আত্মকর্মসংস্থানে নারীদের শোপিস ব্যবসা

এম খালেক: নিগার সুলতানা একজন গৃহবধূ। বয়স ৪৯ বছর। ইন্টারমিডিয়েট পড়াকালে বিয়ে হয়ে যাওয়ায় লেখাপড়া আর বেশিদূর এগোয়নি। স্বামী এএসএম সফিউল আযম এজাজ একটি বেসরকারি ট্রাভেল এজেন্সিতে চাকরি করতেন। স্বামী আর একমাত্র মেয়েকে নিয়ে নিগার সুলতানার সংসার বেশ ভালোই চলছিল। তেমন কোনো উচ্চাভিলাষী নেই বলে অপ্রাপ্তির বেদনা কখনোই নিগার সুলতানাকে বিপন্ন করেনি। মেয়েকে উচ্চশিক্ষিত করে মানুষের মতো মানুষ করবেন এটাই ছিল নিগার সুলতানার একমাত্র লক্ষ্য। সবকিছুই পরিকল্পনামাফিক চলছিল। কিন্তু সংকট দেখা দেয় করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর। সৌদি সরকার পবিত্র হজ এবং ওমরা পালন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। করোনার কারণে দেশের পর্যটন স্পটগুলো বন্ধ করে দিলে সামগ্রিকভাবে পর্যটন শিল্পে বিপর্যয় নেমে আসে। একসময় হজ এজেন্সি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। এতে চাকরি হারান নিগার সুলতানার স্বামী এজাজ। জমানো টাকা দিয়ে সংসার চালানোর চেষ্টা করেন নিগার সুলতানা। কিন্তু একসময় সেই টাকাও প্রায় শেষ হয়ে আসে। নিগার সুলতানা চোখে অন্ধকার দেখতে থাকেন। কীভাবে সংসার চালাবেন এই চিন্তায় রাতে তার ঘুম আসে না। এই অবস্থায় নিগার সুলতানা ভাবতে থাকেন, শোপিস তৈরি করে তা বিক্রি করলে কেমন হয়? কলেজে পড়া অবস্থায় তিনি শোপিস তৈরি করা শিখেছিলেন এবং এ কাজে বেশ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। অনেকেই তার কাজের প্রশংসা করতেন। নিগার সুলতানা তার স্বামীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। স্বামী এজাজ তার এই প্রস্তাবে খুব খুশি হলেন এবং উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণসহ তাকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। শুরু হয় নিগার সুলতানার নতুন জীবন। তিনি সাধারণ গৃহবধূ থেকে একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তায় পরিণত হলেন। নিগার সুলতানা শোপিস তৈরি করেন এবং স্বামী এজাজ তা বাজারজাত করতে থাকেন।

নিগার সুলতানার হাতে তৈরি শোপিসগুলো ক্রেতাদের কাছে দারুণ সমাদৃত হচ্ছে। এভাবে করোনাকালে আর্থিক সংকট তারা কিছুটা হলেও কাটিয়ে উঠতে সমর্থ হন। দিন দিন এর চাহিদা বেড়েই চলেছে। নিগার সুলতানার স্বামী পুনরায় চাকরিতে প্রবেশ করেছেন। এখনও কি শোপিস তৈরি করবেন? তিনি ঠিক করলেন, যেহেতু শোপিস তৈরির মাধ্যমে তিনি সংসারের জন্য সৎভাবে কিছু অর্থ উপার্জনের সুযোগ পেয়েছেন, তিনি এটাকে অব্যাহত রাখবেন। ভবিষ্যতে তার এই কাজকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ তিনি দিতে চেষ্টা করবেন। এদিকে নিগার সুলতানার স্বামী এজাজ একটি পত্রিকার বিজ্ঞাপন বিভাগে চাকরি পেয়ে যান। স্বামী-স্ত্রীর চেষ্টায় তাদের সংসারে আবারও আর্থিক সচ্ছলতা ফিরে এসেছে।

নিগার-এজাজ দম্পতির এই জীবন সংগ্রাম আমাদের জন্য একটি শিক্ষণীয় বিষয়। মানুষ আন্তরিকভাবে চেষ্টা করলে যেকোনো কাজে সফল হতে পারেন, নিগার-এজাজ দম্পতি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ভয়াবহ অতিমারি করোনা আমাদের অনেক কিছুই কেড়ে নিয়েছে। আবার বেঁচে থাকার নতুন নতুন পথও দেখিয়েছে। প্রত্যেক মানুষের মাঝেই সৃজনশীল উদ্ভাবনী শক্তি আছে। প্রয়োজন শুধু তাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো। নিগার সুলতানা তার এই হাতের কাজকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চান। কিন্তু এখনও তিনি জানেন না কীভাবে তা করতে হবে? কীভাবে অর্থায়ন জোগাড় করতে হবে? তবে তিনি একটি হস্তশিল্প সমিতির সঙ্গে যোগাযোগ করে এসব বিষয়ে জানতে চেষ্টা করছেন।

করোনা অতিমারির আঘাতে অর্থনীতির সব সেক্টরই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অতিক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প। বিশেষ করে এই খাতে কর্মরত নারী উদ্যোক্তারা প্রায় বিপন্ন অবস্থার মধ্যে রয়েছেন। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, দেশের উন্নয়ন, বিশেষ করে করোনা-উত্তর অর্থনৈতিক পুনর্বাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র এবং কুটির শিল্পের উদ্যোক্তাদের সহায়তা করা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত বিভিন্ন পেশার মানুষ যে অর্থনৈতিক অবদান রাখছেন তার পরিমাণ জিডিপি’র প্রায় ৮৭ শতাংশ। যদিও তাদের সেই অবদানের বিষয়টি আনুষ্ঠানিক জিডিপি’র হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। দেশব্যাপী ছড়িয়ে থাকা করোনার কারণে প্রায় বিপন্ন ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পগুলোকে আবারও পুনর্জাগরিত করতে হবে। একইসঙ্গে এই খাতে নতুন নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি করতে হবে। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে তুলনামূলক স্বল্প বিনিয়োগে অধিকসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। কাজেই দারিদ্র্য বিমোচনেও এই খাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

বর্তমান সরকার উন্নয়নের সরকার। সরকার ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের গুরুত্ব উপলব্ধি করেই এই খাতের উন্নয়নের জন্য নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পগুলোর সবচেয়ে বড় অসুবিধা হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে। বিনিয়োগ আহরণের জন্য তাদের গ্রামীণ মহাজন এবং এনজিওদের কাছে ধরনা দিতে হতো। তাদের কাছ থেকে অর্থায়ন পাওয়া গেলেও তার সুদের হার ছিল অত্যন্ত বেশি। এই সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর এক সার্কুলার জারির মাধ্যমে স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজের (এসএমই) প্রচলিত সংজ্ঞায় পরিবর্তন এনেছে। এখন থেকে অতিক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পকে অন্তর্ভুক্ত করে এই সেক্টরের নতুন নামকরণ করা হয়েছে ‘কটেজ, মাইক্রো, স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ’ (সিএমএসএমই)। ফলে অতিক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তাদের ব্যাংকঋণ প্রাপ্তিসহ এসএমই খাতের জন্য দেয়া অন্যান্য সুবিধা পাওয়ার পথ উš§ুক্ত হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদের সাম্প্রতিক এক সভায় সিএমএসএমই খাতের নারী উদ্যোক্তাদের জামানতবিহীন ঋণদানের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। কয়েকদিন আগে বাংলাদেশ ব্যাংক সিএমএসএমই খাতের নারী উদ্যোক্তাদের ৫ শতাংশ সুদে ব্যাংকঋণ দেয়ার জন্য শিডিউল ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক শিডিউল ব্যাংকের প্রতিটি শাখায় ‘উইমেন ডেস্ক’ স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছে। নারী উদ্যোক্তারা এখন ব্যাংকে গেলে সহজেই তাদের সমস্যা নিয়ে আলাপ করতে পারছেন। ব্যাংকগুলোও আগের তুলনায় নারী উদ্যোক্তাদের প্রতি অধিকতর সহানুভূতি প্রদর্শন করছে।

আগে নারী উদ্যোক্তাদের অনেকেই ব্যাংকে গিয়ে ঋণের জন্য আবেদন করেও জামানত দিতে না পারার জন্য ঋণ পেতেন না। কিন্তু এখন আর সেই সমস্যা নেই। এখন নারী উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন স্বল্প সুদে তুলনামূলক সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তির দ্বার উম্মুক্ত হয়েছে। ২০১০ সাল থেকে চলে আসা কৃষি ও পল্লি ঋণের আওতায় এ বছর শিডিউল ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ২৮ হাজার কোটি টাকা। সাধারণভাবে এই ঋণের সুদের হার ৮ শতাংশ। তবে নারী উদ্যোক্তারা ৫ শতাংশ সুদে এই ঋণ পেতে পারেন। আর এসব উদ্যোগের ফলেই করোনাভাইরাসের মহামারিতেও টিকে থাকে নিগার সুলতানার মতো অনেক অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা।

পিআইডি নিবন্ধন

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন   ❑ পড়েছেন  ৯২৮  জন  

সর্বশেষ..