দিনের খবর শেষ পাতা

আগ্রহ কম বেসরকারি খাতের ব্যাংকের

পিছিয়ে পড়াদের ব্যাংক হিসাব চালু

শেখ আবু তালেব: আর্থিক অন্তর্ভুক্তি তথা সব শ্রেণি ও বয়সের ব্যক্তিদের ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে বিশেষ হিসাব খোলার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবা দিতে ১০, ৫০ ও ১০০ টাকা জমা দিয়েই এসব হিসাব খোলা যায়। বর্তমানে এসব হিসাবে জমা হওয়া আমানতের ৮৬ শতাংশই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর। এসব হিসাবের বিপরীতে ব্যাংক কোনো বার্ষিক ফি বা চার্জ নিতে পারে না। বর্ধিত চার্জ না পাওয়ায় বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো এতে কম আগ্রহ দেখাচ্ছে। ফলে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে জনগোষ্ঠীকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে নিয়ে আসার উদ্দেশ্য।

জানা গেছে, স্কুলশিক্ষার্থী, কৃষক, প্রতিবন্ধী, সামাজিক ভাতা গ্রহণকারী, তৈরি পোশাক খাতের কর্মী, পথশিশু, অতি দরিদ্র, সরকারি ভাতা গ্রহণকারীসহ মুক্তিযোদ্ধারা এসব হিসাব খুলতে পারেন। যেকোনো ব্যাংকে গিয়েই তারা এসব হিসাব পরিচালনা করতে পারেন। যেকোনো পরিমাণের অর্থ দিয়ে তারা হিসাব চালুু করতে পারেন, যেখানে ব্যাংকে সঞ্চয়ী হিসাব পরিচালনা করতে ব্যাংকভেদে কমপক্ষে ৫০০ টাকা ন্যূনতম সঞ্চয় রাখতে হয়, দিতে হয় আবশ্যক কিছু প্রমাণাদি ও আয়ের উৎস। আবার হিসাব পরিচালনায় বছর শেষে সার্ভিস চার্জ কেটে নেয় ব্যাংক। কিন্তু বিশেষ হিসাবগুলো থেকে বার্ষিক কোনো চার্জ বা ফি কেটে রাখতে পারে না ব্যাংক। এখানে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের পরিমাণও কম।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্কুলশিক্ষার্থী, কৃষক, প্রতিবন্ধী, সামাজিক ভাতা গ্রহণকারী, তৈরি পোশাক খাতের কর্মী, পথশিশু, অতি দরিদ্র, সরকারি ভাতা গ্রহণকারীসহ মুক্তিযোদ্ধা পরিচালিত হিসাবে বর্তমানে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৩৪৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এর মধ্যে কৃষকের জমার পরিমাণ হচ্ছে ৪০৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকা, যা মোট আমানতের ৪৩ শতাংশ।

এছাড়া অতি দরিদ্রদের ২৮ লাখ ৫৯ হাজার হিসাবের বিপরীতে সঞ্চয় ২০২ কোটি ১৯ লাখ টাকা, মুক্তিযোদ্ধাদের তিন লাখ ৩১ হাজার ৭৮০টি হিসাবের বিপরীতে সঞ্চয় ৫২৮ কোটি টাকা, ভাতা সুবিধা গ্রহণকারীদের ৭৮ লাখ ৭৩ হাজার হিসাবের বিপরীতে ৭৫১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, তৈরি পোশাক খাতের কর্মীদের চার লাখ ৪৫ হাজার হিসাবের বিপরীতে ১৫৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা সঞ্চয় জমা হয়েছে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত।

সব মিলিয়ে এসব হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই কোটি ২৫ লাখ আট হাজার ২২টি। গত প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর, ২০২১) তুলনায় এ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর, ২০২১) এসব হিসাবের প্রবৃদ্ধি হয় দুই শতাংশ। গত সেপ্টেম্বর শেষে এসব হিসাবের সংখ্যা ছিল দুই কোটি ২০ লাখ ৫৬ হাজারে। এসময় মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ১৮০ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।

এসব হিসাবে জমা হওয়া সঞ্চয়ের ৫৭ শতাংশই হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকের ২৯ শতাংশ ও বেসরকারি খাতের ১৪ শতাংশ। আমানত ও হিসাবের পরিমাণে এ খাতে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে সোনালী ব্যাংক। মোট হিসাবের ২৬ শতাংশই ব্যাংকটির দখলে। আমানতের দিক দিয়ে ৯২৯ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আতাউর রহমান বলেন, ‘সোনালী ব্যাংক রাষ্ট্রের বৃহৎ একটি ব্যাংক। সরকারের যেকোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দায়িত্ব পালন করতে হয়। আর্থিক অন্তর্ভুক্তিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। চার্জ বা ফি মুখ্য হয়ে দাঁড়ায় না। সোনালী ব্যাংক সরকারের অনেক সেবাই ফ্রি’তে দেয়। এসব হিসাব খুলতে সাধারণ মানুষ সরকারি ব্যাংকেই বেশি আসছে। আমরাও প্রচারণা চালাচ্ছি, যার ফলে সবচেয়ে বেশি হিসাব সোনালী ব্যাংকের।’

এছাড়া শীর্ষ পাঁচটিতে স্থান নিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি)। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের রয়েছে মোট হিসাবের ১৯ দশমিক ১৫ শতাংশ, অগ্রণীর ১৫ দশমিক ২২ শতাংশ, জনতার ১২ দশমিক ৩৬ শতাংশ ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) রয়েছে মোট হিসাবের ১০ শতাংশ।

অগ্রণী ব্যাংকে এসব হিসাবের বিপরীতে জমা হয়েছে ৩৬০ কোটি টাকা, আমানতের দিক দিয়ে যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এ বিষয়ে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শামস্-উল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক হিসেবে অগ্রণী ব্যাংক সরকারের বিভিন্ন ভাতা পরিশোধ করে আসছে। সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নে অগ্রণী ব্যাংক সবসময়ই অগ্রাধিকার দেয়। বিশেষ হিসাব খোলার মাধ্যমে জনগণকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনা যাচ্ছে। এক্ষেত্রে লাভের চেয়ে সেবাটিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে আমাদের ব্যাংক।’

অপরদিকে স্কুলশিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬ লাখ ৯০ হাজার ৫৫০টিতে। গত সেপ্টেম্বর শেষে এসব হিসাবের বিপরীতে তাদের সঞ্চয়ের পরিমাণ হচ্ছে এক হাজার ৯৫০ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। এসব হিসাবের ৫৭ দশমিক ৩৪ শতাংশই হচ্ছে গ্রামে। অবশ্য স্কুল ব্যাংকিংয়ে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো আগ্রহ দেখাচ্ছে বেশি। হিসাবের প্রায় ৭০ শতাংশই তাদের নিয়ন্ত্রণে। স্কুল ব্যাংকিংয়ে শীর্ষ পাঁচটিতে উঠে এসেছে ডাচ্-বাংলা, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, অগ্রণী, ব্যাংক এশিয়া ও রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অংশ হিসেবে সবাইকে ব্যাংকিং কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ নেয়া হয়। দিন দিন এসব হিসাবের সংখ্যা ও আমানতের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষকরাও সহজেই ঋণ নিতে পারছেন এসব হিসাবের মাধ্যমে। সঞ্চয়ের প্রতিও মানুষ আগ্রহী হয়ে উঠছে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..