প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও ব্যক্তিক দায়বদ্ধতার অভাব

অসুস্থতার প্রকরণ কিংবা সংজ্ঞায়ন এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। তবে এখানে যে অসুস্থতা নিয়ে কথা বলবো, তা চিকিৎসাবিজ্ঞানে বর্ণিত অসুস্থতা থেকে ভিন্ন। বর্তমান সময়ে এমন একটা সমাজকাঠামোর মধ্য দিয়ে আমরা জীবন অতিবাহিত করছি, যেখানে সফলতার নির্ধারক হিসেবে পরিশ্রম, সততা ও কর্মনিষ্ঠার জায়গা দুর্বল। অসততা, ঠকবাজি, প্রতারণা এখানে দৃশ্যত সফল। এটি সামাজিক অসুস্থতা। শারীরিক অসুস্থতার জন্য ব্যক্তি একা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে সামাজিক অসুস্থতা পুরো সমাজকাঠামোর জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

ঢাকার যানজটকে অসহনীয় করে তুলছেন বাসের ড্রাইভাররা। যাত্রী ওঠানামার জন্য নির্ধারিত স্টপেজ থাকবে, যাত্রীরা সাধারণত সেখান থেকেই ওঠানামা করবে। এ প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়েও যদি কথা বলি, তাহলে রাস্তার বিভিন্ন মোড় থেকে লোকাল বাসগুলো যাত্রী তুলবে এটা এখন নিত্যনৈমিত্তিক। কিন্তু যাত্রী তোলার সময় রাস্তার মাঝখানে বাস থামাবে, এটাও মেনে নিতে হবে? তাতে সমস্যা কী হয়, পেছনে গাড়ির বিশাল সারি পড়ে যায়। আর হেল্পার যখন বলেন, ‘ওস্তাদ, পেছনে নাম্বার আছে’ কিংবা গ্লাসের ফাঁক গলে যদি ওস্তাদ নিজেই ‘নাম্বার’ দেখতে পান, তখন ওস্তাদের কাছে পুরো সড়কটিকে নিজের পৈতৃক সম্পত্তি মনে হয়। ওস্তাদ তার বাসটি রাস্তার মাঝখানে যতটা পারেন আড়াআড়িভাবে রাখেন। এতে যানজট বাড়ার পাশাপাশি প্রায়ই ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটে। উল্লেখ্য, ‘নাম্বার’ বলতে বাসের ড্রাইভার ও হেল্পাররা একই কোম্পানি বা একই রুটের অন্য বাসকে বোঝায়। যাত্রীদের দৃষ্টিকোণ থেকে ‘নাম্বার’ হচ্ছে কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছতে একই রুটে তার জন্য বিকল্প বাস।

এখন একটু গাণিতিক হিসাবে যাওয়া যাক। ধরুন, মিরপুর থেকে কোনো একটি নির্দিষ্ট দিনে পাঁচ হাজার যাত্রী গুলিস্তান যাবে। বিষয়টা এমন নয় যে, যানজট না থাকলে পাঁচ হাজার যাত্রী ছয় হাজার হয়ে যাবে। যানজট বেশি থাকলে বা গাড়ি রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখলে যাত্রী চার হাজার হয়ে যাবে, বিষয়টি এমনও নয়। একইভাবে যদি গোটা ঢাকা শহরের কথা বলি, প্রতিদিন এ শহরে যে পরিমাণ যাত্রীর বের হওয়া দরকার হয়, তারা বের হবেই। এটাই স্বাভাবিক। বাসের বিষয়টিও এমন। এখানে তো লোকাল সার্ভিস দেওয়ার জন্য অন্য কোনো শহর থেকে বাস চলে আসবে না। তাহলে যেখানে বাস ও যাত্রী দুটিই পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে কেন এ অসুস্থ প্রবণতা? একটা নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্য দিয়ে চললে কারও বেশি ক্ষতি হয়ে যাবে, বিষয়টি এমন নয়। বরং শহরের যানজট কিছুটা কমবে আর যাত্রীদের ভ্রমণ কিছুটা আরামদায়ক হবে।

অন্যভাবে যদি দেখি, বর্তমানে ঢাকা শহরের অন্যতম প্রধান সংকট হলো নিরাপদ খাদ্য সংকট। ভেজালমুক্ত খাবারের জন্য চেষ্টা করেন না, এমন নাগরিকের সংখ্যা এ নগরে কম। বরং উল্টোটা হয়ে থাকে। ভেজালমুক্ত খাবারের নিশ্চয়তা না থাকার কারণে এ শহরের মানুষ ফলমূল, মাছ-গোশত খাওয়া কমিয়ে দেয়। এমনকি বিভিন্ন মৌসুমি ফল যেমন আম, আনারস, পেঁপে, কাঁঠাল, লিচু প্রভৃতিতে ফরমালিন যুক্ত থাকার আশঙ্কায় অনেক পরিবার পুরো বছরে একবারের জন্যও তা কেনেন না। অনেকে নিজেরা বা পরিচিতজনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে নিরাপদ ফলমূল ও শাকসবজি সংগ্রহে সচেষ্ট থাকেন। শুধু আম দিয়ে যদি বিষয়টি ব্যাখ্যা করি তাহলে দেখব, আমে ফরমালিন থাকার সংশয়ে অনেক পরিবার এ সুস্বাদু ফলটি কেনে না। যদি নিরাপদ আমের নিশ্চয়তা পাওয়া যায়, তাহলে মানুষ একটু বেশি দাম দিয়ে হলেও আম কিনবে। এটা শুধু আমের ক্ষেত্রে নয়, বরং সব খাদ্যদ্রব্যের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ করলে যদি ভোক্তা বাড়ে, তাহলে উৎপাদন বাড়বে, দাম বাড়বে, লাভ বাড়বে। মানুষ নিরাপদ থাকবে, সুস্থ থাকবে। এই সহজ হিসাবটা কেন অসাধু ব্যবসায়ীরা বোঝেন না? যাদের বোঝানোর কথা, তারাও কেন এ ব্যাপারে নিশ্চুপ থাকেন?

আমরা সাধারণত কোনো কিছুকে তার বিপরীত বিষয়ের আলোকে পরিমাপ করি। দিন বোঝার জন্য রাতকে, আলো বোঝার জন্য অন্ধকার, ভালো বোঝার জন্য খারাপকে ব্যবহারের মতো করেই আমরা সফলতাকে ব্যর্থতার আলোকে পরিমাপ করি। মনে করি, আমাকে সফল হতে হলে আরেকজনকে ব্যর্থ হতে হবে। অর্থাৎ অন্য কাউকে না ঠকিয়ে আমি জিততে পারবো না, এমন ধারণা অনেকের মধ্যে প্রবল। এটা যে সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, অন্যকে না হারিয়েও যে জেতা যায়, সে ধারণা অল্পসংখ্যক মানুষের মধ্যেই রয়েছে।

প্রতিযোগিতা প্রগতির ভিত্তি। প্রতিযোগিতা না থাকলে মানবসভ্যতা এত দূর অগ্রসর হতে পারতো না। কিন্তু এটি হতে হবে সুস্থ অর্থাৎ এমনভাবে, যাতে অন্য কেউ অবিচার বা প্রতারণার শিকার না হয়। কোনো একজন শিক্ষার্থী তার ক্লাসে তৃতীয় অবস্থানে আছে। সেখান থেকে প্রথম স্থানে যাওয়ার জন্য তার আছে দুটি উপায়। প্রথমটি হলো সে এমন কোনো ফাঁদ বা ষড়যন্ত্র করবে, যেটা সফল হলে প্রথম দুজন পরীক্ষা দিতে পারবে না। অন্যটি হলো সে নিজে এমন চেষ্টা করবে, যাতে প্রথম দুজনের সঙ্গে যে ব্যবধান ছিল, সেটি মিটিয়ে নিজে সামনে চলে যেতে পারে। দুটি উপায়ের যে কোনো একটি সফল হলেই ওই শিক্ষার্থী প্রথম হবে। কিন্তু প্রথম পন্থাটি অসুস্থ বা নীতিবিবর্জিত। এর মধ্য দিয়ে শুধু প্রথম দুজন ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, বরং সামগ্রিকভাবে সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে দ্বিতীয় পন্থাটি অবলম্বন করে সফল হলে সে নিজেও জিতলো। পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে সমাজ, রাষ্ট্র ও শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি সাধনে ভূমিকা রাখলো।

সফল হওয়ার প্রবণতা মানুষের স্বভাবজাত। প্রত্যেক মানুষই সফল হতে চায়। ব্যক্তির সফল হতে চাওয়ার প্রেক্ষাপট ও প্রক্রিয়ার মধ্যে তার নিজের ও সমাজের কল্যাণ নিহিত। ব্যক্তি কীভাবে সফল হবে, তা নির্ভর করে সমাজের কাছে নিজের দায়বদ্ধতাকে কীভাবে বোঝে, তার ওপর। আমরা করপোরেট, প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যবসায়িক দায়বদ্ধতা নিয়ে কথা বলি। ব্যক্তিক দায়বদ্ধতা অধিকাংশ ক্ষেত্রে আড়ালেই থেকে যায়। একজন ব্যক্তির যে কোনো কাজ বা উদ্যোগ যখন অন্য কাউকে ক্ষতি বা ঝুঁকির মুখোমুখি করে না, সেটাই সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি ব্যক্তিক দায়বদ্ধতা নির্দেশ করে। একজন মানুষ এমন জায়গায় থুথু ফেললো, যেটা অন্য কাউকে বিব্রত করবে বা সামগ্রিক পরিবেশকে ক্ষতি করবে, তার এমন আচরণ ব্যক্তিক দায়বদ্ধতার প্রতি উদাসীনতা নির্দেশ করবে। অর্থাৎ একজন মানুষের দৈনন্দিন প্রতিটি আচরণের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিক দায়বদ্ধতা প্রকাশের সুযোগ আছে। এখন উচিত এ বিষয়ে সবার সচেতন হওয়া। এই সচেতন করার দায়িত্ব শুধু সরকারের না। প্রতিটি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমনকি ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে এ সচেতনতা সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া দরকার। অন্যথায় যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা চারদিকে চলছে, এটা রোধ করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।

 

নৃবিজ্ঞানের শিক্ষক ও গবেষক, গ্রিন

ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

ahbd44Ñgmail.com