নুরুন্নাহার চৌধুরী কলি : সম্প্র্রতি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত চারটি কোম্পানির শেয়ারের দর অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। কোম্পানিগুলো হলো- জেনেক্স ইনফোসিস পিএলসি, সোনালী পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলস লিমিটেড, সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট লিমিটেড ও প্রগতি ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) সূত্রে গতকাল বুধবার এ তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, কোনো ধরনের মূল্য সংবেদনশীল তথ্য বা কারণ ছাড়াই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত চারটি কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জকে (সিএসই) এমন তথ্য জানিয়েছে কোম্পানিগুলোর কর্তৃপক্ষ।
তথ্য মতে, গত ২৯ সেপ্টেম্বর সোনালী পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলস লিমিটেড ও সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট লিমিটেড, গত ৩০ সেপ্টেম্বর জেনেক্স ইনফোসিস পিএলসি এবং ৬ অক্টোবর প্রগতি ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার কারণ জানতে চেয়ে সিএসই চিঠি পাঠায়। ওই চিঠির জবাবে কোম্পানি চারটির কর্তৃপক্ষ সিএসইকে জানিয়েছে, কোনো প্রকার অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ছাড়াই তাদের কোম্পানিটির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে।
জেনেক্স ইনফোসিস বাংলাদেশের বৃহত্তম কল সেন্টার পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। কোম্পানিটি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ২০১৯ সালে। জেনেক্স ইনফোসিসকে ‘বি’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই। ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। কোম্পানিটিকে ‘জেড’ ক্যাটাগরি থেকে ‘বি’ ক্যাটাগরিতে পাঠানো হয়েছে; যা গত ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়। মূলত ‘বি’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তরের কারণ হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ব্যবসায় ৩ শতাংশ লভ্যাংশ বিতরণকে উল্লেখ করা হয়।
এ কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ১২০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। সে হিসাবে কোম্পানিটির শেয়ার সংখ্যা ১২ কোটি ৪ লাখ ৫০ হাজার ২১টি।
চলতি হিসাববছরের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত কোম্পানিটির উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে ৩০.০৫ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ১৯.৯৮ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে ০.০৯ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৪৯.৮৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।
জানা গেছে, জেনেক্স ইনফোসিসের গত ২১ সেপ্টেম্বর শেয়ার দর ছিল ২৩ টাকা ৯০ পয়সা। আর গত ৭ অক্টোবর লেনদেন শেষে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম দাঁড়িয়েছে ৩০ টাকা ৫০ পয়সা। ১৫ কার্যদিবসে শেয়ারটির দর বেড়েছে ৬ টাকা ৬০ পয়সা বা ২৭.৬২ শতাংশ।
এদিকে সোনালী পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলস লিমিটেডের শেয়ার নিয়ে কারসাজির দায়ে জেনেক্স ইনফোসিস লিমিটেডের চেয়ারম্যান আদনান ইমামসহ ৯ জনকে গত ১৬ সেপ্টেম্বর জরিমানা করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
ইউনুস গ্রপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের একটি প্রতিষ্ঠান হলো সোনালী পেপার; যা ১৯৭৭ সাল থেকে কাগজ এবং বোর্ড পণ্য উৎপাদন করে আসছে।
২০২২-২৩ অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানিটির রাজস্ব বেড়েছে ১৭ শতাংশ, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে কোম্পানির নিট মুনাফা ৯০ শতাংশ বেড়েছিল।
এছাড়া কোম্পানির অপারেশনাল আয় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা হয়েছে; অন্যান্য আয় ১১২ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ২৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
কর পরিশোধ এবং ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ডের পর কোম্পানির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২৩ কোটি ১৪ লাখ টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১২ কোটি ১৮ লাখ টাকা।
২০২১-২২ অর্থবছরে, কোম্পানির লাভ হয়েছিল ১৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা; সে বছর কোম্পানি শেয়ারহোল্ডারদের ৪০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল।
১৯৮৫ সালে কোম্পানিটি ডিএসইতে তালিকাভুক্ত হলেও, ২০২০ সালে এসে শেয়ারবাজারে পুনঃতালিকাভুক্ত হয়।
মিডিয়া লাইনার, সিমপ্লেক্স, ডুপ্লেক্স পেপার বোর্ড এবং লেখার কাগজ তৈরি ও বিপণনের মাধ্যমে ব্যবসা শুরু করে কোম্পানিটি।
তবে ক্রমাগত লোকসানের কারণে, ২০০৬ সাল পর্যন্ত কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ রাখে পূর্ববর্তী ব্যবস্থাপনা। এরপর মোহাম্মদ ইউনুস ও তার পরিবার ২০০৭ সালে কোম্পানিটির পুরো শেয়ার কিনে নেয় এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে কোম্পানি আবারও করে চালু করে।
ডিএসইর তথ্য মতে, সোনালী পেপারের গত ২১ সেপ্টেম্বর শেয়ার দর ছিল ২৪৯ টাকা ২০ পয়সা। আর গত ৭ অক্টোবর লেনদেন শেষে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম দাঁড়িয়েছে ২৯৫ টাকা ৩০ পয়সায়। ১৫ কার্যদিবসে শেয়ারটির দর বেড়েছে ৪৬ টাকা ১০ পয়সা বা ১৮.৫০ শতাংশ।
২০০৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের। ‘এ’ ক্যাটাগরির এই কোম্পানিটির অনুমোদিত মূলধন ১০০ কোটি টাকা। পরিশোধিত মূলধন ৩২ কোটি ৫৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। শেয়ার সংখ্যা তিন কোটি ২৫ লাখ ৪৫ হাজার ২৮৮টি। চলতি বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত সময়ে কোম্পানিটির উদ্যোক্তা পরিচালকদের হাতে ৪০ দশমিক ৬২ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ২২ দশমিক ৬৮ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৩৬ দশমিক ৭০ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।
প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য আবদুল আউয়াল মিন্টু। তিনি প্রতিষ্ঠানটির সাবেক চেয়ারম্যান। বর্তমানে খলিলুর রহমান চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন।
ডিএসইর তথ্যমতে, প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের গত ২২ সেপ্টেম্বর শেয়ার দর ছিল ৫৭ টাকা ৩০ পয়সা। আর গত ৭ অক্টোবর লেনদেন শেষে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম দাঁড়িয়েছে ৮০ টাকা ৭০ পয়সা। ১৫ কার্যদিবসে শেয়ারটির দর বেড়েছে ৪০ টাকা ৮৪ পয়সা বা ৪৩ শতাংশ।
পুঁজিবাজারে সেবা ও আবাসন খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট লিমিটেড। সমাপ্ত ২০২৩-২৪ হিসাববছরে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের জন্য ১৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে। আলোচ্য হিসাববছরে কোম্পানিটির সমন্বিত ইপিএস হয়েছে ১ টাকা ৭৫ পয়সা, আগের হিসাববছরে যা ছিল ১ টাকা ২২ পয়সা। গত ৩০ জুন কোম্পানিটির সমন্বিত এনএভিপিএস দাঁড়িয়েছে ৩৩ টাকা ৭১ পয়সায়।
২০২২-২৩ হিসাববছরে কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের ১২ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। আলোচ্য হিসাববছরে কোম্পানিটির সমন্বিত ইপিএস হয়েছে ১ টাকা ২২ পয়সা, আগের হিসাব বছরে যা ছিল ১ টাকা ১৯ পয়সা। গত ৩০ জুন শেষে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি সমন্বিত এনএভিপিএস হয়েছে ৩৩ টাকা ১১ পয়সায়।
চলতি বছরের জানুয়ারির তথ্যমতে, ২০০৮ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সামিট অ্যালায়েন্স পোর্টের অনুমোদিত মূলধন ৩০০ কোটি ও পরিশোধিত মূলধন ২৩৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা ছিল। রিজার্ভে রয়েছে ৫৫৯ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। মোট শেয়ারসংখ্যা ২৩ কোটি ৬৮ লাখ ৬৭ হাজার ১২৩। এর মধ্যে ৫৯ শতাংশ উদ্যোক্তা পরিচালক, ১২ দশমিক ২৬ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, ৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ বিদেশি ও বাকি ২৪ দশমিক ৬৯ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে।
জানা গেছে, সামিট অ্যালায়েন্সের গত ৯ সেপ্টেম্বর শেয়ার দর ছিল ৩১ টাকা ১০ পয়সায়। আর গত ৭ অক্টোবর লেনদেন শেষে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম দাঁড়িয়েছে ৪৪ টাকা ১০ পয়সায়। ১৫ কার্যদিবসে শেয়ারটির দর বেড়েছে ১৩ টাকা বা ৪১.৮০ শতাংশ।
এভাবে কোম্পানিটিগুলোর শেয়ারের দাম বাড়াকে অস্বাভাবিক বলে মনে করছে ডিএসই কর্তৃপক্ষ।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ছাড়াই হঠাৎ দর বাড়া ঝুঁকির ইঙ্গিত বহন করতে পারে।
প্রিন্ট করুন










Discussion about this post