মত-বিশ্লেষণ

আধুনিক নার্সিং সেবার অগ্রদূত ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল

কাজী সালমা সুলতানা: ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল। এক মহীয়সী নারীর নাম, একটি সেবার নাম ও একটি পেশার নাম। পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ জন্ম নেয়, যারা তার কাজের মাধ্যমে নিজ পেশাকে নিজের নামে পরিণত করে ফেলেন। তার আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও মানবিকতাই তাকে কাজের প্রতি একাগ্র করে তোলে। এটি আরোপ করে অর্জন করা যায় না, তার কাজই মানুষের মাঝে পরিচিত করে তোলে তাকে। মৃত্যুর পরও তাকে বাঁচিয়ে রাখে মানুষের মাঝে যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী। তেমনি একটি নাম ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল।

আধুনিক নার্সিং সেবার অগ্রদূত ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল। ১৮২০ সালের ১২ মে তিনি ব্রিটেনের ভিল্লা কলোম্বিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। বাবা উইলিয়াম এডওয়ার্ড নাইটিংগেল এবং মা ফ্রান্সিস নাইটিংগেল ছিলেন বেশ অভিজাত।

ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল যখন জন্মগ্রহণ করেন, তখন অনেক মেয়েই শিক্ষা কী তা ঠিক বুঝত না। সেদিক থেকে ফ্লোরেন্সের ভাগ্য ভালো ছিল, কারণ তার বাবা উইলিয়াম বিশ্বাস করতেন, মেয়েদেরও শিক্ষাগ্রহণ করা উচিত। তিনি ফ্লোরেন্স ও তার বোনকে নানা বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছিলেন। তাদের বিজ্ঞান, গণিত, ইতিহাস ও দর্শন পড়ানো হয়।

আর্তমানুষের প্রতি সেবার মনোভাব ফ্লোরেন্সের ছোটবেলা থেকেই। কেউ অসুস্থ হলে ফ্লোরেন্স ছুটে যেতেন তার সেবা করতে। ১৭ বছর বয়সে তিনি ডার্বিশায়ার থেকে লন্ডনে চলে আসেন। সে সময় লন্ডনের হাসপাতালগুলোর অবস্থা ছিল খুবই করুণ। এর অন্যতম কারণ ছিলÑনার্সিং সেবার দুর্বলতা। সে সময়ে কেউ সেবিকা পেশায় আসতে চাইতেন না। এ পেশাকে তখন খুব ছোট করে দেখা হতো। আর নাইটিংগেল অভিজাত পরিবারে জš§ নিয়েও বেছে নেন সেই পেশা। তিনি জীবনের প্রায় পুরোটাই ব্যয় করেছেন এ পেশায়, মানুষের সেবায়। প্রবল তুষারপাত ও বৃষ্টির মধ্যেও তিনি হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরে বেড়িয়েছেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সেই নাইটিংগেল উপলব্ধি করেন স্রষ্টা তাকে সেবিকা হওয়ার জন্যই পাঠিয়েছেন। এ কাজে নাইটিংগেল আগ্রহ প্রকাশ করলে প্রথমে তার মা-বাবা রাজি হননি। তারা মনে করতেন শিক্ষিত মেয়ে হিসেবে তার অন্য কোনো ভালো পেশায় সম্পৃক্ত হওয়া উচিত। কিন্তু আশা ছাড়েননি ফ্লোরেন্স। অবশেষে বাবা-মায়ের অনুমতি নিয়ে তিনি ১৮৫১ সালে নার্সিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে পাড়ি দেন জার্মানিতে।

ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল ১৮৫৩ থেকে ১৮৫৪ সাল পর্যন্ত লন্ডনের ‘কেয়ার অব সিক জেন্টলওমেন ইনস্টিটিউট’-এর তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করেন। ১৮৫৫ সালে তিনি নার্স প্রশিক্ষণের জন্য তহবিল সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। নিরলস প্রচেষ্টায় ১৮৫৯ সালে তিনি নাইটিংগেল ফান্ডের জন্য সংগ্রহ করেন প্রায় ৪৫ হাজার পাউন্ড। পরবর্তী সময়ে তিনি ভারতবর্ষের গ্রামীণ মানুষের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর গবেষণা চালান, যা ভারতবর্ষে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

ক্রিমিয়ার যুদ্ধে যখন ব্রিটেনে যুদ্ধাহতদের করুণ অবস্থার বিবরণ আসতে থাকে, তখন এটি তার চিন্তার মূল বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ১৮৫৪ সালের ২১ অক্টোবর তিনি তার কাছে প্রশিক্ষিত ৩৮ সেবিকা নিয়ে যান ক্রিমিয়ায়। তার আত্মীয় মেই স্মিথ ও ১৫ ক্যাথোলিক নানসহ হেনরি এডওয়ার্ড ম্যানিংয়ের দিকনির্দেশনায় তিনি অটোম্যান সাম্রাজ্যে যান। তাদের ক্রিমিয়ার ব্লাক্লাভার ব্ল্যাক সি’র ২৯৫ নটিক্যাল মাইল (৫৪৬ কিমি; ৩৩৯ মাইল) এলাকাজুড়ে দায়িত্ব দেয়া হয়। এখানেই ছিল ব্রিটিশদের মূল ঘাঁটি। নাইটিংগেল ১৮৫৪ সালের নভেম্বরের শুরুর দিকে স্কতারির (বর্তমানে ইস্তানবুলে অবস্থিত উসকুডার ´ংশহুফধৎ) সেলিমিয়ে ব্যারাকে উপস্থিত হন। তিনি দেখতে পান, প্রশাসনিক অবহেলার জন্য দায়িত্বের বোঝায় পিষ্ট মেডিকেল টিম যুদ্ধাহতদের ভালো যত্ন নিতে পারছে না। ওষুধের ঘাটতি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, রোগের সংক্রমণ সব মিলে এক প্রাণঘাতী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে সেখানে। রোগীদের খাবার তৈরির বিশেষায়িত ব্যবস্থাও ছিল না সেখানে। ব্রিটেন, রাশিয়া ও ফ্রান্সের মধ্যে দুই বছর ধরে চলা ক্রিমিয়ার যুদ্ধে ৩৮ সেবিকা নিয়ে নিজেকে আহতদের ক্লান্তিহীন সেবা দিয়ে তিনি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এ যুদ্ধে সেবাদানের মাধ্যমে তিনি নার্সিং সেবার বিষয়ে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করেন। যুদ্ধে আহত সৈন্যদের সেবার মাধ্যমে নার্সিংকে তিনি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। এজন্য তাকে ডাকা হতো ‘দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’।

ক্রিমিয়ার যুদ্ধে নাইটিংগেলের সেবার অবদান স্মরণ রাখতে ১৮৫৫ সালের ২৯ নভেম্বর ক্রিমিয়ায় সেবিকাদের প্রশিক্ষণের জন্য গঠন করা নাইটিংগেল ফান্ডে প্রচুর সাহায্য আসতে থাকে। সিডনি হারবার্ট ফান্ডের সচিব ও ডিউক অব ক্যামব্রিজ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান। ১৮৫৬ সালে অটোম্যান সাম্রাজ্যের স্পা বর্ণনা করে নাইটিংগেলের লেখা চিঠিগুলোর জন্য তাকে মেডিকেল ট্যুরিজমের অগ্রদূত মনে করা হয়। এসব চিঠিতে তিনি সেখানকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নানা দিক তুলে ধরেন, যেগুলো সুইজারল্যান্ডের তুলনায় সস্তা ছিল।

ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল ১৮৫৯ সালে ‘নোটস অন নার্সিং’ নামক গ্রন্থ রচনা করেন। বাসগৃহের সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার জন্য লেখা এ গ্রন্থটি নাইটিংগেল স্কুলসহ অন্যান্য নার্সিং স্কুলে পাঠ্যসূচির ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। নাইটিংগেল লেখেন, ‘প্রতিদিন পরিষ্কার থাকার জ্ঞান, অথবা নার্সিংয়ের জ্ঞান, অন্য কথায় কিছু নিয়মাবলি, যা নিয়ে যাবে রোগমুক্ত অবস্থায় অথবা রোগ থেকে মুক্ত করবে, আরও ভালো করবে। এটি সর্বজনীন জ্ঞান, যা সবার জানা থাকা উচিত। এটি চিকিৎসাশাস্ত্র থেকে কিছুটা আলাদা, যেটি নির্দিষ্ট পেশার মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ’।

ইংল্যান্ডের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নয়নে ফ্লোরেন্স বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। ১৮৫৯ সালে তিনি ‘রয়্যাল স্ট্যাটিসটিক্যাল সোসাইটি’র প্রথম সারির সদস্য নির্বাচিত হন। সেন্ট থমাস হাসপাতালে নাইটিংগেল ট্রেনিং স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি নাইটিংগেল ফান্ড থেকে ৮৫ হাজার ফ্রাংক পান। এখানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেবিকারা ১৮৬৫ সালের ১৬ মে থেকে কাজ শুরু করেন। বর্তমানে ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল স্কুল অব নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি লন্ডনের কিংস কলেজের একটি অংশ। ডা. এলিজাবেথ ব্ল্যাকওয়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ১৮৬৭ সালে নিউইয়র্কে তিনি চালু করেন ‘উইমেন্স মেডিকেল কলেজ’।

অসংখ্য পদক আর উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল। ১৮৮৩ সালে রানি ভিক্টোরিয়া তাকে ‘রয়েল রেডক্রস’ পদক প্রদান করেন। প্রথম নারী হিসেবে তিনি ‘অর্ডার অব মেরিট’ খেতাব লাভ করেন ১৯০৭ সালে। ১৯০৮ সালে লাভ করেন লন্ডন নগরীর ‘অনারারি ফ্রিডম’ উপাধি।

১৯১০ সালের ১৩ আগস্ট ৯০ বছর বয়সে লন্ডনে নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল। কর্মজীবনে সেবিকা হিসেবে অনন্য অবদান স্মরণীয় করে রাখতে নাইটিংগেলের নামে ইস্তানবুলে চারটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। লন্ডনের ওয়াটারলু ও ডার্বিতে স্থাপন করা হয় নাইটিংগেলের প্রতিকৃতি। লন্ডনের সেন্ট থোমাস হাসপাতালে রয়েছে ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল মিউজিয়াম। ব্রিটিশ লাইব্রেরি সাউন্ড আর্কাইভে সংরক্ষিত রয়েছে তার কণ্ঠস্বর। সংরক্ষিত এ কণ্ঠস্বরে তিনি বলেছেন, যখন আমি থাকব না, সেই সময় আমার এই কণ্ঠস্বর মানুষকে মনে করিয়ে দেবে আমার মহান কীর্তিগুলো এবং এসব কাজের জন্য উৎসাহ জোগাবে। তাকে নিয়ে ‘দ্য লেডি উইথ দ্য ল্যাম্প’ নামে একটি নাটক মঞ্চায়িত হয় ১৯২৯ সালে। এ নাটকে নামভূমিকায় অভিনয় করেন এডিথ ইভানস। নাইটিংগেলের জীবনের ওপর ভিত্তি করে ১৯১২, ১৯১৫, ১৯৩৬ ও ১৯৫১ সালে মোট চারটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে।

ব্রিটেনে যে পেশার মর্যাদা ছিল কম, যে পেশায় সম্পৃক্ত হতে অনেক সাধারণ পরিবারের মেয়েরাও আগ্রহী হতেন না, সেই অভিজাত ব্রিটিশ পরিবারের মেয়ে ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল এ পেশায় যোগ দিয়েছিলেন। তার আন্তরিকতা ও মানবসেবার মহান ব্রত এ পেশাকে নিয়ে গেছে অনেক উচ্চাসনে। তাই ১৯৭৪ সালের ১২ মে ফ্লোরেন্স নাইটিংগেলের জন্মদিনটি পালন করা হয় ‘আন্তর্জাতিক সেবিকা দিবস’ হিসেবে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের দেশে দেশে ফ্লোরেন্স নাইটিংগেলের নাম উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধাবনত চিত্তে।

গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..