প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

ডাবল লাইন নির্মাণে ১৩২% বেশি দামে মাটি কিনছে রেলওয়ে

আখাউড়া-লাকসাম রেলপথ

ইসমাইল আলী : ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনে উন্নীত করা হচ্ছে আখাউড়া-লাকসাম রেলপথ। ২০১৬ সালের নভেম্বরে এ নির্মাণকাজ শুরু করা হয়। তবে তিন বছর পর প্রকল্পটির মাটির কাজ বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হয়েছে। আবার এ মাটি কেনার ব্যয়ও বেড়ে গেছে। এ খাতে প্রায় ১৩২ শতাংশ বেশি ব্যয় হচ্ছে।

১০ অক্টোবর রেল ভবনে অনুষ্ঠিত প্রকল্পটির ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটির (পিআইসি)  বৈঠকে এ তথ্য উঠে এসেছে। এতে জানানো হয়, প্রকল্পটির জন্য পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার ঘনমিটার মাটির কাজের (আর্থওয়ার্ক) সংস্থান রাখা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বাস্তব কাজ বৃদ্ধি পায়। এতে মাটির কাজ বেড়ে হয়েছে ১১ লাখ ঘনমিটার। অর্থাৎ মাটির কাজ বেড়ে গেছে পাঁচ লাখ ১২ হাজার ঘনমিটার, তথা ৮৭ শতাংশ।

এদিকে প্রাথমিকভাবে প্রতি ঘনমিটার মাটির কাজে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৮০ টাকা। এখন তা বাড়িয়ে প্রতি ঘনমিটার ৬৫০ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এ হিসাবে, প্রতি ঘনমিটার মাটির কাজে ব্যয় বেড়ে গেছে ৩৭০ টাকা বা ১৩২ দশমিক ১৪ শতাংশ।

প্রস্তাবটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাটির কাজের জন্য প্রাথমিকভাবে ঠিকাদার ব্যয় প্রস্তাব করেছিল ১৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। তবে মাটির কাজের পরিমাণ ও ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন তা দাঁড়িয়েছে ৭১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এতে মাটির কাজে মোট ব্যয় বেড়ে গেছে ৫৫ কোটি চার লাখ টাকা।

সভায় জানানো হয়, প্রকল্পের ডিজাইন পরামর্শক অস্ট্রেলিয়ার ক্যানারেইলের পরামর্শের ভিত্তিতে মাটির কাজের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। বর্ধিত দর অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটিতে অর্থায়নকারী সংস্থা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অনাপত্তি চাওয়া হয়েছে। অনাপত্তি পাওয়া গেলে ঠিকাদারের দাবি পরিশোধ করা হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেলপথটি নির্মাণ শুরুর তিন বছর পর মাটির কাজের পরিমাণ দ্বিগুণ করা হলো। আবার মাটির দামও দ্বিগুণের বেশি নির্ধারণ করা হলো। কোনোভাবেই এটি গ্রহণযোগ্য নয়। এক্ষেত্রে নিশ্চয়ই প্রকল্পের ডিজাইনে ভুল ছিল। তাই ডিজাইন প্রণেতা প্রতিষ্ঠানের ব্যাখ্যা তলব করা উচিত। অন্যথায় পুরো প্রক্রিয়া অস্বচ্ছ বলে ধরে নিতে হবে। কারণ রেলপথ নির্মাণে মাটির কাজে ফাঁকি দেওয়াটা সহজ।

সূত্রমতে, প্রাক্কলিত দরের চেয়ে প্রায় ২৪ শতাংশ কম দামে কাজটি নিয়েছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। রেলপথটি নির্মাণে ভ্যাট-শুল্ক ছাড়া তাদের প্রস্তাবিত দর ছিল তিন হাজার ৪৭৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। আর রেলওয়ের প্রাক্কলিত মূল্য ছিল চার হাজার ৫৮১ কোটি সাত লাখ টাকা। অর্থাৎ এক হাজার ১০৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা কম দরে কাজটি নিয়েছিল ঠিকাদার। এখন মাটির কাজ ও অন্যান্য ক্ষেত্রে দর সমন্বয় এবং কাজের পরিমাণ বৃদ্ধির যুক্তিতে প্রকল্প ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে। এ বিষয়টিও খতিয়ে দেখা দরকার বলে মত সংশ্লিষ্টদের।

পিইসি বৈঠকে আরও জানানো হয়, প্রকল্পটির আওতায় নতুন আইটেম হিসেবে ব্রিজ ও কালভার্টের অ্যাপ্রোচ (সংযোগ সড়ক) এবং লো-এমব্যাংকমেন্টে (নিচু বাঁধ) বালির পাইল করা হয়েছে। এ কাজে প্রতি ঘনমিটারে ব্যয় হয়েছে ৭৮৬ টাকা। এজন্য এডিবির অনাপত্তি সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়া রেলপথটির প্রাথমিক নকশাতেও কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে। এর বাইরে প্রকল্প এলাকায় প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অংশে ব্ল্যাক কটন জোনে সয়েল ট্রিটমেন্ট করতে হবে। অপটিক্যাল ফাইবার লেইং, লেভেল ক্রসিং গেট উন্নীতকরণসহ বিভিন্ন আইটেমে হ্রাস-বৃদ্ধিও পেতে পারে।

এদিকে প্রকল্পটির আওতায় চারতলা ইঞ্জিনিয়ার্স মেইন অফিস নির্মাণের কথা ছিল। এজন্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪৫ কোটি টাকা। তবে রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি তা ২০ তলা নির্মাণের সুপারিশ করেছে। এজন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩৪ কোটি টাকা। ফলে এ খাতে ব্যয় বেড়ে যাবে ৪৮৯ কোটি টাকা। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন গ্রহণ করতে হবে। সব মিলিয়ে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি পাবে।

উল্লেখ্য, আখাউড়া-লাকসাম বিদ্যমান রেলপথটি বর্তমানে সিঙ্গেল লাইন মিটারগেজ। এটিকে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনে উন্নীত করার প্রকল্পটি ২০১৪ সালে ডিসেম্বরে অনুমোদন পায়। এরপর প্রকল্পটির পরামর্শক নিয়োগ করা হয়। আর ঠিকাদার নিয়োগে ২০১৫ সালের ৪ মে দরপত্র আহ্বান করা হয়। ২০১৬ সালের ১৫ জুন ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি সই করা হয়।

প্রকল্পটির আওতায় ১৪৪ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ মেইন লাইন ও ৪০ দশমিক ৬০ কিলোমিটার লুপ লাইন নির্মাণ করা হবে। মেইল লাইনে ১৩২ পাউন্ড ও লুপ লাইনে ৯০ পাউন্ড রেলপাত ব্যবহার করা হবে। এছাড়া ১১টি স্টেশনের সিগন্যালিং ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ, ১৩টি মেজর ও ৪৬টি মাইনর ব্রিজ নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি ১১টি স্টেশনের ভবন নির্মাণসহ আনুষঙ্গিক কাজ করা হবে। এছাড়া ৬৮ হাজার ১৯০ বর্গমিটারের ইঞ্জিনিয়ার্স অফিস নির্মাণ করা হবে।

চলতি বছর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রেলপথটি ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনের কাজ ৬৪ দশমিক ১০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে প্রকল্পটির কাজ শেষ করার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। এতে প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি করতে হবে।

আখাউড়া-লাকসাম রেলপথ ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনের কাজ যৌথভাবে করছে চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন, বাংলাদেশের তমা কনস্ট্রাকশন ও ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার (সিটিএম জয়েন্ট ভেঞ্চার)। এক্ষেত্রে ব্যয় ধরা হয়েছে ছয় হাজার ৫০৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে এডিবি ঋণ দিচ্ছে চার হাজার ১১৮ কোটি ১৪ লাখ ও ইউরোপিয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (ইআইবি) দিচ্ছে এক হাজার ৩৫৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। বাকি এক হাজার ২৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকা সরকারি তহবিল থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে।

সর্বশেষ..