দুরে কোথাও

আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় পাদদেশে জাদুকাটা নদী

দুই দফা তারিখ পরিবর্তন। ফেসবুকে ঘোষণা দিয়েও যাওয়া হচ্ছে না। দূরের পথ, দলবেঁধে যেতে হবে এতে যেমন অর্থ সাশ্রয় হবে, তেমন ভ্রমণসঙ্গীদের সঙ্গে আড্ডাও হবে। আসতে না পারার জবাবদিহি আর নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস সৃষ্টির জন্য আবার প্রস্তুতি নেওয়া। ফেসবুকে নানা ট্যুর অপারেটরের চটকদার ইভেন্ট টাঙ্গুয়ার হাওরে জোছনা উৎসব। কোনোভাবেই ওইসব ইভেন্ট আমাকে টানে না। ইচ্ছে, সহকর্মীদের নিয়ে গ্রুপ ধরে যাব টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণে। সে লক্ষ্যে আটজনের দল নিয়ে যাত্রা শুরুর পরিকল্পনা চূড়ান্ত করি। তবু শেষ সময়ে বাস মিস করে দুজন।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যোগাযোগ করি। তাদের আন্তরিকতায় মুগ্ধ আমরা। সব ধরনের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন জেলা প্রশাসক আবদুল আহাদ। ১ সেপ্টেম্বর রাতে ছয় সদস্যের দলটি নিয়ে রাজধানীর কমলাপুর থেকে যাত্রা করি সুনামগঞ্জের উদ্দেশে, শ্যামলী পরিবহনে চড়ে।
সিলেট শহর হয়ে সুনামগঞ্জে পৌঁছাই সকালে। সার্কিট হাউজে উঠি। সেখানে আমরা ফ্রেশ হয়ে প্রাইভেট মাইক্রোবাসযোগে তাহেরপুরের উদ্দেশে যাত্রা করি।
গাড়ির ড্রাইভার একজন স্থানীয় বাসিন্দা। তিনি আমাদের গাইডের ভূমিকায়। যাত্রাপথে তাহেরপুরের এসি (ল্যান্ড) ফোন করে জানালেন, থানার সামনে স্পিডবোট অপেক্ষা করছে। ঢাকা থেকে জিটিভির চিফ রিপোর্টার রাজু আহমেদ ভাই টাঙ্গুয়ার হাওর দেখতে আসব শুনে হাওরে নিরাপত্তার জন্য স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার পরামর্শ দেন। তাই প্রথমেই আমরা তাহেরপুর থানার ওসির সঙ্গে দেখা করি। ভদ্রলোকের আন্তরিকতায় আমরা মুগ্ধ। তিনি ফোন করে টেকেরঘাট ফাঁড়ির ইনচার্জকে সহযোগিতার নির্দেশ দেন। আমরা হাওরপাড়ের মানুষের সমস্যা ও নিরাপত্তার বিষয় জানার চেষ্টা করে বিদায় নিয়ে অপেক্ষমাণ স্পিডবোটে উঠি।
বিস্তীর্ণ জলরাশি ভেদ করে আমাদের বোট এগিয়ে চলে। তখন আমাদের গাইড হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন স্পিডবোটের চালক। মাইট্টা হাওর হয়ে সামনের দিকে এগোতে থাকি। গাইড হাওর ও আশপাশের জলস্থল সম্পর্কে বিস্তারিত জানাচ্ছিলেন। ওই সময়ে ফেসবুক লাইভে আসেন সহকর্মী সাঈদ মালিক ও মতিউর রহমান (মতি ভাই)। মেঘ ঢেকে গেছে ওই দূরে মেঘালয়ের পাহাড়ের গায়। আর শুধু বিস্তীর্ণ জলাশয়ে আমাদের বোট ছুটছে তো ছুটছে। উৎসব চলছে যেন। সিনিয়র সাংবাদিক আতিক ভাই প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে গান শুরু করেন ‘হায় রে আমার মন মাতানো দেশ, হায়রে আমার সোনাফলা মাটি, রূপ দেখে তোর কেন আমার পরান ভরে না…।’ সমস্বরে গাইলাম একসঙ্গে।
এখানকার সবুজ প্রকৃতিজুড়ে খেলা করে অপার সৌন্দর্যের মুগ্ধ বিস্ময়। হাওরের বিশাল গভীর জলরাশির মাঝখানে চিরহরিৎ বর্ণের হিজলের সারি সারি বৃক্ষ ভ্রমণপিয়াসি যেকোনো পর্যটকের দৃষ্টিকে শুধু সচকিতই করে না, সৌন্দর্যের মুগ্ধতায় হৃদয়ের গভীরে তৈরি করে ভালোলাগার অসাধারণ অনুভূতি।
সাগরসদৃশ পানির বিস্তৃত প্রান্তর হাওর। প্রচলিত অর্থে হাওর হলো, বন্যা প্রতিরোধের জন্য নদীতীরে নির্মিত মাটির বাঁধের মধ্যে প্রায় গোলাকৃতি নিচুভূমি বা জলাভূমি। হাওর সব সময় নদীতীরবর্তী নির্মিত বাঁধের মধ্যে নাও থাকতে পারে। হাওরের কথা বলতে গেলে সাগরের দৃশ্য মনে ভেসে ওঠে। অভিধান ও শব্দের ইতিহাস বলে, ‘সাগর’ শব্দের অপভ্রংশ ‘হাওর’। কালক্রমে উচ্চারণ বিবর্তনে ‘সাগর’ থেকে ‘সায়র’, ‘সায়র’ থেকে ‘হাওর’ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
জানতে পারলাম, বর্ষাকালে বড় হাওরের একস্থান থেকে আরেকস্থানে যাতায়াতের জন্য পাড়ি জমালে কিংবা নৌকা ভাসালে মনে হয়, অকুল দরিয়ার কূল নাই কিনারা নাই। হাওরের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, প্রতি বছর বর্ষাকাল বা স্বাভাবিক বন্যায় হাওর প্লাবিত হয়, বছরের কয়েক মাস পানিতে নিমজ্জিত থাকে। বর্ষা শেষে হাওরের গভীর পানি বা জলে নিমজ্জিত কিছু স্থায়ী বিল জেগে ওঠে।
দ্বিতীয় বৃহত্তম জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ হাওর সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর। প্রতিদিন এর সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশ-বিদেশ থেকে পর্যটকেরা এখানে আসেন। পর্যটকদের
জন্য ২০১৪ সালে এখানে একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ করে বন বিভাগ। তবে টাওয়ারটি এখন ঝুঁকিপূর্ণ।
পথ চলতে চলতে আমরা ওয়াচ টাওয়ার ভাসমান হিজলবাগান হয়ে পৌঁছলাম
টেকেরঘাট, বেলা ৩টায়। এখানে ছোট্ট সরকারি ডাকবাংলোয় আমরা ফ্রেশ হয়ে মধ্যাহ্নভোজ শেষ করি।
বিকালে আবার মোটরসাইকেলে চড়ে যাত্রা শুরু হয়। বারিক্কাটিলা, শিমুলবাগান ও লাকমাছড়ায় যাওয়া-আসায় দুজনের খরচ হয় ২০০ টাকা। মোটরসাইকেলে চালক ছাড়া
দুজন বসা যায়।
পরে জাদুকাটা নদীর তীরে অবস্থিত শিমুল বাগানের উদ্দেশে রওনা দিই। ভালোবাসার মৌসুমে এখানে লাল শিমুল ফুল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে গাছ আর মাটিতে। সিজন না থাকায় আমরা দেখেছি শুধুই সবুজ। চোখধাঁধানো এত সবুজ আর কোথাও দেখেছি বলে মনে পড়ে না।
এরপর চলে আসি লাকমাছড়ায়। সিলেটের বিছানাকান্দির মতো একটা জায়গা। ভারতের কোনো একটা ঝরনার ঝিরি শেষ হয়েছে এখানে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত হওয়ায় এ ঝরনা পর্যন্ত যাওয়ার অনুমতি নেই। বাংলাদেশিরা একহাঁটু পানিতে দাপাদাপি
করেই তৃপ্ত।
এরপর গেলাম তুলনামূলক অপরিচিত স্থান টেকেরঘাট ঝিড়িতে। এটাও ভারত থেকে বাংলাদেশে গড়ানো কোনো এক ঝরনার শেষ প্রান্ত। সীমানা পিলার টপকানোর অনুমতি নেই। বরফগলা হিমশীতল পানি। ছবি তোলার জন্য সুন্দর স্থান। একটু দূরে ডাকবাংলোর পাশে নীলাদ্রি লেক। একপাশে হাওর আরেকপাশে গারো পাহাড়। শেষ বিকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এখানেই চলে বিচরণ।
রাতে ডাকবাংলোয় আনসার ক্যাম্পের ইনচার্জ কামরুজ্জামান খানের সঙ্গে ডিনারের টেবিলে কথা হচ্ছিল। তিনি জানালেন, গত মাসে সবচেয়ে বেশি পর্যটক এসেছেন। শুক্র ও
শনিবার দেড়শ’র মতো ট্রলার পর্যটকদের নিয়ে ঘাটে থাকে। একেকটি ট্রলারে সর্বোচ্চ ১০০ থেকে সর্বনিম্ন ২০ যাত্রী থাকেন। এক হিসাবে জানতে পারলাম, শুধু আগস্টেই হাওর ভ্রমণে এসেছেন প্রায় আড়াই লাখ দর্শনার্থী। অথচ সরকারি রাজস্ব আসে না একটি টাকাও। ভালো কোনো হোটেল নেই। দু-একটি থাকলে সেখানে হাতে গোনা রুম চার থেকে পাঁচটি। ট্রলারেই গাদাগাদি করে জোছনা দেখে রাত কাটিয়ে দেয় অনেকে। এ সুযোগে অনেক ট্যুর অপারেটর জনপ্রতি দুই হাজার টাকার বদলে হাতিয়ে নিচ্ছেন পাঁচ-ছয় হাজার টাকা।
এর আগে দুপুরে হাওরের জয়পুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হাদিউজ্জামানের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানা
যায়, টাঙ্গুয়ার হাওর ভ্রমণে সরকারি কোনো নীতিমালা না থাকায় দর্শনার্থীর চাপে হাওরের জীববৈচিত্র্য হুমকিতে।
গ্রীষ্মকালে হাওরকে সাধারণত বিশাল মাঠের মতো মনে হয়, তবে মাঝেমধ্যে বিলে পানি থাকে এবং মাছও আটকে থাকে। বর্ষাকালজুড়ে হাওরের পানিকে সাগর বলে মনে হয়। এর মধ্যে অবস্থিত গ্রামগুলোকে দ্বীপ বলে প্রতীয়মান হয়। বছরের সাত মাস হাওরগুলো পানির নিচে অবস্থান করে। শুষ্ক মৌসুমে অধিকাংশ পানি শুকিয়ে গিয়ে সে স্থানে সরু খাল রেখে যায়। শুষ্ক মৌসুমের শেষের দিকে সম্পূর্ণ শুকিয়েও যেতে পারে। তখন প্রান্তরজুড়ে ঘাস গজায়। গবাদি পশুর বিচরণক্ষেত্র হয়ে ওঠে। হাওরে আগত পানি প্রচুর পলিমাটি ফেলে যায়, যা ধান উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
শুধু মাছ আর ধান নয়, পাখির জন্যও হাওর অভয়াশ্রম। শুকনো মৌসুমে বিশেষত শীতকালে দেশের বিরল প্রজাতির বহু পাখির দেখা মেলে। হিজলবাগে বসে পাখিদের মিলনমেলা। সুনামগঞ্জের বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ ছোট-বড় ৫১টি বিলের সমন্বয়ে গঠিত টাঙ্গুয়ার হাওরকে সম্পদ ও সৌন্দর্যের রানি হিসেবে অভিহিত করা হয়। টাঙ্গুয়ার হাওর পরিযায়ী পাখির নির্ভরযোগ্য স্থান।
২০০০ সালের ৬ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টাঙ্গুয়ার হাওরকে ‘রামসার সাইট’ হিসেবে ঘোষণা করেন। সে অনুযায়ী ১০ জুলাই আন্তর্জাতিক রামসার কনভেশনে স্বাক্ষর করে কর্তৃপক্ষ। এতে রামসার তালিকায় বিশ্বের ৫৫২টি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যের মধ্যে টাঙ্গুয়ার হাওরের নাম উঠে আসে। পরিবেশবাদীদের গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে বিপন্ন প্রায় বিরল প্রজাতির দুই শতাধিক পাখির অভয়াশ্রম ও বিপন্ন ১৫০ প্রজাতির মাছের সমাগম রয়েছে এ হাওরে। এখানে রয়েছে স্তন্যপায়ী দুর্লভ জলজ প্রাণী, গাঙ্গেয় ডলফিন (শুশুক), খেঁকশিয়াল, উদ, বনরুই, গন্ধগোকুল, জংলি বিড়াল ও মেছোবাঘ। আরও রয়েছে নলখাগড়া, হিজল, করচ, বরুণ, রেইনট্রি, পদ্ম, বুনো গোলাপসহ ২০০ প্রজাতির বেশি গাছগাছড়া।
টেকেরঘাটে জেলা এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয়ে একটি পরিপাটি রুমে আমি ও দৈনিক আমার সংবাদের ওমর ফারুক রাত কাটাই, বাকি চারজন সরকারি ডাকবাংলো শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ কটেজে। ফজরের আজানে ঘুম ভেঙে যায় আমার। ফ্রেশ হয়ে ওমর ফারুকের ঘুম ভাঙানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হই, সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। পরশু রাত থেকে ভ্রমণের ধকলে বেচারা ক্লান্ত! রুমের দরজায় তালা দিয়ে বাইরে আসি। তাকিয়ে দেখি পুব আকাশ ফেটে ভোরের আলো বেরিয়ে আসছে। আমি অবাক হয়ে সে দৃশ্য দেখি। মনে পড়ে, ১৫ বছর আগে উড়োজাহাজ থেকে কমরোসের রাজধানী মরনি থেকে ইয়েমেনের রাজধানী সানা আসার পথে আকাশ থেকে একই দৃশ্য দেখেছিলাম। পাহাড়ের বুক চিরে উঁকি দেওয়া এক দৃশ্য আমাকে সেই নিষ্পাপ চাঁদমুখটার কথা মনে করিয়ে দেয়। আমি শান্ত সকালে অশান্ত মন নিয়ে অন্য কটেজে এসে চার ভ্রমণসঙ্গীকে ডেকে তুলি। সবাই বিরক্ত হয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়েন। জেগে ওঠেন আতিক ভাই। তিনি বলেন, এসেছি বেড়াতে, ঘুমাতে নয়। বলি, আগুনলাগা অশান্ত আকাশে সূর্য উঁকি দিয়ে আমাদের বাইরে যেতে বলছে। আতিক ভাই হেসে ওঠেন। ফ্রেশ হয়ে আমার সঙ্গে বাইরে আসেন। আমার সেই নীলাদ্রি লেকের ওপরের পাহাড়ের দিকে হাঁটতে থাকি। মোবাইল ফোনে ছবি তুলি। পাহাড় বেয়ে চলে যাই সীমান্তে। তাকিয়ে দেখি, প্রকৃতির মাঝে আমরা দুজন, আর কেউ নেই…।

জাহাঙ্গীর খান বাবু

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..