আজকের পত্রিকা দিনের খবর বাণিজ্য সংবাদ শেষ পাতা সর্বশেষ সংবাদ

অর্থ সঙ্কটে স্থায়ীভাবে ঢাকা ছাড়ছে অনেক পরিবার

করোনা মহামারি

হামিদুর রহমান: আবদুল মান্নান পেশায় জুতা তৈরির কারিগরি। ভৈরবের এ বাসিন্দা পুরো পরিবারসহ ঢাকার নাজিরাবাজার এলাকায় অনেক বছর ধরে ভাড়া থাকেন। করোনা মহামারীতে আবদুল মান্নানের জুতার কারখানা বন্ধ প্রায় ৩ মাস। হাতে কাজ না থাকলেও রোজায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আশায় ছিলেন।

কিন্তু ঢাকাসহ দেশের বেশিরভাগ শপিং মল বন্ধ থাকায় এ বছর আর জুতা সরবরাহের অর্ডার আসেনি। খুলে তাই বন্ধ কারখানাও। কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে তাও জানে কেউ। এর মধ্যে জমানো অর্থ দিয়ে খাবারের খরচ ছাড়াও পরিশোধ করতে হয়েছে ৩ মাসের ঘর ভাড়া। আর্থিক অবস্থা ভালো না বিধায় বাধ্য হয়ে ঢাকা ছেড়ে স্থায়ীভাবে পাড়ি জমালেন গ্রামের বাড়ি।

এ অবস্থা শুধু আবদুল মান্নানের একার নয়। নিত্য ও সীমিত আয়ের বেশিরভাগেরই অবস্থা অনেকটা একই রকম। তাই করোনার প্রকোপ বাড়ার পাশাপাশি দেশব্যাপী লকডাউন চলায় অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়েছে মানুষ। আর কাজ না থাকায় রাজধানীতে বাসাভাড়া দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে অনেকের। এমন পরিস্থিতিতে নিরুপাই হয়ে স্থায়ীভাবে ঢাকা ছাড়ছেন অনেক পরিবার।

ময়মনসিংহের মিরাজ হোসেন। পেশাই চা বিক্রেতা। তার চোখ মুখোই জানান দিচ্ছে এই শহরে তিনি ভালো নেই। তিন ছেলেমেয়ে ও স্ত্রীসহ প্রায় সাত বছর ধরে বসবাস করছিলেন রাজধানীর মোহাম্মদপুরে। সেখানে জাপান গার্ডেন সিটির পাশে ফুটপাতে চা বিক্রি করতেন মিরাজ হোসেন। করোনা মহামারীতে লকডাউন চলায় তার চা বিক্রি বন্ধ প্রায় দুই মাস হলো।

শেয়ার বিজের সঙ্গে কথা হলে অন্তত দুঃখ নিয়ে মিরাজ হোসেন বলেন, ‘করোনার কারনে দুই মাস হতে চলছে চায়ের দোকান বন্ধ। বাসা ভাড়াও বাকি পড়ছিলো। এই অবস্থায় আয় রোজগাড় না থাকাই ঘরে প্রয়োজনীর খাবার নেই। এভাবে কতোদিন চলা যায়? রোজার মধ্যে রিক্সা চালিয়েও তেমন ভাড়া পাওয়া যায় না। তাছাড়া রিক্সা চালাতে অভ্যস্তও না। তবুও কষ্ট করে রিক্সা চালিয়ে কোনো রকম বাড়ি ভাড়া পরিশোধ করেছি। এভাবে থাকলে কষ্ট আরও বাড়বে। তাই গ্রামে চলে যাচ্ছি। সেখানে অন্তত বাড়ী ভাড়ার জন্য কষ্ট করতে হবে না।’

একই রকম পরিনতির কথা জানালেন বগুড়ার জীবন আলী। রাজধানীর রামপুরায় কাপড়ের দোকান পরিচালনা করতেন তিনি। শেয়ার বিজের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, ‘কাপড়ের ব্যবসা এমনিতেই অনেক প্রতিযোগিতামূলক। তার মধ্যে করোনার প্রভাবে ব্যবসা নেই বললেই চলে। করোনার প্রভাবে এবারের ঈদেও বিক্রি নেই। বসে বসে বাসা ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। চড়া গ্যাস বিল, বিদ্যুৎ বিল সব মিলে ঢাকায় জীবন যাপন করা এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন। গ্রামে আয় কম ব্যয়ও কম।’

এমন পরিস্থিতির কথা জানালেন জামালপুরের পারভিন আক্তার, পেশায় পোশাক শ্রমিক। এ পেশায় কাজ করে বহু ঘাম ঝড়াতে হয়েছে তাকে। করোনা মহামারিতে গত দুইমাসে গার্মেন্টস মালিকদের ফ্যাক্টরি খোলা ও বন্ধের অমানবিক সিন্ধান্তে কর্মীদের খেয়ে না খেয়ে পরিবহন ব্যবস্থা না থাকাই গ্রামে থেকে পায়ে হেটে আসার অমানবিক দৃশ্য অনেকেরই জানা। পারভীনের সংসারে দুই মেয়ে এক ছেলে। তার স্বামী আশরাফ হোসেন সিএসজি চালক। করোনায় অনেক কমে গেছে আশরাফের সিএসজির চাকা।

পারভীন আক্তার জানান, ছয় বছর ধরে ঢাকাতে বসবাস করলেও সংসারে তেমন উন্নতি হয়নি। বরং প্রতিদিনের নিয়মিত কাজ আর পরিশ্রমের তুলনায় গ্রামেই ভালো ছিলো তার পরিবার। এখন উপার্জনের সিংহভাগ অর্থই চলে যায় কেবল ঘর ভাড়ায় আর খাবার কিনতে। এতোদিন যাও চলেছেন বর্তমান পরিস্থিতি খুবই করুণ। তবে তার গ্রাম থাকলেও সেখানে থাকার ঘর নেই। দিন রাত ঘাম ঝড়ানো পরিশ্রমে কিছুটা পুঁজি করেছিলেন ঘর তৈরির জন্য। সব কিছু বন্ধ থাকায় নিরুপাই। সেই পুঁজি থেকেই এখন চলছে তার সংসার। এমন পরিস্থিতিতেই দ্রুত ঢাকা ত্যাগের সিন্ধান্ত নেন পারভিনের পরিবার।

তিনি জানান, তার একমাত্র স্বপ্ন তার ছেলে মেয়েদের প্রকৃত শিক্ষাই বড় করার। শহরে পড়াশুনার ব্যয় বেশি তাই গ্রামে ফিরেই সেখানে ভর্তি করবেন তাদের।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কেবল করোনা ভাইরাসের নই। সময় যতো যাচ্ছে রাজধানীতে বসবাস করাও কঠিন হচ্ছে। বাসা ভাড়া, গ্যাস বিল, বিদ্যুৎ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। স্কুল- কলেজ, কোচিংয়ের বেতনসহ অন্যান্য সব কিছু বাড়লেও অপেক্ষাকৃত মানুষের আয় বাড়েনি। তারা মনে করেন, শহর আর গ্রামের পার্থক্য খুব দূরে নেই। গ্রামেও এখন প্রযুক্তিসহ গ্যাস, বিদ্যুৎ সব রকম সুবিধা রয়েছে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ ➧

সর্বশেষ..