দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

আট শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন এডিবির

নিজস্ব প্রতিবেদক: আগামী ২০১৯-২০ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি আট শতাংশ অর্জিত হবে বলে প্রাক্কলন করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), যা সরকারের প্রাক্কলনের (আট দশমিক ১৩ শতাংশ) চেয়ে কিছুটা কম। ম্যানিলাভিত্তিক সংস্থাটি বলেছে, চলতি বছরের পাশাপাশি আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরেও জিডিপির প্রবৃদ্ধি আট শতাংশ বজায় থাকবে। গতকাল বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এডিবির ঢাকাস্থ কার্যালয়ে ‘এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক ২০১৯’ প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানায় সংস্থাটি। প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এডিবির ঢাকা কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ সং চ্যাং হং। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন ঢাকায় নিযুক্ত সংস্থাটির আবাসিক প্রধান মনমোহন প্রকাশ।
এডিবি বলেছে, আগামী দুই অর্থবছরে এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ রেকর্ড করবে। এ বছর বাংলাদেশে কেন আট শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে, তার পেছনে কী কী বিষয় নিয়ামকের ভূমিকা থাকবে, তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন এডিবির আবাসিক প্রধান মনমোহন প্রকাশ। তিনি বলেন, রফতানিতে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকা, সরকারি বিনিয়োগ বাড়ার পাশাপাশি ব্যক্তি খাতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে।
গত ১৯ মার্চ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সভা শেষে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানিয়েছেন, এবছর শেষে প্রবৃদ্ধি হবে আট দশমিক ১৩ শতাংশ। সেখানে এডিবি জানিয়েছে, প্রবৃদ্ধি হবে আট শতাংশ, যদিও দুই পক্ষের প্রক্ষেপণের মধ্যে তফাত বেশি নেই।
সাত মাস আগে গত সেপ্টেম্বরে এডিবির আগের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি সাত দশমিক পাঁচ শতাংশ অর্জনের প্রাক্কলন করা হয়েছিল। এখন কেন তা আট শতাংশের কথা বলা হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে মনমোহন প্রকাশ বলেন, গত সেপ্টেম্বরে জিডিপির যে প্রাক্কলন করা হয়েছিল, তা ছিল তিন মাসের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে। আর এখন যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তা অর্থবছরের আট মাসের (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেওয়া হয়েছে। তবে একটি দেশের জন্য জিডিপির প্রবৃদ্ধিই সবকিছু নয়। এটি অর্থনীতির একটি সূচক মাত্র এবং একটি নম্বর মাত্র। অবশ্যই অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের ওপর জোর দেওয়া উচিত। এছাড়া দুর্যোগ প্রতিরোধ, ভবন কোডসহ সুশাসনের ওপর গুরুত্ব বাড়ানোর তাগিদ দেন মনমোহন প্রকাশ।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধকে কীভাবে দেখছেনÑএমন প্রশ্নের জবাবে এডিবির আবাসিক প্রধান বলেন, এর মাধ্যমে বাংলাদেশ লাভবান হবে। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছে। এখানে শ্রমিকদের মজুরি অনেক কম। তাই চীনের নজর থাকবে বাংলাদেশের ওপর। চীনের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে।
তবে এত অর্জনের মধ্যেও বাংলাদেশের জন্য বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ দেখছে এডিবি। এশিয়ান উন্নয়ন আউটলুক প্রতিবেদনে এডিবি বলেছে, ব্যবসা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক পেছনে। নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হলেও ব্যবসা সূচকে এখনও আশানুরূপভাবে এগুতে পারেনি বাংলাদেশ। বন্দর, সড়ক সেতুসহ অবকাঠামো নির্মাণে বাংলাদেশের সীমাবদ্ধতা ফুটে উঠেছে। অবকাঠামো খাতে এখানে আরও অনেক উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে। ব্যাংক খাত অত্যন্ত দুর্বল। ব্যাংক খাতের উন্নয়ন করতে হবে। মন্দ ঋণ বা ঋণখেলাপির পরিমাণ কমাতে হবে। মনমোহন প্রকাশ বলেন, বাংলাদেশের অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আট শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার কমিয়ে আনা ও ব্যাংক আইনের কঠোর বাস্তবায়ন করা জরুরি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে একটিমাত্র রফতানি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। সেটি হলো পোশাক খাত। শুধু একটি রফতানি পণ্য দিয়ে এগুনো যায় না। জাহাজ নির্মাণ শিল্প, চামড়া ও আইটি খাত বাংলাদেশে সম্ভাবনাময় খাত বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এডিবির ঢাকা কার্যালয়ের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ সং চ্যাং হং বলেন, এদেশে রাজস্ব আদায়ের হার জিডিপির অনুপাতে অনেক কম। এই হার বাড়াতে হবে। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে হলে ব্যবসার পরিবেশ উন্নতি করতে হবে। রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ করতে হবে। একই সঙ্গে ১৬ কোটির বেশি এই দেশের মানুষকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপ দিতে হবে। তাহলে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে।
বাংলাদেশকে নিয়ে এডিবির পূর্বাভাস হলো একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোটামুটি স্থিতিশীল থাকবে। রফতানি ও প্রবাসীদের পাঠানো আয় বাড়বে। কর আদায়ের হার বাড়বে। সরকারি বিনিয়োগে বিদেশি ঋণের পরিমাণ বাড়বে। তবে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হার বাড়বে বলে আশঙ্কা এডিবির। এর পেছনে কারণ হিসেবে সংস্থাটি বলেছে, সরকার বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যার প্রভাব পড়বে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর। কৃষি ও শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়লেও সেবা খাতে প্রবৃদ্ধি কমবে বলেও মনে করে এডিবি। প্রবৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি সুশাসনের ওপর জোর দেওয়ার তাগিদ দিয়েছে এডিবি।

সর্বশেষ..