প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

আইন ভেঙে শ্রমিকদের ঠকাচ্ছে ডরিন পাওয়ার

পলাশ শরিফ: শ্রম আইনে কোম্পানির কর-পূর্ববর্তী মুনাফার পাঁচ শতাংশ শ্রমিক অংশীদারিত্ব তহবিলে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তার পরও কিছু কোম্পানি নানা অজুহাত দিয়ে শ্রমিকদের মুনাফার অংশ থেকে বঞ্চিত করছে। তেমনি একটি কোম্পানি ডরিন পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড সিস্টেমস লিমিটেড (ডিপিজিএসএল)।
আইনি বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি চেয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের কোম্পানির মালিকদের অ্যাসোসিয়েশনের করা আবেদনের দোহাই দিয়ে শ্রমিকদের ঠকাচ্ছে কোম্পানিটি। ২০১৪ সাল থেকে আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের মুনাফার অংশের জন্য সঞ্চিতি রাখা হচ্ছে না। এটি শ্রম আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তারপরও দায়িত্বশীল সংস্থাগুলো কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০১৯ সালের জুন শেষ হওয়া আর্থিক বছরে আইন মেনে শ্রমিক অংশীদারিত্ব তহবিলে সঞ্চিতি রাখেনি ডরিন পাওয়ার। এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান। এর আগে ২০১৮ পঞ্জিকা বছরের ৩০ জুন শেষ হওয়া আর্থিক বছরে প্রায় ৮৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা কর-পরবর্তী মুনাফা করেছিল পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বেসরকারি খাতের লাভজনক কোম্পানি ডরিন পাওয়ার।
আইন অনুযায়ী, ওই অর্থের পাঁচ শতাংশ হিসেবে প্রায় চার কোটি ১৬ লাখ টাকা শ্রমিক অংশীদারিত্ব তহবিলে জমা করার কথা। কিন্তু ওই অর্থবছরে কোনো অর্থই জমা দেয়নি কোম্পানিটি। একইভাবে ২০১৭ সালেও প্রায় ৭৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা কর-পরবর্তী মুনাফার বিপরীতে প্রায় তিন কোটি ৭৪ লাখ টাকার বদলে ডব্লিউপিপিএফের জন্য মাত্র ৭৭ লাখ টাকা প্রভিশন রেখেছে কোম্পানিটি।
এভাবে ডব্লিউপিপিএফের জন্য আইনে নির্দেশিত হারে অর্থ প্রভিশন না রাখায় শ্রমিকরা বঞ্চিত হয়েছে। অন্যদিকে শ্রমিকের পাওনার অংশ কর-পরবর্তী মুনাফায় যুক্ত হওয়ায় কোম্পানির মুনাফার অঙ্ক অতিরঞ্জিত হয়েছে। আইন পালনে অব্যাহতির জন্য সরকারের নির্দেশনা চেয়ে পাঠানো চিঠি নিষ্পত্তির দোহাই দিয়ে শ্রমিকের প্রাপ্য অংশ ওই তহবিলে কোনো অর্থ দিচ্ছে না কোম্পানিটি। এজন্য কোনো নির্দিষ্ট প্রভিশনও রাখা হচ্ছে না। উল্টো শ্রমিকের প্রাপ্য অংশকে মুনাফার সঙ্গে যোগ করে মুনাফার অঙ্ক বাড়িয়ে দেখানো হচ্ছে।
শ্রমিকদের মুনাফার অংশ না দেওয়া প্রসঙ্গে ডরিন পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড সিস্টেমসের কোম্পানি সচিব মাসুদুর রহমান ভুঁইয়া শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আমরা আর্থিক প্রতিবেদনেই এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছি। এর বাইরে আলাদা করে কিছু বলার নেই।’
এদিকে আর্থিক প্রতিবেদনে এ-সংক্রান্ত ব্যাখ্যায় বিবৃত করা হয়েছে, ‘শ্রমিকদের মুনাফার অংশ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি চেয়ে ২০১৭ সালের মার্চে বাংলাদেশ ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন (বিআইপিপিএ) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। ওই বছরের এপ্রিলে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে চিঠি পাঠিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়। বিষয়টি এখনও বিবেচনাধীন রয়েছে।’ এর জের ধরে ২০১৭ সালের এপ্রিল থেকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত শ্রমিকদের মুনাফায় অংশগ্রহণ তহবিলের (ডব্লিউপিপিএফ) জন্য সঞ্চিতি না রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদ্যমান আইন পরিপালন থেকে অব্যাহতি পাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রত্যেকটি কোম্পানি শ্রম আইন মেনে শ্রমিক অংশীদারিত্ব তহবিলে মুনাফার অংশ জমা দিতে বাধ্য। যদি সেই অর্থ বিতরণ না করা হয়, সে ক্ষেত্রে প্রভিশন হিসেবে রাখতে হবে। তা না করে শুধু একটি আবেদনের দোহাই দিয়ে শ্রমিকদের মুনাফার অংশ না দেওয়া শ্রম আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এ বিষয়ে যথাযথ মনিটরিং না থাকার সুযোগে কিছু কোম্পানি শ্রমিকদের ঠকিয়ে যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ডরিন পাওয়ার জেনারেশনের ৬৬ দশমিক ৬১ শতাংশ শেয়ার কোম্পানিটির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে রয়েছে। এর বাইরে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ২০ দশমিক ৮৭ শতাংশ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে শূন্য দশমিক শূন্য সাত শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ১২ দশমিক ৪৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।

সর্বশেষ..