দিনের খবর প্রচ্ছদ সারা বাংলা

আদালতের নির্দেশ মানছেন না মেয়াদোত্তীর্ণ সিবিএ নেতারা

চট্টগ্রাম বন্দর

মোহাম্মদ আলী, চট্টগ্রাম: মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও দায়িত্ব ছাড়তে রাজি নন চট্টগ্রাম বন্দর কর্মচারী পরিষদের (সিবিএ) সর্বশেষ নির্বাচিত কার্যকরী পরিষদ কর্তারা। দায়িত্ব ধরে রাখতে আদালতের নির্দেশনা ও শ্রম আইনের তোয়াক্কা করছেন না তারা; এমনকি নির্বাচন আয়োজনে শ্রম দপ্তরের নির্দেশনাকেও বারবার বৃদ্ধাঙুলি দেখিয়ে চলেছেন। মেয়াদ শেষ হওয়ার এক মাস আগে কমিটি বিলুপ্ত করে নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরুর কথা থাকলেও সেটি করারও প্রয়োজন মনে করেন না তারা। ট্রেড ইউনিয়নের ধারা পালনের কোনো বালাই নেই তাদের মধ্যে। নির্বাচন আয়োজন করতে শ্রম দপ্তর থেকে তিনবার চিঠি দিলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। অন্যদিকে ক্ষমতা নেই বলে কিছু করার নেই বলে দোহাই দিচ্ছে শ্রম দপ্তর।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্মচারী পরিষদ চট্টগ্রাম বন্দরে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের রেজিস্টার্ড ট্রেড ইউনিয়ন। এটি দেশের শ্রম আইন ও অনুমোদিত সংবিধান দ্বারা পরিচালিত হয়। এ সিবিএ’র সর্বশেষ নির্বাচিত কমিটির মেয়াদ শেষ হয় গত বছরের ২৩ আগস্ট। ট্রেড ইউনিয়নের ২৪ ধারা অনুযায়ী নির্বাচিত হওয়ার দুবছরের মধ্যে গোপন ব্যালটে নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা থাকরেও মেয়াদোত্তীর্ণ বর্তমান কার্যকরী পরিষদ আজ পর্যন্ত নির্বাচনের ব্যবস্থা না করায় সাধারণ সদস্যদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।

অভিযোগ উঠেছে, মেয়াদোত্তীর্ণ এ কমিটির শীর্ষ নেতারা কৌশলে নির্বাচন না দিয়ে দায়িত্বে থেকে যেতে চাইছেন  এবং বন্দরের অনুমতি ছাড়াই আইন অমান্য করে সভা-সমাবেশ করছেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন বন্দরের চার হাজার শ্রমিক-কর্মচারী।

সিবিএ’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফখরুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও নির্বাচন না হওয়ায় শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচনের দাবিতে তারা একাট্টা। নির্বাচন হলে নেতৃত্বের বিকাশ ঘটবে, মনোপলি থাকবে না। শ্রম দপ্তরের নির্দেশনা অনুসারে নির্বাচন করে ফেললে কোনো শ্রম অসন্তোষ থাকবে না। কিন্তু মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দায়িত্ব ধরে রাখতে চাইছে।’

জানা যায়, ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট সিবিএ’র সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন আবুল মনছুর আহমদ ও রাফিউদ্দিন খান। রাফিউদ্দিন খান অবসরে চলে যাওয়ায় তার স্থান পূরণ করেছেন মো. নায়েবুল ইসলাম ফটিক। এ অবস্থায় নির্বাচন আয়োজনের জন্য চট্টগ্রাম বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের পরিচালকের দ্বারস্থ হন ইউনিয়নের সাধারণ সদস্যরা। গত ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের পরিচালক বরাবর চিঠি দেন তারা। নির্বাচনের কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় চট্টগ্রাম বন্দরে সৃষ্ট অসন্তোষের বিষয়টি বিবেচনায় নির্বাচন উপপরিষদ গঠন করে দ্রুত সময়ের মধ্যে গোপন ব্যালটে নির্বাচনের ব্যবস্থা করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।

বিষয়টি আমলে নিয়ে গত ৯ সেপ্টেম্বর মেয়াদোত্তীর্ণ কার্যকরী পরিষদ ও চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান বরাবর চিঠি দেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের পরিচালক মুহাম্মদ নাসির উদ্দিন। চিঠিতে সাধারণ সভা ডেকে ৪৫ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু এরপরও নির্বাচনের কোনো লক্ষণ না দেখে হাইকোর্টে রিট করেন মো. ফখরুল ইসলাম ও মো. আবদুর রহমান সিকদার। নির্বাচন সম্পন্নের জন্য শ্রম দপ্তরকে নির্দেশনা দিয়ে গত ২ ডিসেম্বর আদেশ দেন হাইকোর্ট। ৪৫ দিনের মধ্যে নির্বাচনের জন্য গত ২৬ জানুয়ারি মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিকে দ্বিতীয় চিঠি দেয় শ্রম দপ্তর। ১৯ ফেব্রুয়ারি ৪৫ দিনের সময়সীমা শেষ হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনের কোনো উদ্যোগ না দেখে গত ৬ ফেব্রুয়ারি আবারও শ্রম দপ্তরের পরিচালককে চিঠি দেন ইউনিয়নের সাধারণ সদস্যরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৩ ফেব্রুয়ারি মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিকে তৃতীয় চিঠি দেন শ্রম দপ্তরের পরিচালক। একই চিঠি দেওয়া হয়েছে বন্দর চেয়ারম্যানকেও। ওই চিঠিতে আগামী সাত দিনের মধ্যে আদালতের নির্দেশ প্রতিপালনার্থে বিশেষ সাধারণ সভা ডেকে নির্বাচন উপপরিষদ গঠনসহ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার জন্য বলা হয়েছে। চিঠিতে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে করা রিট পিটিশন নম্বর ১২৪১০/২০১৯-এর ওপর আদালতের ২০১৯ সালের ২ ডিসেম্বর প্রদত্ত আদেশ প্রতিপালনার্থে বিবেচ্য ইউনিয়নের কার্যকরী পরিষদের

নির্বাচন সম্পন্নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার জন্য বন্দর চেয়ারম্যানের প্রতি অনুরোধ করা হয়েছে। এছাড়া ইউনিয়নের বিদ্যমান কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ায় নির্বাচনী কার্যক্রম

ব্যতীত তাদের অন্যান্য সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা না করার জন্যও বন্দর চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করা হয়।

নির্বাচন আয়োজনে আদালত ও শ্রম দপ্তরের নির্দেশনা থাকলেও কোনো উদ্যোগ নেই কেনÑতা জানতে চাইলে মেয়াদোত্তীর্ণ সিবিএ সভাপতি আবুল মনছুর আহমদ বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর তো নির্বাচন চাইছে না। চেয়ারম্যান এখন সিবিএ’র নির্বাচন দেবেন না। আইএসপিএস কোড না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন করবে না। আমরা নির্বাচন করতে প্রস্তুত।’

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের পরিচালক মুহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, ‘মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে কেউ দায়িত্বে থাকতে পারেন না। আমরা শ্রম আইন অনুযায়ী কাজ করছি। আদালতের নির্দেশনা অনুসারে নির্বাচনের জন্য মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিকে চিঠি দিয়েছি। নির্বাচন আয়োজনের জন্য আদালত আমাদের ক্ষমতা দেয়নি।’ এদিকে নির্বাচনের দাবিতে আবদুস সাদেক নান্না, শাহীন রাজু, জাকির হোসেন চৌধুরী, কামরুল ইসলাম, মেহেদী হাসানসহ একটি অংশ বর্তমান মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি থেকে বের হয়ে গেছেন। অন্যদিকে, দেশের বাইরে অবস্থান করছেন ওই কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও প্রভাবশালী নেতা মো. নায়েবুল ইসলাম ফটিক।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..