বাণিজ্য সংবাদ

অসাধু চক্রের পকেটে ৩০০ কোটি টাকা

সোনামসজিদ স্থলবন্দরে নানা কারসাজিতে রাজস্ব ফাঁকি

ফারুক আহমেদ চৌধুরী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ: সোনামসজিদ স্থলবন্দরে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় প্রতিদিন চলছে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে আমদানি পণ্য ছাড়ের কারবার। নামসর্বস্ব কিছু শ্রমিক সংগঠনের নেতা রাজস্ব ফাঁকিতে সহায়তা করেন। সম্প্রতি এ বন্দরে ফল ও বাণিজ্যিক পণ্যের আমদানি বেড়েছে। গত ছয় মাসে আমদানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শুল্ক ফাঁকিও বেড়েছে। বন্দর ব্যবহারকারীরা জানান, রাজস্ব ফাঁকি, ঘুষবাণিজ্য ও জালজালিয়াতির মাধ্যমে ব্যবসায়ী, কাস্টমস কর্তা ও বন্দর-সংশ্লিষ্টরা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। গত ছয় মাসে এ স্থলবন্দর থেকে রাজস্ব ফাঁকির প্রায় ৩০০ কোটি টাকা গেছে সিন্ডিকেটের পকেটে। বন্দর-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
কাস্টমস-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অসাধু ব্যবসায়ীদের সুযোগ করে দিতেই প্রতি গাড়িতে প্রায় চার টন ফলের ওজন কম দেখিয়ে রাজস্ব কর্মকর্তারা গাড়িপ্রতি উৎকোচ নিচ্ছেন ৩০ হাজার টাকা করে। এতে প্রতি গাড়ি থেকে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টাকা। এত লোভনীয় আয়ের উৎস যাতে বন্ধ না হয়, সেজন্য সংশ্লিষ্ট কাস্টমস কর্মকর্তারা প্রায় সময়ই এসব অসাধু আমদানিকারকের শুল্ক ফাঁকির প্রথা চালু রেখে স্বার্থরক্ষা করে চলেছেন। এছাড়া বাণিজ্যিক পণ্যের গাড়িতে আরও বেশি পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার জন্য ব্যবসায়ী ও রাজস্ব কর্মকর্তার সমন্বয়ে সোনামসজিদ শুল্ক স্টেশনে গড়ে উঠেছে একটি সিন্ডিকেট। স্থানীয় এক সংসদ সদস্যের ভাই সোহেল আহমেদ পলাশ এ সিন্ডিকেট পরিচালনার নেপথ্যে রয়েছেন। সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সম্পাদকের নামও এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নির্দেশনা অনুযায়ী বন্দরে আমদানি পণ্য নিয়ে আসা ১০ চাকার ট্রাকে ১৮ টনের বেশি পণ্য বহন করা যাবে না। আর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা ১০ চাকার ট্রাকে ২১-২২ টন পণ্য নিয়ে আসছে। অথচ রাজস্ব দিচ্ছে ১৭-১৮ টনের। ফলে প্রতি ট্রাকে তিন থেকে চার টন ফলের রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়। আর শুল্ক ফাঁকির মোট টাকার তিন ভাগের একভাগ টাকা ভাগবাটোয়ারা হয় সিঅ্যান্ডএফ, পানামা, কাস্টমস আর প্রভাবশালী নেতাদের পকেটে। বাকি দুই ভাগ অর্থ যায় আমদানিকারকের পকেটে। এছাড়া উচ্চ ডিউটির পণ্য আনা হচ্ছে মিথ্যা ঘোষণায়। ফলের প্রতিটি ট্রাক থেকে ১০ হাজার টাকা করে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের বিরুদ্ধে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এসব কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছেন সংসদ সদস্যের ভাই সোহেল আহমেদ পলাশ। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সোহেল আহমেদ পলাশ। তিনি বলেন, যদি হাড্রেড পার্সেন্ট আপনি মাল নেন, তাতেও কাস্টমসকে সাইনিং মানি দিতে হবে। এটাকেই কি চাঁদাবাজি বলছেন? এক শ্রেণির কুচক্রী মহলের মিথ্যা প্রপাগান্ডার কারণে এখন বন্দরে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন বলে দাবি করেন পলাশ।
ব্যবসায়ী ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট নেতারা জানান, সোনামসজিদ স্থলবন্দর কাস্টমসের সহকারী কমিশনারের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের ঘুষের টাকা লেনদেন হয়ে থাকে। গত ২৪ জুলাই সোনামসজিদ স্থলবন্দরের রাজস্ব ফাঁকির ঘুষের টাকা দিতে গিয়ে রাজশাহী মহানগরীর উপশহরে এক কাস্টমস কর্মকর্তার বাড়িতে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন সোনামসজিদ স্থলবন্দরের কয়েকজন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট।
পুলিশ জানায়, মনিরুল ইসলাম নামের এক সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের মাধ্যমে এক ট্রাক ভারতীয় প্রসাধন সামগ্রী আসে। যার রাজস্ব ৮০ লাখ টাকা। কিন্তু মিথ্যা ঘোষণায় মাত্র ২০ লাখ টাকায় খালাস করে নিয়ে যান সংশ্লিষ্টরা। শুল্ক ফাঁকির ওই টাকা নিয়ে যাওয়া হয় কাস্টমস কর্মকর্তাদের মাঝে ভাগ করার জন্য। ওইদিন রাত ৯টায় কাস্টমস গোয়েন্দা সুপার আইয়ুব আলীর বাড়িতে জড়ো হন তারা। এ সময় পুলিশ তাদের আটক করে।
সোনামসজিদ স্থলবন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি শফিউর রহমান টানু জানান, বন্দর থেকে একটি সিন্ডিকেট কোটি কোটি টাকা রাজস্ব চুরি করছে।
বন্দরের আমদানিকারক আতাউর রহমান বলেন, বর্তমানে নজিরবিহীন অনিয়ম ও দুর্নীতি চলছে সোনামসজিদ স্থলবন্দরে। বন্দর পরিচালনার দায়িত্বে থাকা পানামা পোর্ট লিংক লিমিটেড, শ্রমিক লীগ নামে সংগঠন, কাস্টমস ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের যোগসাজশে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি ও ওজনে ছাড় দেওয়ার ঘটনা অনেক বেড়েছে। ফলে আমদানি করা পণ্যের প্রতিটি ট্রাক থেকে সরকার তিন ভাগের মাত্র একভাগ রাজস্ব পাচ্ছে।
এদিকে বন্দরে রাজস্ব ফাঁকির সঙ্গে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন সোনামসজিদ স্থলবন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, কিছু ব্যক্তি মিথ্যা প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে। এক পর্যায়ে তিনি প্রত্যেক সদস্যকে (সাংবাদিক) কিছু টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করেন। বিনিময়ে তিনি পত্রিকায় কোনো কিছু না লেখার অনুরোধ জানান।
সোনামসজিদ স্থলবন্দর কাস্টমসের সহকারী কমিশনার বিল্লাল হোসাইন জানান, বন্দরের রাজস্ব আয়ের স্বার্থে পচনশীল কাঁচা পণ্য হিসেবে আমদানি করা ফলে ব্যবসায়ীদের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ওজন ছাড় দেওয়া হয়। এজন্য আর্থিক সুবিধা নেওয়ার বিষয়টি ঠিক নয়। তিনি বলেন, বর্তমানে সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। এছাড়া মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানির কোনো সুযোগ নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

সর্বশেষ..