মত-বিশ্লেষণ

অস্ট্রেলিয়ার দাবানল, আমাজনের আগুন এবং ঢাকা-দিল্লির বায়ুদূষণ প্রসঙ্গে

তৌহিদুর রহমান:সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার দাবানল। এক মাসের অধিক সময় ধরে চলমান নজিরবিহীন ওই দাবানলে অন্তত ২৯ জনের প্রাণ গেছে। ঘরবাড়ি হারিয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। লাখ লাখ প্রাণীর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে অনেকগুলো রয়েছে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির। আর কী বিপুল পরিমাণ গাছ পুড়ে গেছে, তার হিসাব করা হয়তোবা খুবই কঠিন। কারণ দেশটির ভিক্টোরিয়া, নিউ সাউথ ওয়েলসসহ কয়েকটি রাজ্যের হাজার হাজার একর বনভূমিতে দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। আর্থিক ক্ষতির হিসাব করতে গেলে তা কত বিশাল হবে সহজেই অনুমেয়। যদিও এ ব্যাপারে এখনও চূড়ান্ত তথ্য আসেনি। কারণ আগুন এখনও জ্বলছে। সামনে আবারও দাবানল পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। গরমের সময় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া এবং ছোটখাটো দাবানল অস্ট্রেলিয়ার জন্য স্বাভাবিক ঘটনা। তবে এবার যেভাবে আগুন ছড়িয়েছে, তাকে মোটেও স্বাভাবিক বলা চলে না।

অস্ট্রেলিয়ার দাবানলের জন্য কয়েকটি কারণকে দায়ী করা হয়। এর মধ্যে গরমের মৌসুমে তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যাওয়া এবং বজ পাত হওয়ার কারণে সৃষ্ট আগুনকে সবার আগে উল্লেখ করা হয়। আর কিছু মানুষ অপরাধকর্ম হিসেবেও বনে আগুন লাগিয়ে নাশকতা সৃষ্টির চেষ্টা করেন। তবে প্রথম কারণকেই বেশি দায়ী করা হয়। এবার দাবানল ভয়াবহ আকার ধারণ করার জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকে বেশি দায়ী করা হচ্ছে। কারণ কয়েক বছর ধরেই অস্ট্রেলিয়ার তাপমাত্রা বাড়ছে। আর এটি নিয়ে এবার নজিরবিহীনভাবে তীব্র সমালোচনার শিকার হয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন। শুরুতে দুর্যোগের মধ্যেও ভ্রমণে বেরিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। আর পরে দুর্গত এলাকায় গিয়ে দাবানল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে ব্যর্থতার দায়ে বিক্ষোভের মুখে পড়েন। পরে অবশ্য ভুল বুঝতে পেরে দাবানল মোকাবিলাসহ ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।

চাপে পড়ে এ ধরনের পদক্ষেপ নিলেও বর্তমান বিশ্বের জন্য ক্ষতির কারণ হিসেবে যে ক’জনকে বেশি দায়ী করা হয়, তার মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর নাম শীর্ষস্থানে আসে। এ তালিকায় আরও রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ব্রাজিলের  প্রেসিডেন্ট উগ্র ডানপন্থি হিসেবে পরিচিত জাইর বোলসোনারো। এর মধ্যে বোলসোনারোকে ব্রাজিলের ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ হিসেবেও অভিহিত করে থাকেন অনেকে। এ তিনজনের মতাদর্শের মধ্যে বেশকিছু মিল রয়েছে। তারা সবাই অধিকমাত্রায় শিল্পায়ন করে প্রবৃদ্ধি ঊর্ধ্বমুখী করার পক্ষপাতী। জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ব্যাপারগুলো তাদের কাছে মোটেও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার কিছুদিনের মধ্যেই প্যারিস জলবায়ু চুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নিয়েছেন। তাদের বেরিয়ে যাওয়ার কারণে চুক্তিটি অনেকাংশে গুরুত্ব হারিয়েছে।

আর গত বছর তো ব্রাজিল বিশ্বের জন্য সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পৃথিবীর ফুসফুস হিসেবে পরিচিত আমাজন বনে ভয়াবহ আগুন লাগার ঘটনা ঘটে দীর্ঘসময় ধরে। ফলে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে সারাবিশ্বে, ফ্রান্সসহ অনেক দেশ ও সংস্থা ব্রাজিল সরকারের নির্লিপ্ততায় তাদের কড়া সমালোচনা করে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ বনাঞ্চল প্রায় ৫৫ লাখ বর্গকিলোমিটার আয়তনের আমাজন ব্রাজিল, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, বলিভিয়া, পেরুসহ দক্ষিণ আমেরিকার ৯টি দেশে বিস্তৃত। বনটিতে রয়েছে প্রায় ৩০ লাখ প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী। বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাপ অ্যানাকোন্ডা ও সবচেয়ে বড় প্রজাতির কুমিরও এ বনের বাসিন্দা। প্রায় ১০ লাখ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বাস সেখানে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অক্সিজেন তৈরি হয় এই বন থেকে। শুষ্ক মৌসুমে বনের কিছু স্থানে আগুন লাগা স্বাভাবিক ব্যাপার হলেও গত বছরের ভয়াবহ পরিস্থিতিকে মোটেও স্বাভাবিক বলার সুযোগ নেই।

এই বিশাল গুরুত্বের পরও বনটি ধ্বংসের পথে হাঁটছে এর অফুরন্ত খনিজ সম্পদের কারণে। বিশাল সোনার মজুদ রয়েছে গোটা আমাজন জঙ্গলজুড়ে। রয়েছে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লাসহ প্রায় সব ধরনের খনিজসম্পদ। তবে আমাজনের সোনার খনিই আকর্ষণের কেন্দ্রে। ফলে সেখানে অসংখ্য অবৈধ খনি গড়ে তোলা হয়েছে, বছরে লেনদেন হয় প্রায় ৩০ টন সোনা। বনের মূল্যবান কাঠসহ অন্যান্য খনিজসম্পদ তো রয়েছেই। অভিযোগ রয়েছে, ব্রাজিল সরকারের মদদে বনে অবৈধভাবে এসব খনি গড়ে তোলা হয়েছে। সব মিলিয়ে বনটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। আর স্থানীয় চাষাবাদ, গরুর খামার, শিল্প স্থাপন কিংবা খনির জন্য জায়গা পরিষ্কার করতেও আমাজনে আগুন লাগানো হচ্ছে। যার চূড়ান্ত ধ্বংসলীলা দেখা যায় গত বছর। একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত আমাজন বনে ৭৪ হাজার বার অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে ৮৫ শতাংশ। আর গত বছরের শেষদিক থেকে এখনও জ্বলছে অস্ট্রেলিয়ার বনাঞ্চল।

উপরে তিনটি ঘটনার সঙ্গে জড়িত রয়েছে তিন দেশের শাসকের নাম। অথচ বিশ্বের দায়িত্বশীল দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল ও অস্ট্রেলিয়া। তাদের শাসকরাই এখন বিশ্বের ভবিষ্যতের জন্য বড় শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনকেও অনেকে ওই তিনজনের কাতারে ফেলতে চান। তবে জলবায়ুর জন্য কোনো ক্ষতিকর পদক্ষেপ এখনও তাকে নিতে দেখা যায়। অবশ্য বেক্সিট প্রক্রিয়া নিয়েই শাসনকালের অধিকাংশ সময় ব্যস্ত থাকতে হয়েছে তাকে। সমস্যাটি কাটিয়ে উঠতে পারলে তিনি কোন পথে হাঁটেন সেটিই দেখার বিষয়। প্রথম তিনজন যে বিশ্বের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন তা কিন্তু স্পষ্ট। ফলে তাদের মধ্যে যদি শুভবুদ্ধির উদয় না ঘটে তাহলে বিশ্বের জন্য ভয়াবহ কিছু অপেক্ষা করছে বৈকি।

এখন আসি বাংলাদেশ-ভারত প্রসঙ্গে। কয়েক বছর ধরে বিশ্বের বড় শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহর হিসেবে তকমা পেয়ে আসছে ভারতের রাজধানী দিল্লি। বছরের কিছু সময় সেখানকার পরিস্থিতি এতটাই খারাপ পর্যায়ে পৌঁছায় যে, মানুষ রাস্তাঘাটে স্বাভাবিকভাবে চলাচলও করতে পারে না। শীত মৌসুমে কুয়াশার ঘনত্ব এত বেশি থাকে, সামান্য দূরত্বের কিছুও চোখে পড়ে না। এজন্য বায়ুদূষণকেই দায়ী করা হয়। তবে সেই দিল্লি শহরকেই গত বছরের শেষ দিকে একাধিকবার পেছনে ফেলে দিয়েছে আমাদের রাজধানী শহর ঢাকা। চলতি বছরও তেমনটা দেখা গেছে। পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে তা বলে না দিলেও চলে। এই বায়ুদূষণের জন্য বহুলাংশে দায়ী করা হয় জলবায়ু পরিবর্তনকেই।

জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা কারণে বিশ্বের যে দেশগুলো পরিবেশগত মারত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিশ্বের যে দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তার মধ্যে শীর্ষস্থানীয় বাংলাদেশ। দেশের অধিকাংশ স্থান দখলে-দূষণেও বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যে রয়েছে, যার মধ্যে শীর্ষে রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলো। পরিবেশ দূষণের ভয়ানক নেতিবাচক ফল আমাদের ভোগ করতে হচ্ছে। রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোয় মনুষ্যসৃষ্ট নানা দুর্যোগের মোকাবিলা করতে হচ্ছে, যা জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। বেশ কিছুদিন ধরে এভাবে বায়ুদূষণে বিশ্বের শীর্ষ শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা মাঝে মধ্যেই প্রথম স্থানে চলে আসছে, যা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

এমনিতেই ঢাকায় যানবাহনের কালো ধোঁয়া, শব্দদূষণ, যানজট ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সঙ্গে বায়ুদূষণ ঢাকাকে বসবাসের অনুপযোগী করে তুলেছে। দ্রুত এ ধরনের দূষণ রোধে পদক্ষেপ না নেওয়া হলে তা বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে এবং আমরা হয়তো সে পথেই এগিয়ে যাচ্ছি। রাজধানীতে গত কয়েক বছর ধরে বড় কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। বিদ্যমান সমস্যার সঙ্গে প্রকল্পগুলোর ধুলাবালি পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষত নারী ও শিশুদের জন্য পরিস্থিতি বেশি খারাপ পর্যায়ে গেছে।

পরিবেশ দূষণরোধসহ নানা বিষয়ে এগিয়ে আসা শুরু করেছেন হাইকোর্ট। নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে যেসব গাড়ি বেশি কালো ধোঁয়া ছড়াচ্ছে, সম্প্রতি সেসব যানবাহন জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন। সে সঙ্গে সড়ক পরিবহন আইনের বিধান অনুযায়ী প্রত্যেক যানবাহনের ‘ইকোনমিক লাইফ’ নির্ধারণ করতে বলেছেন আদালত। ইকোনমিক লাইফ পেরিয়ে যাওয়া পরিবহন নিষিদ্ধের ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোয় কয়েক বছর ধরে তীব্র বায়ুদূষণের কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত। সে দৃষ্টিকোণ থেকে এ আদেশ সময়োপযোগী বলা চলে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটা ব্যবস্থা নিতে পারবেন তা প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ অতীতে এ ধরনের অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তা ফলপ্রসূ হয়নি। পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়া টায়ার পোড়ানো বা ব্যাটারি রিসাইকেলিং বন্ধে ব্যবস্থাও নিতে বলেছেন হাইকোর্ট, যা গুরুত্ববহ বটে।

চলতি বছরের শুরু থেকে শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী ঢাকায় কুয়াশার আধিক্য দেখা যাচ্ছে। শীত মওসুমে কুয়াশা থাকা স্বাভাবিক বিষয় হলেও এবার ঘনত্ব অনেক বেশি হওয়ায় তা ভাবাচ্ছে বিশেষজ্ঞদের। তাদের মতে, রাজধানীর ধুলা, গাড়ির কালো ধোঁয়া এবং আশেপাশে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন ইটভাটা থেকে নির্গত  ধোঁয়া বায়ুদূষণ করছে। এ কারণে কুয়াশার ঘনত্বও বাড়াচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের রাজধানী দিল্লিও একই ধরনের সমস্যায় পড়েছে। পাকিস্তান ও চীনের কয়েকটি বড় শহর এ ধরনের সমস্যা মোকাবিলা করছে। আমাদের সমস্যা তাই অভিন্ন বলা চলে। দূষণ এড়াতে প্রতিবেশী দেশগুলো নানা পদক্ষেপও নিচ্ছে। আমাদের শহরগুলো বাসযোগ্য রাখতে হলে দূষণ রোধে পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই। অবশ্য ইটভাটা বন্ধ, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল রোধসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক গাড়ি চলাচল বাড়াতে আমাদের উদ্যোগ এখনও খুবই সামান্য, যা হতাশাজনকই বটে।

বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো বিশ্বনেতাদের বড় ভূমিকা রাখা জরুরি। কিন্তু তাদের কারণেই ক্ষতিটা বাড়ছে, যা উদ্বেগজনক। এ অবস্থায় বাকি বিশ্বের নেতাদের আরও সরব হওয়াটা এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। অবশ্য ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ, জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা  মেরকেল কিংবা কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্র–ডোকে এক্ষেত্রে বেশ দায়িত্বশীল বলেই মনে হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প কিংবা বোলসোনারোদের পরিবেশবিরোধী পদক্ষেপ ঠেকাতে তাদের আরও বেশি সক্রিয় হওয়া জরুরি। ইতোমধ্যে তাদের হাত দিয়ে বিশ্বের খানিকটা ক্ষতি হয়ে গেছে। আর যাতে কোনো পরিবেশ বিধ্বংসী পদক্ষেপ দেখতে না হয়, আমাদের বিশ্বের বাকি নেতাদের নজর দিতে হবে সেদিকেই।

আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সময়টা খুবই স্পর্শকাতর। ইতোমধ্যে অনেক ক্ষেত্রে বেশ কিছু ক্ষতি হয়ে গেছে। প্রাকৃতিক বনভূমির পরিমাণ কমছে। রোহিঙ্গাদের কারণে কক্সবাজার অঞ্চল বিশাল বনভূমি হারিয়ে গেছে। নানা কারণে পরিবেশ থেকে হারিয়ে গেছে অসংখ্য পশুপাখি। বিলুপ্ত হওয়ার পথে আরও অনেকে। অনেক নদী হারিয়ে গেছে, বিদ্যমান নদীগুলোর অধিকাংশই মৃত প্রায়। দেশি প্রজাতির মাছগুলোও অধিকাংশই বিলুপ্ত হওয়ার পথে, হারিয়ে গেছে অনেকগুলো। সব মিলিয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে ইতোমধ্যে অনেক কিছু হারিয়েছি আমরা। যেগুলো বাকি আছে, তা রক্ষার উদ্যোগ না নেওয়া হলে তাও হারিয়ে যাবে। আর বায়ুদূষণের মতো সমস্যাগুলো পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদের তাই আসলে বসে থাকার কোনো সুযোগ নেই। এখন পরিবেশ রক্ষায় দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, ভুল করার কোনো সুযোগ নেই।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয় কী, তা বিশেষজ্ঞরা আরও ভালো বলতে পারবেন। তবে খোলা দৃষ্টিতে দুই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবতে হবে। প্রথমত, জলবায়ু পরিবর্তনের বিশ্বের উন্নত দেশগুলো, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, জার্মানির মতো দেশগুলো বেশি দায়ী। আর বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশগুলো এতে ক্ষতির শিকার হচ্ছে বেশি। ভুক্তভোগী দেশগুলোকে তাই দূষণকারীদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ে উদ্যোগী হতে হবে সম্মিলিতভাবে। আর তারা যাতে পরিবেশ ধ্বংসকারী পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থাকে উদ্যোগ নিতে হবে সে ব্যাপারেও। উন্নত বিশ্বের কারণে বাংলাদেশের মতো দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

আর আমাদের নিজেদের অনেক কর্মকাণ্ডও পরিবেশ কিংবা বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। সে কারণে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ব্যাপক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ইতোমধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরকে এক মাসের মধ্যে গাড়ির কালো ধোঁয়া বন্ধের বিষয়ে বাস্তবায়ন প্রতিবেদন দিতে বলেছেন হাইকোর্ট। এছাড়া অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করে প্রতিবেদন দিতে বলেছেন। পাশাপাশি রাজধানীতে ধূলিবালি উড়া বন্ধ, ময়লা-আবর্জনা ব্যবস্থাপনাসহ বেশ কিছু বিষয়ে নির্দেশনাও দিয়েছেন আদালত। অথচ এ কাজগুলো করার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাদের ব্যর্থতার কারণে পরিবেশ দূষণ, বায়ুদূষণের মতো বিষয়গুলো রোধ করা যাচ্ছে না, এমনটা বললে সম্ভবত ভুল হবে না। তাদের মধ্যে অনিয়ম দুর্নীতিও বড় সমস্যা।

বিষয়গুলো আমলে নিয়ে পরিবেশ রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলো এভাবে দূষিত হওয়ার দায় পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সিটি করপোরেশনও এড়াতে পারে না। দেশকে রক্ষা করতে এবং বাসযোগ্য রাখতে হাইকোর্টের নির্দেশনার আলোকে এবং নিজেদের দায়বদ্ধতা থেকে তারা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন বলে আশা করি। বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে পরিবেশগত বিষয়গুলোও নজরে রাখা জরুরি। আমাদের মনে রাখতে হবে, কৃত্রিমভাবে তৈরি করা অনেক কিছুই আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব। কিন্তু পরিবেশ থেকে কোনো কিছু হারিয়ে গেলে তা আর ফেরানো যাবে না। পরিবেশ রক্ষার দায়িত্বটা তাই আমাদের সবাইকে সম্মিলিতভাবে নিতে হবে।

গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ »

সর্বশেষ..