মত-বিশ্লেষণ

অলক্ষে সুরক্ষা দেয় ওজোন স্তর

লিপিকা আফরোজ: ওজোন নীলাভ বর্ণের ঈষৎ কটু গন্ধযুক্ত বিষাক্ত গ্যাস। অক্সিজেনের তিনটি পরমাণু পরস্পর যুক্ত হয়ে গঠন করে ওজোন অণু (ঙ৩)। এর আণবিক ভর ৪৮, ঘনত্ব ২.১৪ কেজি/ঘনমিটার এবং স্বাভাবিক তাপমাত্রায় গ্যাসীয় পদার্থ। ১১২হ্ন সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ওজোন গ্যাস তরলীভূত হতে থাকে। ভূপৃষ্ঠ থেকে ১৫-৩০ কিলোমিটার ঊর্ধ্বে স্ট্রাটোস্ফিয়ার অঞ্চলে এই গ্যাসের স্তর বিদ্যমান। বায়ুমণ্ডলে বৈদ্যুতিক স্পার্কের ফলে দ্বিপরমাণুক অক্সিজেন (ঙ২) থেকে ত্রিপরমাণুক ওজোন (ঙ৩) গ্যাস তৈরি হয়। ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি ওজোন গ্যাস স্বতঃস্ফূর্তভাবে অক্সিজেন (ঙ২) গ্যাসে বিশ্লিষ্ট হতে থাকে।
স্ট্রাটোস্ফিয়ার অঞ্চলে ওজোন গ্যাস মোটামুটি স্থায়ী হয়। এ কারণে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে বিদ্যমান মোট ওজোন গ্যাসের প্রায় ৯৫ ভাগই পাওয়া যায় এ অঞ্চলে। তাই ভূপৃষ্ঠ থেকে ১৫-৩০ কিলোমিটার ঊর্ধ্বে স্ট্রাটোস্ফিয়ার অঞ্চলের এই গ্যাসীয় স্তরকে ওজোন স্তর বলা হয়। স্থান, কাল ও আবহাওয়ার তারতম্যে এ স্তরের বিস্তৃতিতে কিছুটা পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।
১৯৩০ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী চার্লস ফ্যারি ও হেনরি বুশন বায়ুমণ্ডলে ওজোন স্তরের উপস্থিতি প্রমাণ করেন। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ আবহাওয়াবিদ জিএমবি ডবসন ওজোন স্তর নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেন।
ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি এই গ্যাস বায়ুদূষণকারী একটি উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। কারণ প্রত্যক্ষভাবে এই গ্যাস প্রাণিকুলের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু বায়ুমণ্ডলের ঊর্ধ্বস্তর স্ট্রাটোস্ফিয়ার অঞ্চলে অবস্থিত এই ওজোন গ্যাসের স্তরই পৃথিবীর সমস্ত জীবজগৎকে রক্ষা করে চলেছে সবার অলক্ষে।
সূর্য থেকে বিকিরিত বিভিন্ন শক্তিতরঙ্গের মধ্যে দৃশ্যমান আলো ছাড়াও অনেক অদৃশ্য রশ্মি থাকে, যা সব উদ্ভিদ ও প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর। সূর্য থেকে বিকিরিত অতিবেগুনি রশ্মি, আলফা, বিটা ও গামা রশ্মি, মহাজাগতিক রশ্মি, রঞ্জন রশ্মি ইত্যাদি বিকিরণ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এই তেজস্ক্রিয় বিকিরণের কারণে মানুষের ত্বকের ক্যানসার, চোখে ছানিপড়াসহ নানা ধরনের জটিল সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। অস্তিত্বের সংকটে পড়তে পারে তাবৎ পৃথিবীর সব উদ্ভিদ ও প্রাণিকুল তথা সমগ্র জীবজগৎ। বায়ুমণ্ডলের স্ট্রাটোস্ফিয়ার অঞ্চলের ওজোন স্তর সূর্য থেকে বিকিরিত এসব ক্ষতিকর রশ্মি পৃথিবীতে প্রবেশে বাধা প্রদান করে। ওজোন স্তর এসব ক্ষতিকর রশ্মি শোষণ, বিচ্ছুরণ ও প্রতিফলনের মাধ্যমে পৃথিবীকে নিরন্তর সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। গবেষণায় দেখা যায়, মাঝারি তরঙ্গদৈর্ঘ্যরে (৯৭-৯৯%) তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ওজোন স্তরে বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং পৃথিবীতে প্রবেশ করতে পারে না।
কোনো কারণে যদি বায়ুমণ্ডলের এই ওজোন স্তর ক্ষতিগ্রস্ত বা বিলুপ্ত হয়, তবে সূর্য থেকে বিকিরিত অতিবেগুনি রশ্মিসহ ক্ষতিকর অন্যান্য রশ্মি অনায়াসে পৃথিবীতে প্রবেশ করবে এবং মানুষসহ সব প্রাণী ও উদ্ভিদ তথা সমগ্র জীবজগতের সমূহ ক্ষতিসাধন করবে। এর ফলে পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। ফলে সমগ্র উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবন বিপন্ন হয়ে পড়তে পারে। এর ফলে অস্তিত্বের সংকটে পড়তে পারে সমগ্র সভ্যতা।
প্রযুক্তির যথেচ্ছ ব্যবহার ও অবিবেচনাপ্রসূত আচরণের দ্বারা মানুষ প্রতিনিয়ত ক্ষতিসাধন করছে পরিবেশের। এর ফলে বৃদ্ধি পাচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, যা বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংঘটন ও এর তীব্রতাকে বৃদ্ধি করছে প্রতিনিয়ত। তাবৎ বিশ্বের জীবজগতের অস্তিত্ব রক্ষাকারী ওজোন স্তরও রক্ষা পায়নি ক্ষতির হাত থেকে। আমরা দৈনন্দিন জীবনে এমন কিছু উপকরণ ব্যবহার করে থাকি, যা আমাদের অজান্তেই ক্ষতি করে চলেছে ওজোন স্তরের। যেমন দৈনন্দিন জীবনে আমরা ফ্রিজ, এসি, এরোসল, চেতনানাশক, বালাইনাশক ইত্যাদি ব্যবহার করি, যা বায়ুমণ্ডলে ক্লোরোফ্লোরো কার্বন বা সিএফসি গ্যাস অবমুক্ত করে। বায়ুমণ্ডলে অবমুক্ত হয়ে এই সিএফসি গ্যাস ক্রমান্বয়ে বাতাসের ঊর্ধ্বস্তরে স্ট্রাটোস্ফিয়ার অঞ্চলের ওজোন স্তরে প্রবেশ করে। ওজোন স্তরে সূর্যরশ্মির প্রভাবে সিএফসি গ্যাস বিয়োজিত হয়ে হ্যালোজেন মুক্ত হয়। ওই হ্যালোজেন ওজোন অণু (ঙ৩) ভেঙে অক্সিজেন (ঙ২) গ্যাস তৈরিতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।
একটি হ্যালোজেন অণু বহু বছর ধরে ওজোন অণু ভেঙে অক্সিজেন অণু তৈরি করতে পারে। সত্তরের দশকে প্রথম ওজন স্তরের ক্ষয় শনাক্ত করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি দশকে ওজন স্তর চার শতাংশ হারে ক্ষয় হচ্ছে। এরই মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমান আয়তনের ছিদ্র শনাক্ত করা হয়েছে ওজোন স্তরে। এভাবে ওজোন স্তর ক্ষয় হতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে পৃথিবী বসবাসের অনুপযোগী একটি বিরানভূমিতে পরিণত হবে বলে বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
আশার কথা হলো সাম্প্রতিক সময়ে এ বিষয়ে সারা বিশ্বে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। ওজোন স্তর রক্ষায় সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ গ্রহণে সবাই সম্মত। বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে ১৯৮৭ সালে কানাডার মন্ট্রিলে বাংলাদেশসহ ১৮০টি দেশ ওজোন স্তর রক্ষায় ‘মন্ট্রিল চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। এ চুক্তির মাধ্যমে ওজোন ক্ষয়কারী রাসায়নিক পদার্থ সিএফসি গ্যাসের উৎপাদন ও ব্যবহার সীমিত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। ওজোন স্তর রক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিবছর ১৬ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় আন্তর্জাতিক ওজোন দিবস। এ বছরও দিবসটি পালিত হচ্ছে সাড়ম্বরে। সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ওজোন স্তর আবার বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে এক গবেষণায় জানা যায়।
পরিবেশদূষণ প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুই কারণেই হতে পারে। সমগ্র জীবজগতের অস্তিত্ব রক্ষাকারী ওজোন স্তরের ক্ষয়সাধনে মানবসৃষ্ট কারণই মুখ্য। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে পরিবেশদূষণের অন্যতম উপাদান ওজোন স্তর ক্ষয়কারী সিএফসি গ্যাসের নিঃসরণ হ্রাস করা আজ সময়ের দাবি। সিএফসি নিঃসরণ হ্রাস ও ওজোন স্তর রক্ষা করতে না পারলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজš§ যে ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়বে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
অনাগত ভবিষ্যৎকে নিরাপদ রাখতে হলে, পৃথিবীকে বসবাসের উপযোগী রাখতে হলে আমাদের সবাইকে ওজোন স্তর রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রযুক্তির যথেচ্ছ অপব্যবহার ও বিলাসিতা পরিহার করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মে জন্য একটি সুন্দর, বাসযোগ্য ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা আমাদের কর্তব্য। ওজোন দিবসে আসুন আমরা আমাদের পরিবেশকে নিরাপদ ও বাসযোগ্য রাখতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই।
মন্ট্রিল চুক্তির সফল বাস্তবায়ন হোক, পরিবেশ ও ওজোন স্তর রক্ষা পাক ক্ষতির হাত থেকে, রক্ষা পাক মানুষ ও মানবতা এবং উন্নয়ন হোক টেকসই এ প্রত্যাশা আমাদের সবার।

পিআইডি প্রবন্ধ

সর্বশেষ..