শেষ পাতা

আগ্রহের শীর্ষে ব্যাংক ও মিউচুয়াল ফান্ড

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ: দীর্ঘদিন পর পুঁজিবাজারে চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে তালিকাভুক্ত মিউচুয়াল ফান্ড ও ব্যাংকের শেয়ারের। অন্য খাতগুলোর চেয়ে এ খাত দুটির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে। যে কারণে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে ব্যাংক ও মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট এবং শেয়ারের দর। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ দুটিই পুঁজিবাজারের শক্তিশালী খাত, যে কারণে খাত দুটিতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে। পাশাপাশি ব্যাংক ও মিউচুয়াল ফান্ডের শেয়ার ও ইউনিটের দর তুলনামূলকভাবে কম। সে জন্য এসব কোম্পানিতে বিনিয়োগকারীদের ঝোঁক।

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, ২০১০ সালের ধসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মিউচুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগকারীরা। সে সময় মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটের দর সবচেয়ে বেশি কমে যায়। যার রেশ এখনও কাটেনি। ফলে মিউচুয়াল ফান্ড থেকে তারা রির্টান পাচ্ছে না। একই অবস্থা ব্যাংকিং খাতের কোম্পানির। এ সময় অধিকাংশ ব্যাংকের শেয়ারের দর অনেক নিচে চলে আসে। অভিহিত দরের নিচেও নেমে যায়  কিছু কোম্পানির শেয়ারের দর; কিন্তু এ বছর অধিকাংশ ব্যাংক মুনাফা করায় ব্যাংকিং খাতে সুদিন ফিরছে। পাশাপাশি আগ্রহ তৈরি হচ্ছে মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিটের।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩৫টি মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৮৬ শতাংশ বা ২৭টির ইউনিটদর অবস্থান করছে অভিহিত মূল্যের নিচে। এ রকম মিউচুয়াল ফান্ডগুলো হচ্ছে এআইবিএল প্রথম ইসলামিক মিউচুয়াল ফান্ড, এশিয়ান টাইগার সন্ধানী লাইফ গ্রোথ ফান্ড, ডিবিএইচ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ইবিএল এনআরবি মিউচুয়াল ফান্ড, এক্সিম ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ফার্স্ট বাংলাদেশ ফিক্সড ইনকাম ফান্ড, গ্রামীণ ওয়ান  স্কিম টু, গ্রীন ডেল্টা মিউচুয়াল ফান্ড, ফার্স্ট জনতা ব্যাংক মিউচুয়াল ফান্ড, প্রাইম ফাইন্যান্স মিউচুয়াল ফান্ড, এবি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ও ইবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড।

এ তালিকায় আরও রয়েছে রিলায়েন্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ওয়ান, সাউথইস্ট ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ট্রাস্ট ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ও ভ্যানগার্ড এএমএল বিডি ফাইন্যান্স একইভাবে আইসিবি দ্বিতীয় এনআরবি মিউচুয়াল ফান্ড, আইসিবি তৃতীয় এনআরবি মিউচুয়াল ফান্ড, আইসিবি এএমসিএল দ্বিতীয় মিউচুয়াল ফান্ড, আইসিবি এমপ্লিজ প্রভিডেন্ট মিউচুয়াল ফান্ড। অন্যান্য ফান্ডের মধ্যে রয়েছে এনএলআই ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ফিনিক্স ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, পিএইচপি মিউচুয়াল ফান্ড ওয়ান, পপুলার লাইফ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, প্রাইম ব্যাংক ফার্স্ট আইসিবি এএমসিএল মিউচুয়াল ফান্ড।

এছাড়া আইসিবি এএমসিএল সোনালী ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, আইএফআইসি ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, আইএফআইএল ইসলামিক মিউচুয়াল ফান্ড ওয়ান, এলআর গ্লোবাল মিউচুয়াল ফান্ড ওয়ান, এমবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ও এনসিসি ব্যাংক মিউচুয়াল ফান্ড ওয়ান এ তালিকায় রয়েছে। তবে বর্তমানে বাজার ঘুরে দাঁড়ানোতে মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটের চাহিদা সৃষ্টি। গত এক মাস আগে যেসব ইউনিট পাঁচ টাকা বা এর কাছাকাছি ধরে লেনদেন হচ্ছিল তার অধিকাংশের দরই এখন ছয় টাকার উপরে অবস্থান করছে।

এ প্রসঙ্গে ডিএসইর সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান পরিচালক শাকিল রিজভী শেয়ার বিজকে বলেন ‘মিউচুয়াল ফান্ড ঘুরে না দাঁড়ানোর প্রধান কারণ হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহ। আর এ অনাগ্রহের কারণ হচ্ছে তারা মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট নিয়ে বড় ধরনের লোকসানে রয়েছেন।’ তিনি বলেন, ফান্ডগুলোতে বিনিয়োগ না করার আরেকটি কারণ হচ্ছে ফান্ডগুলোর জবাবদিহিতা না থাকা। ফান্ডগুলো তাদের অর্থ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করছে, না কি অন্য কোথাও রেখে দিচ্ছে, তা আমরা জানি না। ফলে এসব ফান্ডে বিনিয়োগ নিয়ে সবসময় এক ধরনের ধোঁয়াশা থেকেই যাচ্ছে।’

এদিকে প্রায় পাঁচ বছর পর স্বস্তি ফিরেছে ব্যাংক খাতের বিনিয়োগকারীদের। অন্য খাতের তুলনায়  বছরজুড়ে এ খাতের শেয়ারের প্রতি তাদের চাহিদা বেশি দেখা গেছে।  সে সঙ্গে এসব শেয়ারের দরও ছিল স্থিতিশীল পর্যায়ে। বছর শেষেও যার প্রতিফলন দেখা গেছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে বছর শেষে  তালিকাভুক্ত ৩০ কোম্পানির মধ্যে দর বেড়েছে ২৪টি কোম্পানির শেয়ারদর।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এ বছর ব্যাংকের শেয়ারের প্রধান কারণ ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সমন্বয় ও অধিকাংশ ব্যাংক কোম্পানি মুনাফায় ফেরা। এ দুই কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের এ খাতের শেয়ারের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। এ বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া সময় ও বিশেষ সুযোগে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ আইনিসীমায় নামিয়ে আনে ১৩টি বাণিজ্যিক ব্যাংক। এতে ব্যাংকগুলোর পুঁজিবাজারে আরও ১৫শ কোটি টাকা নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়।

এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকিং খাতের কিছু সমস্যা ছিল। তবে ব্যাংকগুলো তাদের বিনিয়োগ সমন্বয় করায় এখন সে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। আশা করছি বিনিয়োগকারীদের এখন এ শেয়ারের প্রতি আগ্রহ বাড়বে। তবে এ ক্ষেত্রে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের। তারা যদি এসব শেয়ারের দিকে নজর দেন, তবে খাতটি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

ব্যাংককিং খাত বলা হয়ে থাকে পুঁজিবাজারের সবচেয়ে শক্তিশালী খাত। এক সময় পুঁজিবাজারে মোট লেনদেনের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ থাকতো এ খাতের অবদান। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ পরিস্থিতি বদলে গেছে। লেনদেনে ব্যাংকের অবদান নেমে এসেছে ১০ শতাংশের নিচে। ব্যাংককিং খাতে হল মার্কসহ নানা অনিয়ম সর্বোপরি রিজার্ভ চুরির মতো ঘটনায় সাধারণ গ্রাহকের যেমন ব্যাংকের প্রতি আস্থা কমেছে। তবে এ পরিস্থিতি অনেকটা কেটে গেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

ব্যাংকগুলোর মুনাফার দিকে তাকালে দেখা যায়, চলতি বছরের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ ব্যাংকের নিট মুনাফা ও শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) বেড়েছে। গত বছরের তুলনায় ব্যাংকগুলোর ঋণ  প্রবৃদ্ধি ও  খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল বেশি হওয়ার কারণে মুনাফা বেড়েছে।

ব্যাংকগুলোর প্রকাশিত অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বছরের প্রথম ছয় মাসে ৩০ ব্যাংকের মধ্যে ২০টির নিট মুনাফা ও ইপিএস বেড়েছে। কমেছে ৯টির। একটির অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে অর্থাৎ গত এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তিন মাসে ১৫ ব্যাংকের নিট মুনাফা ও ইপিএস বেড়েছে। কমেছে ১৪টির। একটির ইপিএস অপরিবর্তিত রয়েছে।

দ্বিতীয় প্রান্তিকের হিসাব অনুযায়ী, যেসব ব্যাংকের নিট মুনাফা ও ইপিএস বেড়েছে সেগুলো হলো সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ন্যাশনাল, দ্য সিটি, রূপালী, ফার্স্ট সিকিউরিটি, এক্সিম, আইএফআইসি, মার্কেন্টাইল, ইস্টার্ন, যমুনা, ট্রাস্ট, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, এবি এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক। এ ক্ষেত্রে ইপিএস অপরিবর্তিত রয়েছে প্রিমিয়ার ব্যাংকের। এর বিপরীতে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় নিট মুনাফা ও ইপিএস কমেছে প্রাইম ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, পূবালী, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল, ব্যাংক এশিয়া, আল-আরাফাহ্, ঢাকা, ইসলামী, সাউথইস্ট, ওয়ান, শাহ্জালাল, উত্তরা, এনসিসি ও আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..