প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

আইসিবি থেকে ইইএফ সহায়তা নিয়ে আত্মসাৎ

বিএম এগ্রো বেজড ইন্ডাস্ট্রিজ

সাইফুজ্জামান সুমন: রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ সংস্থা ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) থেকে ইইএফ সহায়তা নিয়ে আত্মসাৎ করেছে ‘বিএম এগ্রো বেজড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। বরিশালের এ নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করেছে আইসিবি। সেই মামলায় প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরিচালকরা পলাতক রয়েছেন। অর্থ জালিয়াতি ও আত্মসাৎ প্রমাণিত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরিচালকদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে।

আইসিবি সূত্রমতে, আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও শিল্পায়নের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে সরকারের অর্থায়নে ২০০০ সালে সমমূলধন উন্নয়ন তহবিল ইকুইটি ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (ইডিএফ) গঠন করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০০১ সালে ফান্ডের নাম পরিবর্তন করে ইকুইটি অ্যান্ড এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ ফান্ড (ইইএফ) করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৯ সালের ৩১ মে পর্যন্ত সরকারের এজেন্ট হিসেবে এ ফান্ড ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে আসছে। ২০০৯ সালের ১ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইসিবি এর মধ্যে সাব এজেন্সি চুক্তি অনুযায়ী ইইএফ ফান্ডের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেয়া হয় আইসিবিকে। কৃষি ও আইসিটিভিত্তিক প্রকল্প বাস্তবায়নে এ ফান্ড থেকে বিনিয়োগ করা হচ্ছে।

সূত্র আরও জানায়, আর্থিক মূলধন গঠনের জন্য বরিশালের বিএম এগ্রো বেজড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের কর্মকর্তারা ইইএফ ফান্ড থেকে ইইএফ সহায়তার জন্য আবেদন করেন। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মো. আব্দুল গণি, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাফর ইকবালের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে শর্তসাপেক্ষে এক কোটি ২৫ লাখ ৯৮ হাজার টাকা মঞ্জুর হয়। ইইএফ সহায়তার অর্থ নিতে প্রতিষ্ঠান ও আইসিবির মধ্যে চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী বিএম এগ্রোর মালিক পক্ষ ২০১১ সালের ৯ মে মঞ্জুরি করা অর্থের প্রথম কিস্তি হিসেবে চেকের মাধ্যমে ৩৭ লাখ টাকা উত্তোলন করে নিয়ে যায়। তবে শর্তানুযায়ী, প্রথম কিস্তির উত্তোলন করা টাকা কীভাবে, কোথায় ব্যবহার হয়েছে, টাকা ব্যবহারে কোনো সভা হয়েছে কিনাÑতার কিছুই আইসিবি কর্তৃপক্ষকে জানায়নি। এমনকি প্রতিষ্ঠানের বোর্ড সভার কোনো রেজুলেশন জমা দেয়নি।

দ্বিতীয় কিস্তির টাকা উত্তোলনের জন্য কোনো আবেদনও জমা দেয়নি প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। পরবর্তী সময়ে আইসিবি কর্তৃপক্ষ খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, বিএম এগ্রো একটি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি ইইএফ সহায়তার প্রথম কিস্তির উত্তোলন করা ৩৭ লাখ টাকা প্রকল্পের কাজে ব্যবহার বা বিনিয়োগ না করে আত্মাসাৎ করেছে। পরে বিএম এগ্রো থেকে সরকারের নামে ইস্যু করা শেয়ারের অর্থ অর্থাৎ সহায়তার প্রথম কিস্তি হিসেবে নেয়া ৩৭ লাখ টাকা ফেরত প্রদানে আইসিবির ইইএফ ফান্ড উইং থেকে প্রতিষ্ঠানকে ২০১৬ সালের ২০ জুলাই নোটিস দেয়া হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ সেই টাকা জমা দেয়নি। একই বছরের ২৯ নভেম্বর প্রতিষ্ঠানকে ডাকযোগে লিগ্যাল নোটিস পাঠানো হয়। ৩ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, এমডি ও পরিচালকদের বাড়িতে গিয়ে আইসিবির পক্ষ থেকে লিগ্যাল নোটিস পৌঁছে দেয়া হয়। তবে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ ৩৭ লাখ টাকা পরিশোধ করবে বলে জানায়। অর্থ আত্মাসাৎ করায় বিএম এগ্রোর বিরুদ্ধে মামলা করে আইসিবি কর্তৃপক্ষ। যাতে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল গনি, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাফর ইকবাল, পরিচালক মো. মোজাম্মেল ও মো. মিরাজুম মনিরকে আসামি করা হয়।

মামলার পর প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ জানায়, ইইএফ সহায়তার প্রথম কিস্তির টাকা ফিনিক্স ফাইন্যান্সের নামে চেক ইস্যু করেছে। তারা কোনো টাকা পায়নি। তবে ফিনিক্স ফাইন্যান্সের সঙ্গে বিএম এগ্রোর একটি চুক্তি রয়েছে বলে জানায় প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। মামলার পর প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল গনি ৩৭ লাখ টাকার মধ্যে এক লাখ ৪৮ হাজার টাকা চেকের মাধ্যমে পরিশোধ করেছেন।

বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে চলতি বছরের ১০ মে বরিশাল সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এসএম মাহফুজ আলম মামলার রায় দেন। যাতে অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানের মো. আব্দুল গনি চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাফর ইকবাল ও পরিচালক মো. মিরাজুম মনিরকে দোষী সাব্যস্ত করে। তিনজনকে ৫ বছর করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড অনাদায়ে দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। আর মৃত্যুবরণ করায় পরিচালক মো. মোজাম্মেল হককে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল গনিকে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরিচালক পলাতক রয়েছেন।

এ বিষয়ে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, কৃষি ও আইসিটিভিত্তিক প্রকল্প বাস্তবায়নে ইকুইটি অ্যান্ড এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ ফান্ড (ইইএফ) বিনিয়োগ করে থাকি। এখানে কোনো প্রতিষ্ঠান অর্থ জালিয়াতি বা আত্মসাৎ করলে আমরা সরাসরি অর্থ ঋণ আদালতে মামলা করতে পারি না। ইতোমধ্যে আমরা ২২১টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চুক্তি ভঙ্গের মামলা দায়ের করেছি এবং ৩০০ প্রতিষ্ঠানের মামলা প্রক্রিয়াধীন। সরকারের টাকা আদায়ের জন্য আইসিবির  পক্ষ থেকে আমরা কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। অর্থ আত্মসাৎ করে কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষের পালিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।