বাণিজ্য সংবাদ শিল্প-বাণিজ্য

করপোরেট বিনিয়োগ আগ্রাসনে হুমকিতে চট্টগ্রামের প্রকৃতি!

সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: পাহাড়, সমুদ্র ও সমতল ভূমির সমন্বয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অনিন্দ্য রূপে গড়ে ওঠা চট্টগ্রাম মহানগর। রূপের শহর চট্টগ্রামে নগরায়ণ ও বাণিজ্যিক কর্মচাঞ্চল্য বেড়ে যাওয়ায় দিন দিন বিলীন হচ্ছে পাহাড়, বনভূমি, টিলা, পুকুর, বন্যপ্রাণী, গাছপালাসহ বিপুল পরিমাণে প্রাণ ও প্রকৃতি। এর মধ্যে সরকারি দায়িত্বশীল সংস্থাসহ বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো অপ্রতিরোধ্য ও বেপরোয়াভাবে দিন দিন এসব সাবাড় করছে। অনেকটা নীরব দর্শকের ভূমিকায় দায়িত্বশীল সংস্থাগুলো। এতে দিন দিন বাসযোগ্যতা হারাছে চট্টগ্রাম।

জানা যায়, চট্টগ্রাম নগরের সিআরবিতে রেল পূর্বাঞ্চলের কার্যালয়ের পাশে ৫০০ শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতাল ও ১০০ আসনের মেডিকেল কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ রেলওয়ে ও বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড গ্রুপ সরকারি-বেসরকারি অংশিদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে হাসপাতাল নির্মাণের লক্ষ্যে গত বছরের ১৮ মার্চ এ চুক্তি স্বাক্ষর করে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে ইউনাইটেড চট্টগ্রাম হাসপাতাল লিমিটেড। বর্তমানে চলছে হাসপাতাল নির্মাণের প্রাথমিক কাজ। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম শহরের প্রাণকেন্দ্রে সবুজঘেরা দৃষ্টিনন্দন সিআরবি এলাকায় শতবর্ষী গাছ কাটা পড়বে। পাশাপাশি উš§ুক্ত জায়গা বিলুপ্ত হবে।

শুধু রেলওয়ে নয়, নগর উন্নয়নে সরকারি দায়িত্বশীল চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) বায়েজিদ ও ফৌজদারহাট লিংক রোডে নতুন সড়ক নির্মাণে ১৫টি পাহাড় কেটে ছয় কিলোমিটার সড়ক তৈরি করেছে। আর ছোট একটি সড়ক নির্মাণ করতে এত বেশি পাহাড় কাটার ঘটনা অতীতে কখনোই ঘটেনি। পরিবেশ অধিদপ্তর বারবার জরিমানা করার পরও ফৌজদারহাট-বায়েজিদের এ সংযোগ সড়ক তৈরি থেকে পিছু হটেনি চউক বা সিডিএ। পরে পরিবেশ অধিদপ্তর ১০ কোটি টাকা জরিমানা করে। অনুমোদন ছাড়া পাহাড় কাটার অভিযোগ রয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) বিরুদ্ধেও। নগরের টাইগারপাস এলাকায় বাটালি হিলের পাদদেশে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের নামে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ ফুট পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে। নিচের দিকে কেটে ফেলায় পাহাড়ের উপরের অংশ থেকে মাটি সরে পড়ছে।

অন্যদিকে সরকারি সংস্থার সঙ্গে বেসরকারি সংস্থাগুলো পরিবেশ আইন অর্র্থাৎ পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া নবায়ন বিহীনভাবে, পরিবেশে শর্তভঙ্গ করে ও পাহাড় কেটে বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করছে অবৈধভাবে। আইন অমান্য করায় বিভিন্ন সময় পরিবশ অধিদপ্তর বেসরকারি খাতের আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্যানমার প্রপার্টিজ লিমিটেড, ফিনলে প্রপার্টিজ লিমিটেড, ইপিক প্রপার্টিজ লিমিটেড, নাসিরাবাদ প্রপার্টিজ লিমিটেড, ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড, ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ায়িং সার্ভিস লিমিটেড, ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ায়িং, জাহাজ ভাঙা প্রতিষ্ঠান তাসিন স্টিল লিমিটেড, সীমা স্টিল মিলস, এফএমসি শিপইয়ার্ড, সালেহ কার্পেট মিলস, ন্যাশনাল সিমেন্ট মিলস, রাইজিং স্টিল মিল লিমিটেড,  কিং স্টিল, তমা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, চিটাগং ব্রিক্স অ্যান্ড ক্লে ওয়ার্কস লিমিটেড,  হাসন টেকনো বিল্ডার্স লিমিটেড, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, ফেনী ইউনিভার্সিটি, ইস্টার্ন লুব অয়েল লিমিটেড, জিপিএইচ অক্সিজেন প্লান্টসহ শতাধিক প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর ও পরিবেশবাদী সংগঠন সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম জেলা প্রাকৃতিকভাবে পাহাড়, সমুদ্র ও সমতল ভূমির সমন্বয় গড়ে ওঠা একটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের শহর। কিন্তু গত কয়েক দশকে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও বাণিজ্যিক কর্মচাঞ্চল্য বেড়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য হারাচ্ছে। দিন দিন বিলীন হচ্ছে পাহাড়, বনভূমি, টিলা, পুকুর, বন্যপ্রাণী, গাছপালাসহ বিপুল পরিমাণে প্রাণ ও প্রকৃতি। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবেশ ক্ষতি  অপ্রতিরোধ্য ও বেপরোয়াভাবে দিন দিন পরিবেশ, প্রাণ ও প্রকৃতি নষ্ট করছে। ফলে চট্টগ্রাম দিন দিন বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে।

রেলওয়ের দায়িত্বশীলরা বলেন, রেলের সদর দপ্তর (সিআরবি) এলাকায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) ৫০০ শয্যার হাসপাতাল, ১০০ আসনের মেডিকেল কলেজ ও ৫০ আসনের নার্সিং ইনস্টিটিউট স্থাপনের জন্য বেসরকারি ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে সরকারের চুক্তি হয় গত বছরের মার্চে। সম্প্রতি প্রকল্পের জন্য রেলওয়ে হাসপাতাল কলোনির কোয়ার্টার উচ্ছেদ শুরু হলে বিভিন্ন মহল থেকে প্রতিবাদ শুরু হয়। এখনও কোনো ধরনের কাজ শুরু হয়নি। তবে এ প্রকল্পের জন্য ৬ একর জমির কথা বলা হয়েছে পরিকল্পনায়। সিআরবি এলাকায় বর্তমান রেলওয়ে হাসপাতাল, পাশের খালি জমি ও লাগোয়া রেলওয়ে হাসপাতাল কলোনি এলাকায় এ প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ বিষয়ে সিডিএ’র প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস বলেন, ‘সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণের জন্য আবেদন করা হয়নি। আমাদের মাস্টারপ্ল্যানে এটি হেরিটেজ জোন হিসেবে আছে; সংরক্ষিত এলাকা। আমরা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছি, কোনো বাণিজ্যিক স্থাপনার অনুমোদন দেব না। আর হেরিটেজ জোনে কমার্শিয়াল কিছু করার সুযোগ নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটা নগরীর একটা নান্দনিক স্থান, যেখানে সবাই যেতে পারে। আগে ডিসি হিলে আগে যাওয়া যেত, এখন সর্বসাধারণ সেখানে যেতে পারে না। আমাদের আর কোনো খোলা চত্বর নেই।’ জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘সিআরবির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট করে হাসপাতাল নয়। হাসপাতাল করার জন্য চট্টগ্রামে অনেক জায়গা আছে। চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় রেলের অনেক জায়গা আছে। পাহাড়তলীতেও তাদের জায়গা আছে। যদি প্রয়োজন হয় আমি সিটি করপোরেশন থেকে জায়গা দেব। তবু চট্টগ্রামের জনগণের সঙ্গে একমত হয়ে বলব সিআরবির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট করে হাসপাতাল নয়।’ তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রামের উন্নয়ন সবাই চাইলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট করে কেউ উন্নয়ন চায় না। এটার জন্য চট্টগ্রামের মানুষ অনেক কষ্ট পাচ্ছে। আর এখন যখন নগরবাসী শুনছে সিআরবিতে হাসপাতাল হবে, তখন পরিবেশপ্রেমীসহ সবাই এটার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠছে। আমাদের শিরীষতলা এলাকার মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময় জায়গা বাংলাদেশে আর কোথাও নেই। এসব গাছ আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের চট্টগ্রামের প্রাণ।’

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..