প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

অর্থসংকটে ধুঁকছে রাজশাহী টেক্সটাইল মিলস

আসাদ রাসেল, রাজশাহী: এ সময় রাজশাহী টেক্সটাইল মিলে প্রচুর লোকসমাগম ঘটতো। দেশ-বিদেশে পৌঁছে যেত এ কারখানার মানসম্মত সুতা। লোকসান সত্ত্বেও একটানা মেশিনের আওয়াজ চলতো দিনরাত। কিন্তু এখন সেই মিলের চিত্র ভিন্ন। মরচেপড়া লোহার গেটটি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে বহুদিন। পাশেই ছোট একটি গেট দিয়ে চলাচল করেন ওই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকরা। ২৬ দশমিক ৫৩ একরের বিশাল এ মিলকে ঘিরে যেখানে জীবন-জীবিকার স্বপ্ন বুনতো প্রায় হাজারখানেক মানুষ। জানা যায় এখন সে মিলে কাজ করেন মাত্র ১৫০ জন শ্রমিক। তাও সবাই ঠিক মতো কাজ পান না। মিল কর্তৃপক্ষের মতে, কারখানায় ভারতীয় নিম্ন মানের প্রযুক্তি ব্যবহৃত করায় এ লোকসানে পড়েছে মিলটি। তাদের দাবি, মাত্র সাত থেকে আট কোটি টাকা খরচ করলেই এ মিলটিকে লাভজনক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। কর্মসংস্থান ঘটানো সম্ভব প্রায় হাজারখানেক মানুষের। এ জন্য কারখানায় অত্যাধুনিক মেশিনারিজ ও যন্ত্রপাতির সংযোজন এবং গ্যাস সংযোগ দ্রুত দেওয়া উচিত বলে মনে করেন মিল কর্তৃপক্ষ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অবহেলিত উত্তর জনপদে শিল্পায়ন ও ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষে ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বর মাসে তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামানের প্রচেষ্টায় ‘রাজশাহী টেক্সটাইল মিলস’ প্রকল্পটি সরকারের অনুমোদন লাভ করে। প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু হয় ৭৫ সালের ১ জানুয়ারি। ১৯৭৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি তিনি মিলটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। মিলটি স্থাপন করা হলেও সিংহভাগ মেশিনারিজ নি¤œমানের হওয়ায় প্রথম থেকেই কাক্সিক্ষতমানের উৎপাদন দিতে পারেনি মিলটি। এর ফলে স্থাপনকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত মিলটি মুনাফা অর্জন করেছে মাত্র দুই বছর (১৯৮৩ ও ১৯৮৪)। মেশিনগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস পেতে পেতে বর্তমানে একেবারে নি¤œপর্যায়ে। বলা যায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে মিলটি। বর্তমানে মিলটিকে প্রতি মাসে লোকসান দিতে হচ্ছে প্রায় ছয় লাখ টাকা।

মিল সূত্র থেকে জানা যায়, মিলের সব মেশিনই ভারতীয় নি¤œ প্রযুক্তির। মিলটি স্থাপনকালীন ১৯৭৯-৮০ সালে মেশিনের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা সর্বোচ্চ নির্ধারিত হয় ২৫ লাখ কেজি। পর্যায়ক্রমে মেশিনের দক্ষতা হ্রাস পাওয়ায় ২০১৫-১৬ সালে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে বার্ষিক মাত্র ৬ দশমিক ২০ লাখ কেজি। এ লক্ষ্যমাত্রার ৭০ ভাগও চলতি বছরে উৎপাদিত হবে না বলে জানিয়েছেন মিল কর্তৃপক্ষ। মিল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমান সময়ের উচ্চ প্রযুক্তির একটি মেশিন যেখানে প্রতি মিনিটে ১৫ থেকে ২০ হাজার আরপিএম গতিতে চলে, সেখানে এ মিলের মেশিনের গতি মিনিটে মাত্র আট হাজার আরপিএম। ফলে গতি কম হওয়ার কারণেও কাক্সিক্ষত উৎপাদন আসে না এবং মিলে লোকসান হয়।

জানা যায়, মিলটির স্থায়ী জনবল সরকার ঘোষিত স্বেচ্ছায় অবসর কর্মসূচির আওতায় ২০০৩ সালের ৩০ জুন সরকারিভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ২০০৪ সালের আগস্ট মাসে মিলটি অস্থায়ী ভিত্তিতে দৈনিকভিত্তিক শ্রমিক দ্বারা সার্ভিস চার্জ পদ্ধতিতে ফের চালু করা হয়। এরপর যা ২০০৮ সালের ২৮ নভেম্বর আবার বন্ধ হয়ে ২০০৯ সালের ১৬ জুলাই দ্বিতীয়বারের মতো চালু হয়। মিলটির বর্তমান সার্ভিস চার্জ (প্রতি বেল) ছয় হাজার ৮৫০ টাকা, স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন প্রায় ৫০ জন এবং দৈনিকভিত্তিতে শ্রমিক রয়েছে প্রায় ১৫০ জন। এসব শ্রমিকদের বেতন মাত্র দৈনিক ১৩০ টাকা। বেতন কম হওয়ার কারণে রয়েছে শ্রমিক সংকট।

মিলের বকেয়া বিলের হিসাব মতে, মিলটিতে ফেব্রুয়ারি ২০১৬ সাল পর্যন্ত শুধু বিদ্যুৎ বিলই বকেয়া রয়েছে ৬৭ লাখ ৫১ হাজার টাকা। এ ছাড়া সিটি করপোরেশন ট্যাক্স বাবদ বকেয়া রয়েছে এক কোটি ৯৪ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। অক্টোবর ১৯৯৬-৯৭ সালের টেলিফোন বিল ৬০ হাজার টাকা, ২০০৩-১৩ সালের স্বেচ্ছা অবসর গ্রহণকারী স্থায়ী শ্রমিকদের মেডিক্যাল ভাতা বাবদ বকেয়া রয়েছে ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা, দীর্ঘমেয়াদি ঋণ আট কোটি ৯৪ লাখ ১৩ হাজার টাকা, ওয়্যারহাউজ লাইসেন্স ফি বাবদ এক লাখ ২৫ হাজার টাকা ও টার্নওভার ট্যাক্স দুই লাখ টাকা। ফলে দেনার ভারেও ঝুঁকছে মিলটি।

মিল সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে ওই মিলে মেশিনারিজ ও যন্ত্রপাতির মধ্যে রয়েছে ব্লোরুম দুটি, কার্ডিং ২২টি, ড্রয়িং ৫টি, সুপার ল্যাপ একটি, কম্বিং চারটি, সিমপ্লেক্স সাতটি, রিং ৪৪টি, কোণ উইন্ডিং ৫টি, ডাব্লিং ৬টি, রিলিং ৯টি ও হিট সেটিং একটি। এর মধ্যে মাত্র ১৪টি রিং মেশিন চালু থাকে। তাও কাঁচামালের অভাবে তা চালু রাখা সম্ভব হয় না। মিনিমাম ২৫টি রিং মেশিন চালানো গেলেও প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে ও লোকসান কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করেন কর্তৃপক্ষ।

মিলের হিসাবরক্ষক ও ইনচার্জ (প্রশাসন) আরশেদ আলী জানান, বর্তমানে বিভিন্ন পার্টির সঙ্গে চুক্তিতে কাজ চলছে। পার্টি কাজের অর্ডার দিলেই সে মোতাবেক কাজ সরবরাহ করা হয়। অনেক সময় তুলার অভাবে মেশিন চালানো সম্ভব হয় না। বর্তমানে পুরো মিলের সক্ষমতার মাত্র ২৫ শতাংশ ব্যবহার করা হয়। এছাড়া গ্যাস সংযোগ না থাকায় বিদ্যুৎ বিলের জন্য গুনতে হয় লাখ লাখ টাকা। অথচ গ্যাস সংযোগ পেলে প্রায় ৬০ শতাংশ জ্বালানি খরচ কমানো সম্ভব হতো। নতুন মেশিন ক্রয় ও গ্যাস সংযোগ বাবদ আট কোটি টাকা বরাদ্দ দিলে এ মিলটিকে লাভজনক করা সম্ভব বলে জানান তিনি।

মিলের উপমহাব্যবস্থাপক শেখ আবুয়াল হোসেন বলেন, ৪০ বছরের পুরোনো মেশিন দিয়ে তো প্রতিষ্ঠানকে লাভবান করা সম্ভব না। নতুন মেশিন ক্রয় করলে প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক করা সম্ভব হতো। মিলের এসব  সমস্যা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার জানানো হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তারাও ভাবছেন। কিন্তু এখনও এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুমোদন না হওয়ায় নতুন করে মিলটিকে ঢেলে সাজানো যাচ্ছে না। ফলে লোকসানও কাটিয়ে উঠতে পারছি না আমরা।