প্রথম পাতা

আইনহীন সমাজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা-শাহদীন মালিক

নিজস্ব প্রতিবেদক: ‘উদ্বেগের জায়গা হচ্ছে, আমরা টোটালি ‘ল’ লেস সোসাইটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। যেখানে কোনো আইন নেই, আমাদের নিরাপত্তাবোধ থাকবে না, অন্যায়-অপরাধ হলে আইন অনুযায়ী কোনো বিচার হবে না। আমরা কিন্তু প্রতিদিন সেদিকেই এগোচ্ছি’-্এমনটাই মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক।
গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে মৌলিক অধিকার সুরক্ষা কমিটি আয়োজিত জোরপূর্বক গুম বিষয়ে বাংলাদেশের বাস্তবতা ও জাতিসংঘের সুপারিশ শীর্ষক আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। নারীপক্ষের আহ্বায়ক শিরিন হকের সভাপতিত্বে সভায় উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. সি আর আবরার, আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল প্রমুখ।
যারা সরকার চালান, তারা কি সব চোখ বুজে থাকেনÑএমন প্রশ্ন রেখে শাহদীন মালিক বলেন, যেসব দেশে আশির দশকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা গুম শুরু হয়েছিল, সেসব দেশে কী হয়েছিল, সেগুলো তারা দেখেন না কেন? ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা হচ্ছে সেন্ট্রাল আমেরিকা থেকে জনগণ আমেরিকায় চলে আসা। হন্ডুরাস, গুয়েতেমালা, নিকারাগুয়েÑএসব দেশ থেকে হাজার হাজার, লাখ লাখ লোক আমেরিকায় আসতে চাইছে, আর ট্রাম্প তাদের ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। আশির দশকে এসব দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড শুরু হয়েছিল, এরই ফল হচ্ছে এগুলো।
তিনি বলেন, এ লোকগুলো আমেরিকায় আসছে কেন? তাদের সবারই কথা অনেকটা আমাদের রোহিঙ্গাদের মতো। দেশে তাদের কোনো নিরাপত্তা নেই, তারা সম্পূর্ণ অসহায়, সাংঘাতিক ধরনের অপরাধ হচ্ছে, তারপরও সরকার তাদের কোনো সাহায্য করে না। জানে বাঁচতে তারা আমেরিকায় যাচ্ছে। এ সমস্যাটা ৭০ দশকে চিলিতে দেখা দিয়েছিল। কোনো দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা গুম শুরু হলে এর পরিণতি যে কি হয়, তার বড় উদাহরণ হচ্ছে সেন্ট্রাল আমেরিকার দেশগুলো।
এ আইনজীবী বলেন, আশির দশকে সেন্ট্রাল আমেরিকার দেশগুলোর লোকজনও বলেছিল, সেসব দেশের বিচারব্যবস্থায় কিছু হয় না, কিছু ত্বরিত বিচার হলে তথা অপরাধীকে সরিয়ে দিলে অপরাধ দূর হয়ে যাবে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, কোনো সমাজ এ পথে গিয়ে অপরাধ দূর করতে পারেনি। বরং সেক্ষেত্রে পুরো সমাজটাই অপরাধপ্রবণ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ক্যাসিনো ব্যবসা পুলিশের নাকের ডগায় হচ্ছে; অথচ পুলিশ বলছে তারা জানে না! চারদিকে দুর্নীতি হচ্ছে। এসব পচন শুরু হয়েছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুম দিয়ে। এক্ষেত্রে বড় উদ্বেগ হচ্ছে, এর আগে যেসব দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুম হয়েছে, তাদের থেকে আমরাও ভবিষ্যতের চিত্র দেখতে পাই। কিন্তু সে সমাজ আমাদের কারও কাম্য নয়।
তিনি বলেন, সমাজে অবশ্যই অপরাধ-অনিয়ম আছে, বিশৃঙ্খলা রয়েছে। তবে কোনো সমাজই আইনের বাইরে গিয়ে এসব সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। অনেক দেশই মূর্খের মতো এটি ভেবেছে কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। আমাদের দেশেও একটা ভাবনা এসেছে যে, দু-চারশ মানুষকে গুলি করে হত্যা করলেই মাদক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এটা মোটেও সম্ভব নয়। কারণ, এর আগে কোনো দেশ এ পথে অপরাধ দমন করতে পারেনি। কিন্তু এর প্রতিক্রিয়া হয় ভয়াবহ।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে কোনো দেশের সরকারপ্রধান কি বাংলাদেশে এসেছেন? ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে পড়তেন, তাই তিনি ২০১৯ সালে এসেছিলেন। আমাদের সরকারপ্রধানরা কি কোথাও যান? সম্মেলনে যান, ওয়ান টু ওয়ান ভিজিট আজকাল আর হয় না। হ্যাঁ, মালদ্বীপে গেলে হয়তো হবে। আন্তর্জাতিক সম্মেলন ছাড়া আমরা কোথাও দাওয়াত পাই না। দিল্লিতে বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী রয়েছেনÑএটাও কিন্তু একটি সম্মেলন।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কী অবস্থা? বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা কেউ বাংলায় কথা বলতে পারেন না! ছাত্রলীগের কী অবস্থা? যে সমাজ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা গুমের মাধ্যমে অপরাধ দমন করতে চায়, সে সমাজের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়তে বাধ্য। এখন আমরা ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছি। এরপর আর দুই পা দিলেই কিন্তু গভীর খাদ। এটা আমাদের বুঝতে হবে।
আসিফ নজরুল বলেন, গুমের অপরাধের দায় সরকারের। বেশিরভাগ গুম যদি সরকার না করে থাকে, তাহলে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা র?্যাব-পুলিশের নাম বলে কেন? কেন গুমের ঘটনায় মামলা নেওয়া হয় না? মামলা নিলেও গড়িমসি কেন, অগ্রগতি হয় না কেন? যারা ফিরে আসেন, তারা মুখে তালা দেন কেন? পুলিশ কেন জানতে চায় নাÑগুম হওয়া ব্যক্তিরা কোথায় ছিলেন। সুতরাং বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, বেশিরভাগ গুমের ঘটনায় সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জড়িত। তিনি বলেন, দেশে আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, ভোটাধিকার, গণতন্ত্রÑঅনেক কিছুই গুম হয়েছে।
অধ্যাপক সি আর আবরার বলেন, গুম-বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে যত আলোচনাÑসবই অরণ্যে রোদন। যাদের এসব ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া দেখানোর কথা, সেই সরকার কোনো সাড়া দিচ্ছে না। তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। তিনি বলেন, সরকার এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিলে অস্বীকার করার প্রবণতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। গুমকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতেরও করণীয় আছে।
অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মৌলিক অধিকার সুরক্ষা কমিটির সদস্য রেজাউর রহমান। তিনি বলেন, জাতিসংঘের বিভিন্ন কমিটির প্রশ্ন ও উদ্বেগ থাকলেও বাংলাদেশ সরকার গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী অনেক ক্ষেত্রে সরকারকে বিব্রত করার জন্য বা ব্যক্তিগত কারণে অপহরণ করা হচ্ছে। বিভিন্ন বিভাগীয় তদন্ত ও নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনার বিচারের উদাহরণ টেনে সরকার তাদের সোচ্চার ভূমিকা তুলে ধরার চেষ্টা করলেও তা মোটেও সন্তোষজনক নয়। বাস্তবতা হলো, অত্যন্ত আলোচিত ঘটনা, গণমাধ্যম ও মানবাধিকার কর্মীদের বলিষ্ঠ ভূমিকা, আদালতের হস্তক্ষেপ ছাড়া অধিকাংশ গুম-বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ঘটনায় কোনো প্রতিকার পাওয়া যায় না।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..