মত-বিশ্লেষণ

আত্মহত্যা রোধে প্রয়োজন মানসিক সুস্থতা

অনন্যা রানী মণ্ডল: কিছুদিন ধরে বাসার কারও সঙ্গেই প্রার্থনার সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটি বা রাগ-অভিমান চলছিল। কলেজ শিক্ষক বাবা মোতাহের হোসেন, মা রোকেয়া বেগম, ছোটভাই এমনকি কাজের বুয়া জোসনার সঙ্গেও। পড়াশোনায়ও বেশ অমনোযোগী হয়ে ওঠেছিল। পড়ার টেবিলে মাথা গুঁজে বসে থাকত। স্কুলে যেতে চাইত না। গেলেও সহপাঠীদের সঙ্গে আগের মতো মিশত না। সবচেয়ে প্রিয় যে কয়জন বান্ধবী রয়েছে তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করত না। মা বুঝতে পেরেছিলেন, কোনো ঘটনা ঘটতে চলেছে। সত্যি সত্যি ঘটনা ঘটে গেল। অনেক ডাকাডাকির পর নিজের কক্ষের দরজা যখন খুলছিল না, তখন বাড়ির দারোয়ান ও পাশের ফ্ল্যাটের হুমায়ুন সাহেবের সহযোগিতায় দরজা ভেঙে দেখা গেল বিছানায় পড়ে থাকা প্রার্থনার নিথর দেহ।

মেহনাজ আফরিন প্রার্থনা নবম শ্রেণির তুখোড় ছাত্রী ও আন্তঃস্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতায় বিজয়ী। সিজোফোনিয়ায় আক্রান্ত তার ফুপুর সব কয়টি ঘুমের বড়ি খেয়ে গভীর রাতে আত্মহত্যা করেছে প্রার্থনা। মায়ের ওপর অভিমান করে আত্মহত্যা করে সে। মোবাইল ফোনের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে মায়ের সঙ্গে মাঝে মধ্যেই কথা কাটাকাটি হতো তার। সেই ক্ষোভেই আত্মহত্যা করে প্রার্থনা। তার এ আত্মহত্যার কারণ উদ্ঘাটন করতে গিয়ে দেখা যায় যে সর্বশেষ সে তার ফেসবুকে লিখেছে, ‘আমার আত্মাহত্যার জন্য দায়ী একমাত্র আমি নিজেই। কাউকে দোষারোপ করছি না। সবাইকে মুক্তি দিয়ে আমি নিজেই চলে গেলাম এই পৃথিবী থেকে। মা-বাবা ক্ষমা করো আমাকে।’

কোনো কাজে ব্যর্থতা, গ্লানি, হতাশা, তীব্র মানসিক যন্ত্রণা বা মানসিক চাপ ইত্যাদি কারণে মানুষ আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হয়। আত্মহনন একটা প্রতিবাদ হলেও কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। দেশের প্রতিটি অঞ্চলেই আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিটি মানুষের কাছে তার জীবন সবচেয়ে প্রিয় এবং মূল্যবান। ভালোভাবে বেঁচে থাকা ও জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার নিরন্তর প্রচেষ্টায় মানুষের ছুটে চলা প্রতিনিয়ত। কিন্তু এই বেঁচে থাকাটাই কেউ অর্থহীন মনে করে এবং জীবনে যখন ভার বহনে নিজেকে অক্ষম মনে করে, তখন সে আত্মহত্যার মতো নিষ্ঠুরতম ও নিন্দীয় পথ বেছে নিয়ে বিষাদমুক্ত হওয়ার নিরর্থক চেষ্টা করে থাকে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

সভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রাচীনকাল থেকেই সমাজে আত্মহত্যা নামক জঘন্য পাপকর্ম সংঘটিত হয়ে আসছে, যার ভয়াবহতা এখনও বিদ্যমান রয়েছে। আত্মহত্যা চিরকালই সামাজিক নিন্দার তালিকায় শীর্ষে রয়েছে। আত্মহত্যাকে ঈশ্বরের অবমাননা হিসেবে জঘন্যতম অপরাধগুলোর একটি বলে গণ্য করা হতো।

বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে প্রতিনিয়ত ঘটে যাচ্ছে আত্মহত্যা। কেউ বিষ খেয়ে, কেউ ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে, কেউ গলায় ফাঁস দিয়ে আবার কেউ নীরবে সূক্ষ্মভাবে জীবন শেষ করে দিচ্ছে। এ বছর জুন পর্যন্ত দেশে আত্মহত্যার সংখ্যা ৬০৬টি, এর মধ্যে ৩৭৪ জন নারী আর ২৩২ জন পুরুষ। আত্মহননকারীদের মধ্যে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বেশি, এরপরই গৃহকর্মী ও শ্রমিকের অবস্থান। এদের ৩৮ শতাংশের বয়স ১১ থেকে ২০ বছর। লক্ষণীয় বিষয়, বেশিরভাগই আত্মহত্যা করেছে গলায় ফাঁস লাগিয়ে। বেসরকারি সংস্থা ‘উন্নত জীবন-জীবিকা’ বিভিন্ন সংবাদের ওপর ভিত্তি করে যে তথ্য পেয়েছে, তাতে দেখা যায়, এসবের পেছনে রয়েছে ক্ষোভ, অভিমান, বিষণœতা, উচ্চ শিক্ষাজীবন শেষে চাকরির অভাব, অস্থিরতা, মাদকাসক্তি, পারিবারিক অশান্তি, যৌতুক, আবেগ ও ব্যক্তিজীবনে হতাশা, দুচিন্তা এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব ইত্যাদি।

এ প্রসঙ্গে ডা. ফারজানা রাবিন বলেন, ‘বিষণœতা ও নানা মানসিক রোগের কারণেই সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। তাছাড়া বয়ঃসন্ধিকালে কিশোর-কিশোরীরা জানে না কীভাবে আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। ফলে খুব তুচ্ছ কারণে সে আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। তাছাড়া বখাটে ছেলেদের দ্বারা স্কুলগামী ছাত্রীদের কিংবা নারীদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছনা, চলার পথে কটূক্তি, অশ্রাব্য টিজের কারণে কিংবা বলপূর্বক দৈহিক নির্যাতন করার কারণেও স্কুলছাত্রী ও নারীদের মধ্যে আত্মহননের প্রবণতা দেখা যায়। তারা নিজেদের সম্ভ্রম ও ইজ্জত রক্ষার্থে কোনো কোনো সময় নিজের প্রিয় জীবনকে আত্মঘাতী করে।’

মানুষের অকালমৃত্যুর জন্য দায়ী শীর্ষ তিনটি কারণের মধ্যে আত্মহত্যা অন্যতম। গত তিন দশকে বিশ্বব্যাপী আত্মহত্যার হার বেড়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ। বিশেষ করে ১১ থেকে ৩৪ বছর বয়সী নারী-পুরুষের মধ্যে এ হার সবেচেয়ে বেশি। প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় আট লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে। প্রতি সেকেন্ডে করে পাঁচজন। সারা পৃথিবীর মতো বাংলাদেশেও প্রতি বছর বাড়ছে আত্মহনন ও আত্মহত্যা চেষ্টার মতো সামাজিক সমস্যা। কিন্তু বাংলাদেশে আত্মহত্যাকে মানসিক অসুস্থতার পরিবর্তে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। যার ফলে আত্মহত্যা প্রবণতা হ্রাস করা যাচ্ছে না। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর সুইসাইড প্রিভেনশন ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৩০ জন আত্মহত্যা করে। প্রায় ৬৫ লাখ মানুষ রয়েছে যারা আত্মহত্যাপ্রবণ। এছাড়া জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ১৪ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর দ্বিতীয় বৃহত্তম কারণ আত্মহত্যা। ২০১৮ সালে ১১ হাজার ৬৫ জন এবং ২০১৭ সালে ১০ হাজার ৬০০ জন আত্মহত্যা করেছে। আত্মহত্যার প্রবণতা পুরুষের তুলনায় নারীদের মধ্যে অধিকমাত্রায় লক্ষ্য করা যায়।

বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোহিত কামাল বলেন, ‘জৈবিকভাবে যেমন মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে আলাদা, তেমনি মানসিকভাবেও আলাদা। মেয়েরা বেশি আবেগপ্রবণ। যখন মেয়েরা আবেগটাকে দমন করতে পারে না, তখন আত্মহত্যা করে। এখানে ইমোশনটা রিলেটেড। হতাশা ও নিজেকে দোষী ভাবা থেকে মুক্তি পেতে তারা আত্মহত্যা করে। আবার দেখা গেছে মেয়েরা বিষণœতায় বেশি ভোগে, সে কারণেও মেয়েদের আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। আত্মহত্যা কোনো একক প্রতিক্রিয়ার ফল নয়। দীর্ঘদিনের সামাজিক, অর্থনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিকসহ অন্যান্য উদ্দীপনামূলক পারিপার্শ্বিক অবস্থার ঘাত-প্রতিঘাতের চরম এবং সবচেয়ে দুঃখজনক পরিণতি হলো আত্মহত্যা।’

প্রার্থনার মতো মেধাবীদের আত্মহত্যা পরিবার এবং রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক ক্ষতি। মনে রাখতে হবে, মানুষের জীবন একটাই। এ জীবনে সফলতা ও ব্যর্থতা দুটোই থাকবে। তাই বলে জীবনকে তুচ্ছ ভাবার কোনো কারণ থাকতে পারে না। তাছাড়া মা-বাবার দৃষ্টিতে কোনো কিছু খারাপ মনে হলে সন্তানকে বকা দিতেই পারেন। সন্তানকে শাসন করার অধিকার প্রতিটি মা-বাবাই রাখেন। এগুলো একটি পরিবারের নিয়মিত ঘটনা। পরিবারের তুচ্ছ ঘটনাকে বড় করার অর্থ নেই। অভিমান থাকতেই পারে, তাই বলে আত্মঘাতী হওয়া যাবে না। আত্মহত্যা কোনোভাবেই কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারে না।

সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য মানবিক গুণ, সৎচিন্তা ও ইচ্ছাশক্তিগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। বন্ধুদের সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বলে, ভালো বই পড়ে এবং ধর্মীয় চর্চার মাধ্যমে বিষণœতা মুক্ত থাকতে হবে। মা-বাবার কথায় রাগান্বিত হওয়ার কিছু নেই, তারা আমাদের পথপ্রদর্শক, তারা মায়া-মমতা দিয়ে আমাদের বড় করেছেন। তারা আমাদের পৃথিবীর আলো দেখিয়েছেন। তাদের স্থান সব সন্তানের কাছে সবার ওপরে হওয়া বাঞ্ছনীয়।

আত্মহত্যা প্রতিরোধ করতে হলে এর কারণগুলো শনাক্ত করে তার প্রতিবিধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বর্তমান সরকার জনগণের কল্যাণে সম্ভব সব কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। আত্মহত্যার মতো সামাজিক সমস্যা সমাধানেও সরকার কাজ করে যাচ্ছে নিরলসভাবে। কর্মহীনতা, দারিদ্র্য ও নারী নির্যাতন আত্মহত্যার অন্যতম কারণ। বেকার হ্রাস ও দারিদ্র্য বিমোচনে সরকার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নারী নির্যাতন রোধে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ও তার প্রয়োগ নিশ্চিত করেছে সরকার। আত্মহত্যার অপর একটি বড় কারণ মাদকাসক্তি। মাদকের অপব্যবহার এবং বিস্তার রোধে সরকার যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এর ফলে মাদকাসক্তির প্রবণতা যেমন হ্রাস পাবে, তেমনি মাদকাসক্তির কারণে আত্মহত্যার সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।

আত্মহত্যা রোধে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সব জায়গায় প্রয়োজন কাউন্সেলিং। অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে, শিশুদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করতে হবে। সন্তানদের আচরণ, কেমন বন্ধুদের সঙ্গে চলাফেরা করছে, কখন ঘুমাতে যাচ্ছে এ সবই বিশেষ করে মায়েদের তদারকি করতে হবে। মানসিক সুস্থতার জন্য আমাদের প্রত্যেকের অবস্থান থেকে সচেতন হওয়া ও সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। মানসিক সুস্থতাই আত্মহত্যা রোধ করতে পারে। মানসিকভাবে সবার সুস্থ সবল থাকার জন্য সুন্দর পারিবারিক পরিবেশ এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অতি গুরুত্বপূর্ণ।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..