প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে বাধা কোথায়

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) তিন দিনব্যাপী উন্নয়ন সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থ পাচারের অভিযোগ গত জুলাইয়ে প্রায় ১০০ ঋণপত্র বন্ধ করেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

বিভিন্ন সময় প্রতিবেদন-সম্পাদকীয়তে শেয়ার বিজ বলে এসেছে, আমদানিতে ওভার ইনভয়েস (পণ্যের দাম বেশি দেখিয়ে) আর রপ্তানির ক্ষেত্রে আন্ডার ইনভয়েসের (পণ্যের দাম কম দেখিয়ে) মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাঠিয়ে দেয়ার প্রবণতা রয়েছে। এখন গভর্নরও স্বীকার করলেন এক্ষেত্রে ২০ থেকে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত ওভার ইনভয়েস হয়েছে। তিনি এও বলেছেন, এক লাখ ডলারের মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়ি মাত্র ২০ হাজার ডলারে আমদানির ঋণপত্র খোলা হয়েছে। বাকি অর্থ হুন্ডিতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। শেয়ার বিজে গত মঙ্গলবার ‘বিলাসবহুল গাড়ির শুল্কায়ন: আমদানি আর বিক্রিতে মূল্য পার্থক্য ‘আকাশ-পাতাল’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ-সংক্রান্ত অনিয়ম উঠে এসেছে। এর সারকথা হচ্ছে, এলসির টাকা যাচ্ছে এক দেশে, উৎপাদন হয়ে গাড়ি আসছে আরেক দেশ থেকে, যাতে হচ্ছে অর্থ পাচার। ওই প্রতিবেদনে এও বলা হয়, ১৪ নভেম্বর ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের নিয়ে জরুরি এক বৈঠকে গভর্নর এমন চিত্র তুলে ধরে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার হুশিয়ারি দিয়েছেন। বিআইডিএসের সম্মেলনেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচারে পণ্য আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণার কিছু উদাহরণ দেন তিনি।

গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) অর্থ পাচার নিয়ে প্রতিবেদনে বলেছে, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের মাধ্যমে মূল্য কমবেশি দেখিয়ে ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ৪ হাজার ৯৬৫ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। প্রতি বছর গড়ে ৭৫ হাজার কোটি টাকা এভাবে পাচার হয়। জিএফআই বলেছে, বাংলাদেশের সঙ্গে অন্য দেশের যত আমদানি-রপ্তানি হয়, এর মধ্যে ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে মূল্য ঘোষণায় গরমিল থাকে।

আমাদের দেশে বড় শিল্প গোষ্ঠীগুলোর মুনাফা অর্জনকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান থাকলেও তারা ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করে খেলাপি হয়ে যায়। এর একটা কারণ, অবৈধভাবে বিদেশে মুনাফা পাচার। এ ক্ষেত্রে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে বারবার ঋণ পুনঃতফসিলকরণ, সুদ মওকুফ প্রভৃতি সুবিধা দিতে হয়। এর পরিবর্তে আর্থিক সহায়তা হিসেবে ওই প্রতিষ্ঠানের শেয়ার সরকারকে কিনে নেয়ার পরামর্শও এসেছে। সম্মেলনে সুদের হার, ডলার-সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার অভাব, আইএমএফের সঙ্গে ঋণ আলোচনা ও শর্ত প্রভৃতি নিয়েও আলোচনা হয়। যত সমস্যার কথাই বলা হোক, আমাদের দেশের প্রধান সমস্যা অর্থ পাচার এবং এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেয়া।

বর্তমানে আমদানিতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। সঠিক মূল্যে ঋণপত্র খুললে যেকেউ আমদানি করতে পারেন। আমদানির আড়ালে কারা অর্থ পাচার করেছেন, তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অজানা নয়। তা হলে কেন তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে বাধা কোথায়!  কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত অর্থ পাচারকারীদের মুখোশ উন্মোচন করা। অর্থ পাচার বন্ধ করা কঠিন, তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করলে তা অসম্ভব নয়।