আনোয়ার হোসাইন সোহেল : পুঁজিবাজারে ট্যানারি খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি ফরচুন সুজ লিমিটেডের শেয়ার কারসাজিতে জড়িত রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এরই ধারাবাহিকতায় পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছে আইসিবির কর্মকর্তাদের নামের তালিকা চেয়ে পাঠায় অর্থ মন্ত্রণালয়। সে অনুযায়ী ৯ কর্মকর্তার তালিকা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠিয়েছে বিএসইসি।
সম্প্রতি বিএসইসি থেকে এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
তথ্য মতে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএসইসিকে ফরচুন সুজ লিমিটেডের শেয়ারের দাম কারসাজির সঙ্গে জড়িত আইসিবি কর্মকর্তাদের নামের একটি তালিকা সরবরাহ করতে বলেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এর আগে বিএসইসি থেকে পাঠানো একটি তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ফরচুন সুজ লিমিটেডের শেয়ার নিয়ে কারসাজিতে বিএসইসির তদন্তে আইসিবির কর্মকর্তার নাম উঠে আসে। তবে সেখানে তাদের পদ এবং স্পষ্ট পরিচয় লেখা হয়নি। তাই আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিএসইসির কাছে শেয়ার কারসাজির সঙ্গে জড়িত আইসিবির কর্মকর্তাদের নামের একটি তালিকা চেয়ে পাঠায়।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফরচুন সুজের শেয়ারদর অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানোর পেছনে একটি সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, সমবায় অধিদপ্তরের উপ-নিবন্ধক মো. আবুল খায়ের (হিরু) আইসিবির কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে বাজারে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে শেয়ারদর বাড়ান। এ সময় আইসিবি ফরচুন সুজের শেয়ারগুলো উচ্চমূল্যে হিরুর কাছ থেকে কিনে নেয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৪৪ কোটি টাকার আর্থিক লোকসান হয়। এ ঘটনায় তৎকালীন আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল হোসেনসহ অন্যান্য কর্মকর্তা সরাসরি জড়িত ছিলেন এবং সুবিধাভোগ করেছেন।
বিএসইসির চিঠিতে লেখা হয়েছে, পুঁজিবাজারে ফরচুন সুজ লিমিটেডের শেয়ার লেনদেনে কারসাজিতে সংশ্লিষ্টতা থাকায় আইসিবির জড়িত কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। কারসাজিতে জড়িত আইসিবির কর্মকর্তারা হলেনÑসাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল হোসেন, উপমহাব্যবস্থাপক মো. আশরাফুল ইসলাম, উপমহাব্যবস্থাপক তোরাব আহমেদ খান চৌধুরী, অবসরপ্রাপ্ত উপমহাব্যবস্থাপক মো. মাসুদুল হাসান, উপমহাব্যবস্থাপক রোকসানা ইয়াসমিন, উপমহাব্যবস্থাপক বাবুল চন্দ্র দেবনাথ, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাহমুদা আক্তার, অতিরিক্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহাবুব উল-আলম এবং অবসরপ্রাপ্ত উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক আলম।
চিঠিতে বলা হয়েছে, আইসিবিতে রেফার করা পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট কমিটির তৎকালীন সদস্য ছিলেন তারা। এ প্রসঙ্গে কমিশনের চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি জারি করা চিঠিতে আইসিবির তিনজন কর্মকর্তা ছাড়া ৯ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হয়েছে।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইসিবির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগ বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধাক্কা দিতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে আইসিবির কর্মকর্তারা নিজেদের প্রভাবশালী হিসেবে ভাবতেন এবং পূর্ববর্তী সরকারের সময়েও তারা নানা অনিয়ম করে পার পেয়ে গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে এর আগে কখনোই কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তাদের মতে, আইসিবির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ পুঁজিবাজারের ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। এর মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, পুঁজিবাজারে অনিয়ম-দুর্নীতি করলে কারও ছাড় নেইÑরাষ্ট্রীয় কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যা-ই হোক না কেন, অন্যায় করলে তার জবাবদিহি করতেই হবে।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সময়ে কারসাজির আগে আইসিবি থেকে বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বেশ কিছু কোম্পানির শেয়ার বেচা হয়। পরে আবার সেই শেয়ারই কমিশনের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে। এতে সরকারি টাকা খরচ করে নিজেরা বড় আয় করেছেন।
বিএসইসির মুখপাত্র ও পরিচালক আবুল কালাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘আইসিবি সরকারি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, তাই কমিশন সরাসরি তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে না। এজন্যই অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে বিস্তারিত অনুসন্ধান ও তদন্ত প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় অর্থ মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। বিএসইসি এই কঠোর পদক্ষেপ পুঁজিবাজারে একটি শক্তিশালী দৃষ্টান্ত তৈরি করবে।’
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post