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্রে মোট তেল রফতানির ২৪ দশমিক ৯ শতাংশের সমপরিমাণ। জাম্বিয়ার সরকারি নথিপত্রে ১৯৯৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সে দেশ থেকে সুইজারল্যান্ডে ২ হাজার ৮৯০ কোটি ডলারের তামা রফতানির উল্লেখ রয়েছে। তবে সুইজারল্যান্ডের কোনো নথিতে এর উল্লেখ নেই। ১৯৯০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে চিলির সরকারি নথিপত্রে নেদারল্যান্ডসে ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের তামা রফতানির কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে নেদারল্যান্ডসের কোনো নথিতে এসব তামা আমদানির কথা উল্লেখ নেই। ১৯৯৫-২০১৪ সময়ে আইভরিকোস্টের নথিতে নেদারল্যান্ডসে ১ হাজার ৭২০ কোটি ডলার মূল্যের কোকো রফতানির তথ্য দেখা গেছে। কিন্তু আইভরিকোস্টের এ রফতানির ৩১ শতাংশ নেদারল্যান্ডসের আমদানি নথিপত্রে অনুপস্থিত।

অর্থ পাচার রোধে মানি লন্ডারিং আইনের দন্ডবিধির সঠিক প্রয়োগ প্রয়োজন। মানি লন্ডারিং অপরাধ ও দন্ড সম্পর্কে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে বলা হয়েছে- (১) এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, মানিলন্ডারিং একটি অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে। (২) কোন ব্যক্তি মানিলন্ডারিং অপরাধ করিলে বা মানিলন্ডারিং অপরাধ সংঘটনের চেষ্টা, সহায়তা বা ষড়যন্ত্র করিলে তিনি অন্যূন ৪ (চার) বৎসর এবং অনধিক ১২ (বার) বৎসর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির দ্বিগুন মূল্যের সমপরিমাণ বা ১০ (দশ) লক্ষ টাকা পর্যন্ত, যাহা অধিক, অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন [তবে শর্ত থাকে যে, আদালত কর্তৃক ধার্যকৃত সময়সীমার মধ্যে অর্থদণ্ড পরিশোধে ব্যর্থ হইলে আদালত অপরিশোধিত অর্থদণ্ডের পরিমাণ বিবেচনায় অতিরিক্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত করিবার আদেশ প্রদান করিতে পারিবে।] (৩) আদালত কোন অর্থদণ্ড বা দণ্ডের অতিরিক্ত হিসাবে দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করিবার আদেশ প্রদান করিতে পারিবে যাহা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মানিলন্ডারিং বা কোন সম্পৃক্ত অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত বা সংশ্লিষ্ট। (৪) কোন সত্তা এই আইনের অধীন কোন অপরাধ সংঘটন করিলে বা অপরাধ সংঘঠনের চেষ্টা, সহায়তা বা ষড়যন্ত্র করিলে ধারা ২৭ এর বিধান সাপেক্ষে, উপ-ধারা (২) এর বিধান অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে এবং অপরাধের সহিত সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির মূল্যের অন্যূন দ্বিগুণ অথবা ২০ (বিশ) লক্ষ টাকা, যাহা অধিক হয়, অর্থদন্ড প্রদান করা যাইবে এবং উক্ত প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিলযোগ্য হইবে। তবে শর্ত থাকে যে, উক্ত সত্তা আদালত কর্তৃক ধার্যকৃত সময়সীমার মধ্যে অর্থদন্ড পরিশোধে ব্যর্থ হইলে আদালত অপরিশোধিত অর্থদন্ডের পরিমাণ বিবেচনায় সত্তার মালিক, চেয়ারম্যান বা পরিচালক যে নামেই অভিহিত করা হউক না কেন, তাহার বিরুদ্ধে কারাদন্ডে দন্ডিত করিবার আদেশ প্রদান করিতে পারিবে।] (৫) সম্পৃক্ত অপরাধে অভিযুক্ত বা দণ্ডিত হওয়া মানিলন্ডারিং এর কারণে অভিযুক্ত বা দণ্ড প্রদানের পূর্বশর্ত হইবে না।

শুধুমাত্র আইন করে মিসইনভয়েসিং এর মাধ্যমে অর্থ পাচার বন্ধ করা কি আদৌ সম্ভব? আপনি ১০ টাকা মূল্যমানের জিনিস ১০ টকা দিয়েই কিনলেন কিন্তু বিদেশে অবস্থিত রপ্তানিকারকের সাথে বোঝাপোড়ার মাধ্যমে ২০ টাকার দালিলিক প্রমাণপত্র প্রদর্শন করেন, তবে আইন দিয়ে অর্থ পাচার আটকানো প্রায় অসম্ভব। একই বিষয় আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

মোদ্দা কথা হচ্ছে, আমাদের সকলকেই দেশের স্বার্থ সবার আগে দেখতে হবে। দেশের উন্নতির মাঝেই আমাদের উন্নয়ন নির্ভর করছে। মিসইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচার বন্ধ হোক, এই প্রত্যাশা সবসময়। এগিয়ে যাক দেশ, এগিয়ে যাক দেশের অর্থনীতি।

লেখক-মনজুরুল হক, সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার, এবি ব্যাংক লিমিটেড, খুলনা

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..