প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

আড়াই দশকে চট্টগ্রাম কাস্টমসের আয় বেড়েছে ১২ গুণ

সাইদুর রহমান, চট্টগ্রাম: আড়াই দশকের ব্যবধানে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের রাজস্ব আহরণ বেড়েছে ১২ গুণের বেশি। অর্থাৎ ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে দেশের সর্ববৃহৎ শুল্ক স্টেশনে রাজস্ব আয়ের পরিমাণ ছিল মাত্র চার হাজার ৮১৪ কোটি টাকা; যা বর্তমান অর্থবছরের এক মাসের আয়ের তুলনায়ও কম। সময়ের বিবর্তনে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে রাজস্ব আয়ে। সদ্যবিদায়ী অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস রাজস্ব আহরণ করেছে ৫৯ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা, যা ২০২১-২২ অর্থবছরের মোট জাতীয় বাজেটের প্রায় ১০ শতাংশ।

বিদায়ী অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস যে রাজস্ব আহরণ করেছে, তা আগের কোনো বছরেই আহরণ হয়নি। তবে প্রবৃদ্ধির হার ওঠানামা করেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরেও গত অর্থবছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধির হার বেশি ছিল। ওই বছরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২৩ দশমকি ২৩ শতাংশ। তবে ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ১৫ শতাংশ হলেও তার আগের বছরের তুলনায় সাত হাজার ৬৮০ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আহরণ হয়। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির তারতম্য হলেও রাজস্ব আহরণের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় ক্রমান্বয়ে বেড়েছে।

তবে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস বলছে, সরকারি কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছে বৃহৎ অঙ্কের বকেয়া না থাকলে বিদায়ী অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়াত ২২ দশমিক ৪২ শতাংশ। তারা বলছেন, মাত্র সাতটি প্রতিষ্ঠানের কাছেই বকেয়া রয়েছে তিন হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা। তার মধ্যে পেট্রোবাংলার কাছে বকেয়া তিন হাজার ৬৯৯ কোটি ২৮ লাখ টাকা। এছাড়া পদ্মা অয়েল কোম্পানির কাছে ১১৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা, মেঘনা পেট্রোলিয়ামের কাছে ২৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা, স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েলের কাছে ৫৭ লাখ টাকা, সামিট এলএনজির কাছে পাঁচ কোটি ১১ লাখ টাকা, এক্সিলারেট এনার্জির কাছে ১৩ লাখ টাকা এবং বাংলাদেশ পুলিশের কাছে ৩৪ কোটি ২১ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। এতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস সাত শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হারিয়েছে। অর্থাৎ বকেয়া রাজস্ব আহরণ হলে বিদায়ী অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের রাজস্ব আয়ের পরিমাণ দাঁড়াত ৬৩ হাজার ১৪০ কোটি টাকা; যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ১১ হাজার ৩৮৪ কোটি টাকা বেশি হতো।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের গত ২৭ বছরের রাজস্ব আয়ের চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রবৃদ্ধির হারে তারতম্য থাকলেও দু-একটি অর্থবছর ছাড়া বাকি সব কয়টিতে ক্রমান্বয়ে রাজস্ব আহরণ বেড়েছে। বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, জাতীয় নির্বাচনের বছরগুলোয় ব্যাপকহারে প্রবৃদ্ধি হারাচ্ছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। গত ২৭ বছরে বাংলাদেশে পাঁচটি জাতীয় নির্বাচন হয়েছে। এসব নির্বাচনী অর্থবছরের সবকটিতে পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি কম হয়েছে কাস্টম হাউসে। তবে সবগুলো নির্বাচনী বছরের আগের অর্থবছরটিতে অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশি রাজস্ব আহরণ হতে দেখা গেছে।

১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের প্রবৃদ্ধি ছিল চার দশমিক ৩৫ শতাংশ। কিন্তু তার পরের অর্থবছরগুলোয় যথাক্রমে ৮ দশমিক শূন্য চার শতাংশ, ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ ও ৮ দশমিক ২৭ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। তবে ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হলেও ২০০০-০১ অর্থবছরে ঘুরে দাঁড়ায় কাস্টমস। সে বছর চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস প্রবৃদ্ধি অর্জন করে ২০ দশমিক ৩৯ শতাংশ। তার পরের অর্থবছরেরই ফের প্রবৃদ্ধি হারায় চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। অর্থাৎ ২০০১-০২ অর্থবছরে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়; ওই বছর প্রবৃদ্ধি হয় মাত্র চার শতাংশ। কিন্তু তার আগের অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২০ শতাংশের বেশি।

রাজস্ব প্রবৃদ্ধির এ ধারাবাহিকতায় দেখা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছর প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়ায় দুই শতাংশে; ওই বছরও দেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তারপর ২০১৯-২০ অর্থবছরের শেষের দিকে কভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাবে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৮ দশমিক ২১ শতাংশ কম রাজস্ব আয় করে তিন দশমিক ৯৬ শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধির কবলে পড়ে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। তারপর ২০২০-২১ অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টমস ২৩ দশমিক ২৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে; যা গত ২৭ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি ছিল। ওই বছর চট্টগ্রাম কাস্টম রাজস্ব আয় করেছিল ৫১ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা। তারপর সর্বশেষ বিদায়ী অর্থবছরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের রাজস্ব আহরণ ছিল ৫৯ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা; তাতে প্রবৃদ্ধি অর্জন হয়েছে ১৫ শতাংশ। এদিকে চলতি অর্থবছর অর্থাৎ ২০২২-২৩ অর্থবছরের শেষের দিকে ফের অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় নির্বাচন। এখন দেখার পালা চলতি অর্থবছরে কেমন রাজস্ব আয় করে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস!

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার ফখরুল আলম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস বিদায়ী অর্থবছরে ভালো রাজস্ব আয় করেছে। এতে প্রবৃদ্ধির হারও ভালো ছিল। তবে সরকারি কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছে বড় অঙ্কের বকেয়া না থাকলে বিদায়ী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়াত ২২ দশমিক ৪২ শতাংশ। এসব প্রতিষ্ঠনের কাছে বকেয়া রয়েছে তিন হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা।’