প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

আধুনিকায়ন ও নতুন ওয়েভিং প্রকল্পে ধীরগতি

শরিফুল ইসলাম পলাশ: রাইট শেয়ার ছেড়ে পুঁজিবাজার থেকে ৯১ কোটি ৭২ লাখ টাকা সংগ্রহ করেছে ডেল্টা স্পিনার্স। রাইটের সিংহভাগ অর্থ ব্যয়ে পুরোনো কারখানার আধুনিয়কায়ন ও নতুন ওয়েভিং ইউনিট স্থাপনের কথা ছিল। কিন্তু অর্থ উত্তোলনের দুই বছরেও কারখানার আধুনিকায়নের কাজ শেষ হয়নি। তবে কোম্পানির পক্ষ থেকে ‘আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে’ দাবি করা হলেও উৎপাদন, আয় ও মুনাফা বাড়েনি। অন্যদিকে বাড়তি অর্থের জোগান না হওয়ায় নতুন ওয়েভিং প্রকল্পের কাজও শেষ হচ্ছে না।

জানা গেছে, ২০১৪ সালের আগস্টে একটি সাধারণ শেয়ারের বিপরীতে দুটি হিসেবে ছয় কোটি ১১ লাখ ৫০ হাজার ৪০০টি রাইট শেয়ার ছেড়ে পুঁজিবাজার থেকে ৯১ কোটি ৭২ লাখ ৫৬ লাখ টাকা সংগ্রহ করেছে বস্ত্র খাতের কোম্পানি ডেল্টা স্পিনার্স। ওই টাকা থেকে ১৭ কোটি ২০ লাখ টাকা ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার কলতাপাড়ায় স্পিনিং কারখানার আধুনিকায়নে ব্যয় করার কথা ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নতুন ওয়েভিং প্রকল্পে ১৮ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর পরিপ্রেক্ষিতে এ ব্যয় কমিয়ে ১৫ কোটি টাকা করা হয়েছে। নতুন ভবন নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি আমদানির জন্যই ওই অর্থ ব্যয় দেখিয়েছে কোম্পানিটি।

প্রসপেক্টাসে প্রদত্ত ঘোষণা অনুযায়ী, ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যেই বস্ত্র খাতের সুতা উৎপাদনকারী কোম্পানিটির কারখানার আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া শেষ করার কথা। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও ওই কাজ শেষ করতে হয়নি। কিছু যন্ত্রপাতি আমদানির প্রক্রিয়ায় ধীরগতির কারণে আধুনিকায়নের কাজ শেষ করতে আরও কয়েক মাস লাগবে বলে কোম্পানির নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে কোম্পানিটির শেয়ার বিভাগ থেকে ‘আধুনিকায়নের কাজ অনেক আগেই শেষ হয়েছে’ বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে কোম্পানির দাবির সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। আধুনিকায়ন শেষ হলে কোম্পানির সুতা উৎপাদন ও কর-পরবর্তী মুনাফা বাড়বে। কিন্তু কোম্পানির সর্বশেষ অর্থবছরে আয় ও কর-পরবর্তী মুনাফা দুই-ই কমেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডেল্টা স্পিনার্সের কোম্পানি সচিব মো. মাসুদুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘বিএসইসির অনুমতি নিয়েই অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের কারও কাছে জবাবদিহি করতে চাই না।’

নতুন ওয়েভিং প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘নতুন খাতে বিনিয়োগের জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির কাছ থেকে অনুমোদন নিতে সময় লেগেছে। কিন্তু এগুলো লেখা যাবে না, নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যাপার। নতুন ওয়েভিং প্রকল্পের কাজ চলছে। আমরা এখনই এসব বিষয়ে কোনো প্রচারণা চাই না।’

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কোম্পানিটির একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, ‘রাইটের অর্থ ব্যয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনায় বিএমআরই করতে দেরি হয়েছে। যে কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অবকাঠামো নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি আমদানি করা যায়নি। তাই কারখানার আধুনিয়কায়ন প্রক্রিয়া শেষ করতে সময় লেগেছে।’

নতুন ওয়েভিং প্রকল্পের বিষয়ে জানা যায়, শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলে ব্যয় বৃদ্ধি, বর্ধিত অর্থের জোগান না হওয়া, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ও যন্ত্রপাতি আমদানি প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে আগামী বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত গড়িয়েছে। এর আগে ব্যবসায় বৈচিত্র্য আনতে রাইটের ৫৫ কোটি ১১ লাখ টাকা ব্যয়ে নতুন স্পিনিং ইউনিট স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নতুন ওয়েভিং প্রকল্প হাতে নেয় কোম্পানিটি। স্পিনিং থেকে ওয়েভিং বেছে নেওয়ার কারণে প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ১০ কোটি টাকা বেড়ে ৬৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। তাই কোম্পানিটির রাইটের অর্থ ব্যয়েও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়। বাড়তি অর্থ জোগাতে স্বল্প মেয়াদে ঋণ নেওয়ার ঘোষণাও দেয় কোম্পানিটি। কয়েক দফায় বাড়িয়ে প্রকল্পের মেয়াদ সর্বশেষ চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত গড়ায়। কিন্তু বাড়তি প্রায় ১৮ কোটি টাকা ব্যাংকঋণ পাওনা নিয়ে নতুন জটিলতার কারণে ওই প্রকল্পটিও আটকে গেছে।

উল্লেখ্য, ১৯৯৪ সালে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটি এর আগে ২০১০ সালে একটি সাধারণ শেয়ারের বিপরীতে একটি রাইট শেয়ার ছেড়ে ১৫ কোটি ২৮ লাখ ৭৬ হাজার টাকা সংগ্রহ করেছিল। ওই অর্থে ডেল্টা সিরামিক নামে সহযোগী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। কিন্তু ওই সহযোগী প্রতিষ্ঠানও ডেল্টা স্পিনার্সের আয়-মুনাফা বাড়াতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেনি।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, আগের অর্থবছরের তুলনায় ডেল্টা স্পিনার্সের কর-পরবর্তী মুনাফা দুই কোটি ৫৩ লাখ টাকা কমে সর্বশেষ অর্থবছরে চার কোটি ৬৮ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। একইভাবে কমেছে শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ২৫ পয়সা ও শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) ৩৯ পয়সা কমেছে। এদিকে চলতি পঞ্জিকা বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানিটির টার্নওভার ২৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর আগের পঞ্জিকা বছরের একই সময়ে কোম্পানিটির টার্নওভার ছিল ৩০ কোটি এক লাখ ১২ হাজার টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির টার্নওভার পাঁচ কোটি ২৫ লাখ ৪৯ হাজার টাকা কমেছে। একইভাবে কর-পরবর্তী মুনাফা কমেছে ৬৯ লাখ দুই হাজার টাকা ও ইপিএস কমেছে পাঁচ পয়সা।