সারা বাংলা

আগাম জাতের ধানের কম দামে দুশ্চিন্তায় কৃষক

তৈয়ব আলী সরকার, নীলফামারী: নীলফামারীতে আগাম জাতের আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে। এতে ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলা সদরসহ ছয় উপজেলার কৃষক। তবে ইঁদুরের অত্যাচার ও বাজারে নতুন ধানের দাম ৩০০-৩৫০ টাকা হওয়ায় মাথায় হাত পড়েছে কৃষকের।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর জেলায় আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ ১২ হাজার ৩৭৫ হেক্টর জমিতে, আর আবাদ হয়েছে এক লাখ ১২ হাজার ৬৬২ হেক্টর। এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম অর্জিত হয়েছে ২৮৭ হেক্টর। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ২৮ হাজার ৮৬০ হেক্টর, ডোমারে ১৮ হাজার ৮২২ হেক্টর, ডিমলায় আবাদ ১৯ হাজার ৮৯০ হেক্টর, জলঢাকায় ২২ হাজার ৮৩০ হেক্টর, কিশোরগঞ্জে ১৪ হাজার ৮৬০ হেক্টর এবং সৈয়দপুরে আট হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে।

এর মধ্যে আগাম জাতের ধান আবাদ হয়েছে ১৪ হাজার ২৭৮ হেক্টর জমিতে। সদরে এক হাজার ৩৯০ হেক্টর, ডোমারে তিন হাজার ২৮ হেক্টর, ডিমলায় তিন হাজার ৪২০ হেক্টর, জলঢাকা উপজেলায় দুই হাজার ৪৭৬ হেক্টর, কিশোরগঞ্জে দুই হাজার ৫৭৪ হেক্টর ও সৈয়দপুরে এক হাজার ৩৯০ হেক্টর জমিতে আগাম জাতের ধান আবাদ হয়েছে।

কৃষি বিভাগের হিসাবমতে, এবার চাষ করা জমি থেকে প্রায় তিন লাখ ৩৫ হাজার ১৮৩ টন চাল উৎপাদিত হবে। এ পর্যন্ত আগাম জাতের ধান কাটা হয়েছে প্রায় তিন হাজার ৪৬ হেক্টর জমির। এতে বিঘাপ্রতি গড় ফলন হয়েছে ১৮ মণ।

সদরের রামনগর ইউনিয়নের বাহালী পাড়া গ্রামের কৃষক আশরাফ আলী জানান, তিনি দুই বিঘা জমিতে আগাম জাতের ধান আবাদ করেছেন। এবার উত্তরাঞ্চলে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আগাম জাতের হাইব্রিড ধানিগোল্ড ধানের বিঘাপ্রতি ফলন হয়েছে ১৭-১৮ মণ। গত বোরো মৌসুমে ধানের বাজারদর কম হওয়ায় হতাশ কৃষক। বর্তমান বাজারে নতুন আমন ধান বিক্রি হচ্ছে ৩০০-৩৫০ টাকা মণ দরে। আর বিঘাপ্রতি বীজ, সার, হাল, কীটনাশক, মজুরি কাটা ও মাড়াইসহ খরচ হয় সাত-আট হাজার টাকা। ধান চাষ করে ফের লোকসান গুণতে হচ্ছে তাদের। এদিকে ইঁদুরের অত্যাচারে ধানের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।

জেলা সদরের দীঘলটারী গ্রামের লোকমান আলী জানান, তিনি তিন বিঘা জমিতে আগাম উফশী জাতের ধান মামুন স্বর্ণ, বিনা-৭ ও ব্রি-ধান ৩৩ ধান চাষ করেছেন। বিঘাপ্রতি ফলেছে ১৭-১৮ মণ, কিন্তু বাজারে দাম না থাকায় বিপাকে পড়তে হয়েছে। বাজারে এখন ৩০০-৩৫০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। বাজারদর না থাকায় মাথায় হাত পড়েছে চাষিদের। বাড়ির ছাগল ও হাঁস-মুরগি বিক্রি করে শ্রমিকের মজুরি দিতে হচ্ছে। তাহলে ধান আবাদ করে লাভ কী?

সদর উপজেলার পলাশবাড়ী ইউনিয়নের কৃষক মমতাজ উদ্দিন জানান, তিনি চার বিঘা জমিতে বিনা-১১ জাতের আমন ধানের চাষ করেছেন। এর মধ্যে দুই বিঘা কেটে মাড়াই করেছেন। হাল, সার, বীজ, পরিবহন কাটা মাড়াই বাবদ চার বিঘায় খরচ হয়েছে ২৮ হাজার টাকা। আর চার বিঘায় ধান হবে ৭২ মণ। ৭২ মণ ধানের দাম ৩৫০ টাকা হিসেবে দাঁড়ায় ২৫ হাজার ২০০ টাকা। এখানে দুই হাজার ৮০০ টাকা আসলে নেই। ধানের ভালো বাজার পাওয়া না গেলে পথে বসতে হবে।

সদরের লক্ষ্মীচাপ গ্রামের কৃষক প্রভাত রায় ও মাইকেল রতন জানান, ধানের দাম নেই। তাই আগাম ধান কেটে ওই জমিতে সবজির চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আলু, কপি, লালশাক, পুঁইশাক, মরিচ, পেঁয়াজসহ নানা ধরনের শাকসবজি ওই জমিতে চাষ করা যাবে। ধানের চেয়ে সবজি চাষে বেশি লাভবান হওয়া যায়। ধান এখন কৃষকের বোঝা। ধানের লোকসান সবজিতে পুষিয়ে নিতে হবে।

নীলফামারী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক আবুল কাশেম আজাদ বলেন, ‘গত ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে আগাম জাতের ধান কাটা শুরু হয়েছে। জেলায় আগাম জাতের আমন ধানের আবাদ দিন দিন বাড়ছে। কম সময়ে ফলন ভালো হওয়ায় কৃষক এর প্রতি ঝুঁকছে। রোগবালাই দমন, ফলন বৃদ্ধি ও চাষ প্রসারে নীলফামারী কৃষি বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে। অনেকেই আগাম জাতের ধান আবাদ করে ওই জমিতে সবজি চাষ করেও লাভবান হচ্ছেন।

সর্বশেষ..