দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

আইন প্রয়োগের দায়িত্ব আসলে কার?

মোশারফ হোসেন: একটি দেশের আইন সে দেশের নাগরিকদের জন্য রাষ্ট্রীয় বিধান। আইন মূলত ‘কী করা যাবে’ তা বিধিবদ্ধ করার পাশাপাশি ‘কী করা যাবে না’ তা অধিকতর জোরালোভাবে বিধিবদ্ধ করে। তাই উভয় দিক বিবেচনায় আইন মানুষের জীবন, আচরণ, কর্ম প্রভৃতির বিধিনিষেধও বটে। একটি সভ্য দেশের নাগরিক সে দেশে প্রচলিত সব আইন-কানুন মেনে চলতে বাধ্য। আর বাধ্য বলেই আইন মান্যের জন্য কোনো বিশেষ পুরস্কার না থাকলেও আইন অমান্যের জন্য রয়েছে শাস্তি ও জরিমানার বিধান।

আশরাফুল মাখলুকাত মানুষের জন্য আইন তৈরি হয়। তাই জ্ঞান ও বিবেকসমৃদ্ধ এই মানুষ আইন মেনে চলবে, এটাই তো প্রত্যাশিত। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষের আইনের চর্চা দেখলে হতাশই হতে হয়। আইন হাতে তুলে নেওয়া, আইনের তোয়াক্কা না করা এবং আইন না জানা মানুষের সংখ্যাই যেন বেশি। তাই হতাশ হয়ে ভাবি, আইন অমান্যে শাস্তির বিধানের পাশাপাশি আইন মান্যেও যদি পুরস্কারের বিধান থাকত, তাহলে আমাদের দেশে আইনের চর্চা হয়তো আরও বেশি হতো। এর সঙ্গে দেশের মানুষ সুশিক্ষিত, সামাজিক, দেশপ্রেমিক, ধর্মভীরু তথা সুশীল হলে এবং আইন তৈরিতে সদিচ্ছা ও প্রয়োগে জবাবদিহি থাকলে দেশের প্রতিটি আইনই তার ঈপ্সিত  সুফল পেত।          

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদমতে, আইন অর্থ হচ্ছে: ‘কোনো আইন, অধ্যাদেশ, বিধি, প্রবিধান, উপ-আইন, বিজ্ঞপ্তি ও অন্যান্য আইনগত দলিল এবং বাংলাদেশে আইনের ক্ষমতাসম্পন্ন যেকোনো প্রথা বা রীতি।’ এ আইন দিয়েই ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের করণীয় নির্ণীত হয়। এছাড়া রাষ্ট্রের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, যেমন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মৌখিক নির্দেশনাও নাগরিকদের জন্য অবশ্যকরণীয়।                  

গত বছর (২০১৯) জুনে সংসদে আইনমন্ত্রীর দেওয়া তথ্যমতে, ১৭৯৯ সাল থেকে ২০১৯ সালের ১০ জুন পর্যন্ত দেশে প্রচলিত আইনের সংখ্যা এক হাজার ১৪৮টি। যদিও বিশেষায়িত আইনগুলো সবার জন্য প্রযোজ্য নয়, তবুও আমাদের দেশের আইনের আধিক্যে ধরে নিতে পারি, আমাদের নাগরিকদের আচরণ অধিকতর সুশৃঙ্খল ও রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত। কিন্তু আইনের আধিক্য নাগরিকদের আনুগত্যের আধিক্য নির্দেশ করে, নাকি একটি রাষ্ট্রের আইনের অকার্যকারিতাও প্রমাণ করে এটা গবেষণার বিষয়, বিতর্কের বিষয়। কিন্তু আমার সিক্সথ সেন্স বলে, দেশে আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং সাধারণ নাগরিকদের আইনের প্রতি স্বেচ্ছা আনুগত্য থাকলে এত আইন প্রণয়নের আদৌ হয়তো প্রয়োজন হতো না। অলিখিত সংবিধান দিয়ে ব্রিটেনের মতো দেশ পরিচালিত হচ্ছে; কিন্তু আমাদের দেশের সংবিধান লিখিত, আইনের সংখ্যা এক হাজারের অধিক; এরপরও আমরা আইন জানি না, আইন মানি না।

একজন মানুষ যদি আরেকজন মানুষকে সজ্ঞানে খুন করে, তাহলে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা অনুযায়ী তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং তাকে অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত করা যাবে। কিন্তু খুনি ব্যক্তিটি খুন করার পর যদি বলে, ‘দণ্ডবিধি তো আমি পড়িনি, ৩০২ ধারা তো আমার জানা নেই,’ তাহলে ছাড় পাবে কি? বইয়ে লেখা আইনের মতে, তার ছাড় পাওয়া অসম্ভব। তাকে শাস্তি পেতেই হবে। কিন্তু বইয়ে লেখা এই আইনের প্রয়োগকারীরা (আদালত, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী) যদি আইনের কালো হরফের নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করে, তাহলে ‘মানুষ খুনেরও’ কোনো শাস্তি হবে না।

অথবা, হতে পারে, মানুষ আইন মানে না বলেই আইনের প্রয়োগ হয় না। আর এটা যদি মেনে নিই, তাহলে আইন প্রয়োগের দায়িত্ব আসলে কার? এ দায়িত্ব কি তবে সাধারণ মানুষের ওপরেই ন্যস্ত হয়ে যাচ্ছে না? আর সত্যিকার অর্থে যদি তা-ই হয়, তাহলে তো শুধু আইন প্রণয়নের কেন্দ্র ‘সংসদ’ থাকলেই হয়। তারা আইন করে লিপিবদ্ধ করে বই আকারে রেখে দেবে, আর মানুষ বইয়ে লেখা আইন মতে চলবে। প্রয়োজন থাকবে না আদালত, পুলিশ, প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি ও সমাজপতিদের।

তবে আইনের সফল প্রয়োগের জন্য কিন্তু এই প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবদানকেই সবচেয়ে বড় করে দেখি আমি। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, বিরোধী দল ও মত দমনমূলক আইন প্রয়োগে আইন প্রয়োগকারী এসব পক্ষগুলোর যতটা তৎপরতা ও ক্ষিপ্রতা লক্ষ করা যায়, অন্য আইনগুলোর বাস্তবায়নে এমন একনিষ্ঠতাই তো স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু বাস্তবে এমনটা হচ্ছে না বলে অন্যসব আইনের লঙ্ঘনের ঘটনাও অনেক বেশি। ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫’-এর ধারা ৪ এ বর্ণিত পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে ধূমপানবিষয়ক নির্দেশনাটি দেশের ক’জন ধূমপায়ী মেনেছে, কিংবা এই ধারাটির প্রয়োগ নিশ্চিত করতে কী ভূমিকাই-বা রেখেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা? উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো ভূমিকা দেখেছি বলে আমার মনে পড়ে না। খুব নগণ্য শাস্তি আর জরিমানার বিধানও হয়তো আইনের এই ধারাটির বিফলতার অন্যতম কারণ। কারণ আইনের শাস্তি নগণ্য বা তুচ্ছ পরিমাণ হলে সে আইনের প্রয়োগে ঢিলেমি চলে আসে, পরিপালনেও ‘ডোন্ট কেয়ার’ ভাব চলে আসে। ‘সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮’ অনুযায়ী মাস্ক না পরার শাস্তি সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা। কিন্তু এই আইনেই মাস্ক না পরার কারণে একজনকে কেবল ৫০ টাকা জরিমানা করলে তা মানুষকে আইন মানতে বাধ্য করার চেয়ে আইন ভাঙতেই যেন উৎসাহ জোগায়।

করোনাকালের গত চার মাসে মানুষ মাস্ক পরতে পরতে ক্লান্ত হয়ে এখন অনেকেই যেখানে মাস্ক পরা ছেড়ে দিয়েছে, কেউ আবার পরলেও সেটা দিয়ে নাক ঢাকে না, অথবা নাক-মুখ কোনোটাই না ঢেকে থুতনিতে নামিয়ে রাখে, সেখানে আবার ২১ জুলাই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এক পরিপত্রের মাধ্যমে ১১টি ক্ষেত্রে মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে আদেশ জারি করেছে। এ আদেশটি অবশ্যই সময়োপযোগী। কিন্তু আদেশ জারির পরদিন বিকালে রাস্তার পাশে আমার বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাজারে আসা-যাওয়া করা ১০০ মানুষের মাস্ক পরার চিত্র দেখলাম ৮০ শতাংশ মানুষের মুখে মাস্ক নেই, পাঁচ শতাংশ মানুষ মাস্ক নামিয়ে রেখেছে। অর্থাৎ সঠিক নিয়মে মাস্ক পরেছে মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষ। তার মানে হচ্ছে, এখানে আইন অমান্যের চিত্রই লক্ষ করলাম। তাই মনে প্রশ্ন জেগেছে কে নিশ্চিত করবে ১৬ কোটি মানুষের দেশের প্রতিটি মানুষের নাকে-মুখে এই মাস্ক পরার বিষয়টি? আমরা কি অতটাই অনুগত হয়ে গেছি যে, রাষ্ট্রীয় আদেশ পেলেই আমরা তা সুবোধ মানুষের মতো পরিপালন করি, নাকি মাসে একবার মোবাইল কোর্ট বসিয়ে জন দশেক মানুষকে ৫০-১০০ টাকা করে জরিমানা করলেই এ আদেশ বাস্তবায়িত হবে?

আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে মানুষকে যেমন আইন জেনে আইনের প্রতি সচেতন ও শ্রদ্ধাশীল হতে হবে, ঠিক তেমনিভাবে বিচার বিভাগ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকেও তাদের যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে। তবে আইন মানার জন্য এর সঠিক প্রয়োগই সবচেয়ে বড় মহৌষধ। আইন যদি প্রয়োগ করা না হয়, তাহলে সে আইন তৈরি করা কোনো অর্থ বহন করে না। প্রকৃতপক্ষে প্রয়োগহীন যেকোনো আইন দন্তবিহীন ব্যাঘ্রের ন্যায়। আইনের প্রয়োগ হলেই তা দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করে এবং অবাধ্য ও দুষ্কৃতকারীদের মনে ভয়ের সৃষ্টি করে। তাই আশা করছি, এই করোনাকালে মাস্ক পরা নিশ্চিত করাসহ সব স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন ও মানুষের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাই নিজ নিজ ভূমিকা পালন করবে। নাহলে মনে হবে আইন তৈরি করা হয় শুধু ভাঙার জন্যই, মানার জন্য নয়।

ব্যাংকার, ফ্রিল্যান্স লেখক

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..