প্রচ্ছদ শেষ পাতা

আট বছরে প্রিমিয়াম আয়ে প্রবৃদ্ধি কমেছে অর্ধেকের বেশি

জীবন বিমা খাত

পলাশ শরিফ: জীবন বিমা কোম্পানিগুলোর এগিয়ে চলার গতি শ্লথ হয়ে পড়ছে। ২০১০ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে এ খাতের গ্রস প্রিমিয়াম আয়ের প্রবৃদ্ধির হার অর্ধেকের বেশি কমেছে। দেশি-বিদেশি ৩২ জীবন বিমা কোম্পানির গ্রস প্রিমিয়াম আয় এখনও ১০ হাজার কোটি টাকার নিচেই রয়ে গেছে।
পিছিয়ে পড়ার জন্য ব্যবসায়িক প্রতিকূল পরিবেশ, কোম্পানির সংখ্যা বৃদ্ধি, সময়োপযোগী পণ্য-সেবা না থাকা, বিমা দাবি নিয়ে কালক্ষেপণের অভিযোগ, ঝরে পড়ার প্রবণতা ও বিমা সম্পর্কে গণমানুষের আস্থার সংকটকে দায়ী করা হচ্ছে। সংকট উত্তরণে পিছিয়ে পড়া কোম্পানিগুলোকে প্রিমিয়াম আয় বাড়ানোর তাগিদ দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১০ সালে পুনর্গঠনের মুখে পড়ে বিমা খাত। শৃঙ্খলা ফিরিয়ে বিমা খাতে গতি আনতে আইন প্রণয়ন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা পুনর্গঠনসহ বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু তারপরও জীবন বিমায় গতি ফেরেনি। বরং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কড়াকড়ি আরোপ, নতুন কোম্পানির কারণে অসুস্থ প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি ও দাবি পরিশোধ নিয়ে জটিলতাসহ আরও কিছু কারণে এ খাতের এগিয়ে চলার গতি শ্লথ হয়ে পড়েছে। সময়ের সঙ্গে কোম্পানিগুলোর গ্রস প্রিমিয়াম আয়ের প্রবৃদ্ধিও কমছে।
২০১০ সালে জীবন বিমা খাতে ১৮ কোম্পানি ছিল। ওই বছর কোম্পানিগুলো প্রায় পাঁচ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা গ্রস প্রিমিয়াম আয় করেছিল। আর প্রিমিয়াম আয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮ দশমিক ৪০ শতাংশ। নিয়ন্ত্রক সংস্থার তোপের মুখে পরের বছর থেকে পিছিয়ে পড়তে শুরু করে জীবন বিমা কোম্পানিগুলো। ২০১৫ সালে এসে ওই প্রবৃদ্ধি সর্বনি¤œ তিন দশমিক ৩৯ শতাংশে নেমে যায়। এর আগের দুবছরের ইতিবাচক ধারায় কোম্পানিগুলো কিছুটা এগোলেও ২০১৭ সাল শেষেও গ্রস প্রিমিয়াম আয়ের প্রবৃদ্ধি এখনও আট দশমিক শূন্য তিন শতাংশে আটকে আছে। ওই বছরে প্রায় আট হাজার ১৯৮ কোটি টাকা গ্রস প্রিমিয়াম আয় করেছে কোম্পানিগুলো। আট বছরে জীবন বিমা কোম্পানির সংখ্যা বাড়লেও গ্রস প্রিমিয়াম আয়ের প্রবৃদ্ধি এখনও ২০১০ সালের অর্ধেকের কম রয়ে গেছে।
এদিকে নতুন কোম্পানি এলে বিমা ব্যবসার পরিধি বাড়বে বলে দাবি করা হলেও বাস্তব চিত্র উল্টো। নতুন ১৪ কোম্পানি অনুমোদনের পর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুরোনো ব্যবসা ভাগাভাগি হচ্ছে। কোম্পানির তুলনায় ব্যবসার পরিধি বাড়েনি। বরং এর জেরে ওই খাতে অসুস্থ প্রতিযোগিতা আরও প্রকট হয়েছে। ২০১৩ সালের পর থেকে বায়রা, গোল্ডেন, হোমল্যান্ড, মেঘনা, পদ্মা ইসলামী, প্রগ্রেসিভ, সন্ধানী ও সানলাইফসহ পুরোনো প্রায় অর্ধেক কোম্পানি পিছিয়ে পড়তে শুরু করেছে। এর বিপরীতে রাষ্ট্রায়ত্ত জীবন বীমা করপোরেশন, বহুজাতিক কোম্পানি মেটলাইফ ও ফারইস্ট ইসলামী, ন্যাশনাল ও ডেল্টার মতো বেসরকারি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোর ওপর ভর করে এগিয়ে যাচ্ছে জীবন বিমা খাত।
এগিয়ে থাকা দেশীয় কোম্পানি ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক মনজুরুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে দেশের জীবন বিমা খাতের পরিধি বাড়ছে। সে সঙ্গে বাড়ছে প্রতিযোগিতাও। এগিয়ে থাকার জন্য নতুন-সময়োপযোগী বিমা পণ্য, গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণ, স্বল্প সময়ে দাবি পরিশোধ ও গ্রাহকবান্ধব করে কোম্পানিকে গড়ে তুলতে হবে। গ্রাহকরা সন্তুষ্ট হলে কোম্পানি এগিয়ে যাবে।’
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অদূরদর্শী নির্দেশনাসহ বেশকিছু ইস্যুতে বিতর্কের মুখে পড়ায় জীবন বিমা কোম্পানিগুলো কয়েক বছর ধরে খারাপ সময় পার করছে, যার প্রতিফলন নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিবেদনে দৃশ্যমান। অতীতের ধকল কাটিয়ে টিকে থাকতে হলে কোম্পানিগুলোকে সময়োপযোগী পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। সুস্থ প্রতিযোগিতার মাধ্যমেই এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। অন্যথায় আজকের পিছিয়ে পড়া কোম্পানিগুলো বাড়তি ব্যয় ও বিমা দাবির বোঝা বইতে গিয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।
প্রতিযোগিতার মুখে পিছিয়ে পড়া কোম্পানি মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন আহমদ শেয়ার বিজকে বলেন, ‘গত কয়েক বছরে জীবন বিমা কোম্পানিগুলোকে খুব খারাপ সময় পার করতে হয়েছে। বিমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ, অর্থ মন্ত্রণালয় ও দুদকের হস্তক্ষেপের কারণে কোম্পানিগুলো ইমেজ সংকটে পড়েছে। এর মধ্যে নতুন ১৪ কোম্পানি ব্যবসা শুরু করেছে। এতে খাতটিতে প্রতিযোগিতা আরও বেড়েছে। ব্যবসা ভাগাভাগি হয়ে যাওয়ায় পুরোনো অনেক কোম্পানিকে পিছিয়ে পড়তে হয়েছে। তবে জীবন বিমা কোম্পানিগুলো অতীতের দায়-দুর্নাম কাটিয়ে উঠছে। আশা করছি, অল্প সময়ের মধ্যেই জীবন বিমা কোম্পানিগুলো প্রত্যাশিত পথে হাঁটবে।’

 

সর্বশেষ..