মত-বিশ্লেষণ

অস্টিওপোরোসিস: একটি নীরব ঘাতক ব্যাধি

বিল্লাল হোসেন: নারী-পুরুষ নির্বিশেষে একটি সাধারণ সমস্যা দেখা দেয়, তা হলো ব্যাক পেইন। অনেকের অল্প চাপেই হাড় ভেঙে যায়। কিন্তু কেন এমন হয়? প্রকৃতপক্ষে এ সমস্যাগুলো সৃষ্টি হয় মূলত অস্টিওপোরোসিস নামক হাড় ক্ষয় রোগের কারণে। কিন্তু বেশিরভাগ প্রবীণই এটিকে অবহেলা করেন; ফলে রোগটি নীরব ঘাতক হিসেবে তিলে তিলে শেষ করে দেয় প্রবীণদের। ইন্টারন্যাশনাল অস্টিওপোরোসিস ফাউন্ডেশনের হিসাব মতে, বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৮ দশমিক ৯ মিলিয়ন মানুষ বোন ফ্রাকচারে আক্রান্ত হয় অস্টিওপোরোসিস হওয়ার কারণে। ফলে প্রতি ৩ সেকেন্ডে একজন মানুষের বোন ফ্রাকচার বা হাড় মচকানো কিংবা ফেটে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। এছাড়া বিশ্বব্যাপী পঞ্চাশোর্ধ মহিলাদের তিনজনের একজন অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত হন। অন্যদিকে প্রতি পাঁচজনে একজন পঞ্চাশোর্ধ পুরুষ আক্রান্ত হন। সুতরাং এটি স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে এটি কত ভয়াবহ একটি রোগ।

অস্টিওপোরোসিস কী?

অস্টিওপোরোসিস একটি হাড় ক্ষয় রোগ, যেটি ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়ামের অভাবে হয়ে থাকে। অস্টিওপোরোসিস শব্দটির আক্ষরিক অর্থ ছিদ্রযুক্ত হাড়, এটি এমন একটি রোগ যাতে হাড়ের ঘনত্ব এবং গুণগতমান হ্রাস পায়। হাড়গুলো ছিদ্র এবং ভঙ্গুর হয়ে  যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফ্র্যাকচারের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায় হাড়ের ক্ষয় নিঃশব্দে এবং প্রগতিশীলভাবে ঘটে। একটা সময় হাড় দুর্বল হয়ে যায়। প্রথম ফ্র্যাকচার না হওয়া পর্যন্ত প্রায়ই কোনো লক্ষণ থাকে না। এটি প্রধানত বয়স্ক নারীদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়। যেসব নারীর বয়স সাধারণত ৪০ বছরের ওপরে। তবে পুরুষদেরও এই রোগ হয়ে থাকে।

কেন হয় অস্টিওপোরোসিস?

ক. দেহে ক্যালসিয়ামের অভাব হলে; খ. দেহে ভিটামিন ডি-এর অভাব হলে; গ. মেয়েদের ক্ষেত্রে ইস্ট্রোজেন হরমোন এবং ছেলেদের ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরন হরমোনের পরিমাণ কমে যাওয়া, ঘ. ব্যায়াম না করলে। নিয়মিত ব্যায়াম না করলে হাড়ের ঘনত্ব ধীরে ধীরে কমতে থাকে। ফলে অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়; ঙ. ধূমপান করলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বেড়ে যায়। ধূমপান পুরুষের দেহে টেস্টোস্টেরনের পরিমাণ কমায় এবং হাড় ক্ষয় ত্বরান্বিত করে; চ. বয়স বেড়ে যাওয়া; ছ. অতিরিক্ত পরিমাণে থাইরয়েড হরমোন অস্টিপোরোসিসের ঝুঁকি বাড়ায়

অস্টিওপোরোসিসের লক্ষণ: ক. কোমর ব্যথা; খ. সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উচ্চতা হ্রাস; গ. প্রত্যাশার চেয়ে অনেক আগেই হাড় ভেঙে যাওয়া; ঘ. পিঠে ব্যথা

অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে করণীয়: মূলত সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে অস্টিওপোরেসিস প্রতিরোধ করা সম্ভব।

যেসব খাবার খেলে অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি কমে

দুধ: দুধ পছন্দ করেন না এমন ব্যক্তি খুব কমই দেখা যায়। দুধ অস্টিওপোরোসিস রোগের ভ্যাকসিনের মতো। কারণ এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম ও স্নেহে দ্রবণীয় ভিটামিন ডি, যা হাড় গঠনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। যারা নিয়মিত দুধ পান করেন তাদের ক্ষেত্রে তাই অস্টিওপোরোসিস রোগ হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। অন্যদিকে আমাদের দেশের নারীরা অনেকেই দুধ পান করতে পছন্দ করেন না। ফলে পরিসংখ্যানে দেখা যায়, তাদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার অনেক বেশি। এছাড়া দুধে প্রায় সবগুলো পুষ্টি উপাদানই বিদ্যমান, তাই শরীর সুস্থ ও সবল রাখতে দুধের জুড়ি নেই।

গাঢ় সবুজ শাকসবজি: গাঢ় সবুজ শাকসবজি যেমন বাঁধাকপি, ফুলকপি, শালগম প্রভৃতিতে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম রয়েছে; যা হাড় ক্ষয় প্রতিরোধে সহায়তা করে। এছাড়া এতে রয়েছে ভিটামিন কে, যা অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি কমায়।

দধি বা দই: ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স রোগ আছে, এমন ব্যক্তির দুধ খেলেই শুরু হয় পেটের পীড়া কিংবা ডায়রিয়া। তাদের জন্য সঠিক পুষ্টি  হলো দই। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি, যা হাড় ক্ষয় প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া এতে রয়েছে প্রোবায়োটিকস, যা অন্ত্র ভালো রাখতে সহায়তা করে।

লেবুজাতীয় ফল: লেবুতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, যা হাড়ের কোলাজেন অংশ তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে এবং অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধ করে।

মাছ: মাছে রয়েছে ভিটামিন ডি, যা হাড়ের গঠনের প্রয়োজন। এছাড়া মাছের হাড়ে রয়েছে ক্যালসিয়াম, যা হাড় ক্ষয় রোগ প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।

বাদামজাতীয় খাবার: এতে রয়েছে ভিটামিন ডি ও ক্যালসিয়াম, যা অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধ করতে ভূমিকা পালন করে।

যাদের দুধে অ্যালার্জি বা ল্যাকটোজ ইনটোলেরেন্স আছে তারা দুধ পরিহার করুন। তবে দুধের তৈরি যে কোনো খাবার যেমন দই, আইসক্রিম, পনির  প্রভৃতি খাবেন। অস্টিওপোরোসিস রোগ প্রতিরোধে সচেতনতার বিকল্প নেই।

শিক্ষার্থী

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..