নিজস্ব প্রতিবেদক : ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ক্রয়-সংক্রান্ত চুক্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে সম্ভাব্য অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি। সচিবালয়ে গতকাল রোববার অনুষ্ঠিত এক ব্রিফিংয়ে জাতীয় চুক্তি পর্যালোচনা কমিটির বৈঠক শেষে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খানসহ বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চুক্তির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘প্রতিটি চুক্তিতেই একটি স্বীকৃতি ধারা থাকে যে, কোনো দুর্নীতির আশ্রয় নেয়া হয়নি। কিন্তু যদি তা লঙ্ঘিত হয়, চুক্তি বাতিলের সুযোগ থাকে।’
তিনি জানান, চুক্তি বাতিলের একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছেÑকোনো কারণ দেখিয়ে, কিংবা কারণ ছাড়াও তা করা যায়। তবে কারণ ছাড়া বাতিল করলে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়।
অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বলেন, ‘এই চুক্তিগুলো সার্বভৌম চুক্তি, অর্থাৎ একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে একটি কোম্পানির চুক্তি। আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে এগুলো বাধ্যতামূলক। তাই কোনো অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও ইচ্ছামতো বাতিল করা সম্ভব নয়। এতে আন্তর্জাতিক আদালত থেকে বড় অঙ্কের জরিমানার মুখে পড়তে হতে পারে।’
তিনি আরও জানান, কমিটি সার্বিকভাবে চুক্তির প্রক্রিয়া, অনুমোদনের ধাপ এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করেছে। তিনি বলেন, ‘সব তথ্য এখনই প্রকাশ করা যাচ্ছে না, কারণ কিছু বিষয় এখনো তদন্তাধীন। তবে আগামী এক মাসের মধ্যে আরও বেশ কিছু দুর্নীতির প্রমাণ প্রকাশিত হবে বলে আশা করছি।’
মোশতাক খান বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। এই দুর্নীতির কারণে আমাদের বিদ্যুতের দাম প্রতিযোগী দেশের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেশি। ভর্তুকি তুলে দিলে এই পার্থক্য দাঁড়াবে ৪০ শতাংশে। এতে দেশের শিল্প খাত টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।’
তিনি অভিযোগ করেন, ‘যেখানে নীতিগত হস্তক্ষেপ হয়েছে, ওপর থেকে নির্দেশ এসেছে, প্রশাসনও সবসময় নির্দোষ ছিল না। এর মাশুল দিচ্ছে সাধারণ জনগণ, ভোক্তা, ক্রেতা ও করদাতারা।’
দুর্নীতিতে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যারা এই চুক্তি থেকে অস্বাভাবিকভাবে লাভবান হয়েছেন, তাদের আইনি জবাবদিহির মুখে আনতে হবে। আমরা প্রমাণ সংগ্রহ করছি। দেশে-বিদেশে আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে ইনশাআল্লাহ। তবে এটা সময়সাপেক্ষ কাজ। তাড়াহুড়া করলে ভুল হবে।’
এ সময় তিনি জানান, আদানি চুক্তি নিয়ে ইতোমধ্যে দুটি রিট আবেদন হয়েছে। প্রথমটি করেছিলেন বিশিষ্ট আইনজীবী শাহদীন মালিক এবং দ্বিতীয় একটি রিট এখন আদালতের বিবেচনাধীন। আদালত রুল জারি করে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে ৬০ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনোমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন চারগুণ বেড়েছে, কিন্তু বিদ্যুতের জন্য অর্থ পরিশোধ বেড়েছে ১১ দশমিক ১ গুণ। এটা কোনো প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যায় মেলানো যায় না। ২০১১ সালে বিদ্যুতের জন্য পরিশোধ করা হয়েছিল ৬৩৮ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে। কিন্তু এই বিপুল ব্যয়ের বিপরীতে প্রাপ্ত বিদ্যুৎ পরিমাণে বৈষম্য রয়েছে।’
ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘বিশেষ বিধান আইনের আওতায় বারবার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে, দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে, যা অনিয়মের সুযোগ তৈরি করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে প্রশাসনিক ক্ষমতা কেন্দ ীভূতকরণÍবিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর অধীনে থাকায় কার্যকর তদারকি ব্যাহত হয়েছে। আমাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই কাঠামোগত দুর্বলতা ও অস্বচ্ছতা বিদ্যুৎ খাতে অকার্যকারিতা, অপচয় ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন জবাবদিহি ও সংস্কারের উদ্যোগ।’
উপদেষ্টারা জানান, চুক্তি পর্যালোচনার এই প্রক্রিয়া শেষ হলে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। সেই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতে বড় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে করা চুক্তিতে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার সুপারিশ জানানো হবে।
প্রিন্ট করুন









Discussion about this post