সুশিক্ষা

আঠারোর ইতিবৃত্ত

মানবজীবন যে যান্ত্রিক! ঘূর্ণায়মান আবর্তে, সময়ের প্রয়োজনে ছেড়ে দিতে হয় স্থান। শিক্ষাজীবনও ঠিক তেমনই। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শুরু হওয়া কোনো শিক্ষার্থীর আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনের ইতি ঘটে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের মধ্য দিয়ে। শিক্ষা সমাপনী উপলক্ষে স্নাতক শিক্ষার্থীরা শেষ বর্ষে এসে আয়োজন করে র‌্যাগ ডে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের ১৮তম ব্যাচের র‌্যাগ ডে নিয়ে লিখেছেন আসিফ হাসান রাজু

শীতের কুয়াশাভেজা সকালে সবেমাত্র উদিত সূর্যের রশ্মি এসে পড়েছে শিশিরভেজা দুবলার ওপর। দেখে মনে হচ্ছে, হিরের টোপর! ক্যাম্পাস প্রায় ফাঁকা। এর মাঝেই বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী সাদা টি-শার্ট পরে দাঁড়িয়ে রয়েছে সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী ভবনের সামনে। সবার হাস্যোজ্জ্বল চেহারা। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও অনেকে এসে উপস্থিত। সব মিলিয়ে ৪৫ জনের একটি দল। সবাই সাদা টি-শার্ট পরে হাসি-আড্ডায় মেতে উঠেছে আর একে অপরের টি-শার্টে মনের কোণে জমে থাকা অগোছালো কথাগুলো রঙিন কালি দিয়ে লিখছে।

চার বছর একসঙ্গে কাটানোর হাজারো স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও মন্তব্য লিখে স্মরণীয় করে রাখতে ব্যস্ত সবাই। নিমিষে ধবধবে সাদা টি-শার্ট ভরে উঠেছে বন্ধুদের কলমের আঁচড়ে। কেউ লিখেছে, ‘ভালো থেকো বন্ধু।’ আরেকজন লিখেছে, ‘আর কেউ মনে না রাখুক, তুই রাখিস।’ অনেকে লিখেছে ভণ্ড ছেলে, ঘুমবাজ, লেটবয়, ভদ্র ছেলে। এভাবে চার বছরের নানা অব্যক্ত কথা লিখে তারা সাদা টি-শার্টগুলো ভরিয়ে তুলেছে। যে কথাগুলো হয়তো আগে কখনও বলা হয়নি।

এরপর শুরু আবির খেলা। সাউন্ড বক্সে গানের তালে আবিরের আলতো ছোঁয়ায় নিজেদের রাঙাতে ব্যস্ত সবাই। এদিন নাচ, গান, আড্ডা আর হইহুল্লোড়ে দিনভর মেতে ওঠে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের ১৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। পুরো ক্যাম্পাস ঘুরে ফ্লাশ মব, র‌্যালি, সেলফি আর গ্রুপ ছবিতে দিনটি স্মরণীয় করে রাখতে কেউ হয়তো কার্পণ্য করেনি সেদিন।

আঠারো মানেই যে তারুণ্য! সদা হাস্যোজ্জ্বল। আঠারো মানেই বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। ‘আঠারো বছর বয়স, কী দুঃসাহসেরা দেয় যে উঁকি’ বিদ্রোহের কবি, বিপ্লবের কবি, প্রতিবাদের কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তার এ কবিতার শেষে লিখেছিলেন, ‘এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে।’ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের ১৮তম ব্যাচ যেন কবি সুকান্তের ভাষারই প্রতিচ্ছবি।

র‌্যাগ ডেতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী নূর মুর্শিদা রাসূল চার বছর একসঙ্গে কাটানো স্মৃতির কথা তুলে ধরে জানালেন, ব্যাচের শিক্ষার্থীরা শুধু তার বন্ধু নয়, তারা তার সহযোগী। সুখে-দুঃখে তারা সবার আগে এগিয়ে আসে। তাদের কাছে নিজের অনেক অব্যক্ত কথা শেয়ার করা যায়। শিক্ষাজীবনের শেষ প্রান্তে এসে মনে হচ্ছে খুব দ্রুতই দিনগুলো শেষ হয়ে গেল। ক্যাম্পাসে কাটানো দিনের স্মৃতিগুলোর মধ্যে র‌্যাগ ডের এ দিনটি সবচেয়ে সেরা বলে অনুভূতি প্রকাশ করেন আরেক শিক্ষার্থী জুবায়দা গুলশানা আরা লিজা। তিনি আরও বলেন, দিনটি একই সঙ্গে আনন্দের, আবার বেদনারও। তার পাশ থেকে নিজের অনুভূতির কথা বলেন মুন্নাফ, প্রিতম, রাব্বি, সোয়েব, রেজওয়ান, মেহেদী ও মাসুদ। তারা এক ঙ্গে বলেন, এত তারাতাড়ি যে প্রিয় ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যেতে হবে, তা ভাবতে পারিনি। সময় বলে দিচ্ছে এবার যেতে হবে। ছেড়ে দিতে হবে স্থান।

সন্ধ্যায় সবাই ফানুশ উৎসবের আয়োজন করে। পরে নগরীর একটি রেস্তোরাঁয় রাতের খাবারের ব্যবস্থা করে তারা। এখানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দেন বিভাগের শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। আনুষ্ঠানিকতা শেষে এভাবে ব্যস্ত একটা দিন কাটিয়ে একে অপরকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বিদায় নেয় তারা। বেলাশেষে দিনটি ইঙ্গিত দেয়Ñ‘সময় ফুরিয়ে এসেছে, ছেড়ে যেতে হবে হয়তো খুব দ্রুত আঠারোর এ বন্ধন।’

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..