দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উল্লেখযোগ্য কিছু দিক

মো. আরাফাত রহমান: বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বলতে আবর্জনা সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াকরণ, পুনর্ব্যবহার ও নিষ্কাশনের সমন্বিত প্রক্রিয়াকে বোঝায়। এই শব্দটি দিয়ে সাধারণত মানুষের কার্যকলাপে সৃষ্ট অপ্রয়োজনীয় বস্তুসংক্রান্ত কাজগুলোকে বোঝানো হয়ে থাকে। ওই বস্তুগুলো থেকে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ক্ষতিকারক প্রভাব প্রশমিত করার জন্য, কিংবা পরিবেশের সৌন্দর্য রক্ষার কাজগুলোই এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হয়। এছাড়া আবর্জনা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আবর্জনা থেকে পরিবেশের ক্ষতি রোধ করার কাজ এবং আবর্জনা থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য বস্তু আহরণ-সংক্রান্ত কাজও করা হয়ে থাকে। এতে ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি এবং দক্ষতার দ্বারা কঠিন, তরল কিংবা বায়বীয় বর্জ্যসংক্রান্ত কাজ করা হয়।

আবর্জনার উৎস সম্পর্কে আমরা বলতে পারি কল-কারখানা, পুরোনো জলাশয় ও শহরের নর্দমার ড্রেন প্রভৃতি জায়গা আবর্জনার উৎস হিসেবে আমরা ধরতে পারি। বর্তমানে আমরা নিজেদের অসচেতনতার ফলে নানারকম সামাজিক অনুষ্ঠানে নানারকম সামগ্রী নিজেরা সঠিক জায়গায় না ফেলায় সেখান থেকেও কিন্তু অনেক আবর্জনা সৃষ্টি হয়ে চলেছে, যেমন বেঁচে যাওয়া খাবার ও প্লাস্টিকের পাতা আমরা সঠিক জায়গায় ফেলছি না এবং আবর্জনার সৃষ্টি দিনকে দিন বেড়ে চলেছে। ফলে বর্তমানে এই আবর্জনা ও দুর্গন্ধের কারণে সমাজে অনেক রোগ ছড়িয়ে পড়ছে।

উন্নত বা উন্নয়নশীল দেশভেদে, শহর বা গ্রাম্য এলাকাভেদে, আবাসিক বা শিল্প এলাকাভেদে আবর্জনা ব্যবস্থাপনার ধরন আলাদা হয়। সাধারণত স্থানীয় বা পৌর কর্তৃপক্ষ আবাসিক বা প্রাতিষ্ঠানিক এলাকা থেকে উৎপন্ন অবিষাক্ত ময়লার জন্য ব্যবস্থাপনা করে থাকে। অপরপক্ষে বাণিজ্যিক বা শিল্প এলাকার অবিষাক্ত ময়লাগুলো ওই ময়লা উৎপন্নকারীদেরই ব্যবস্থাপনা করতে হয়। আবর্জনার পরম শ্রেণিভেদ বলতে কিছু নেই। নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও প্রয়োজন অনুসারে ভিন্ন ভিন্নভাবে আবর্জনাকে শ্রেণিভেদ করা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ময়লা সংগ্রহের সুবিধার্থে ময়লাকে এভ বে শ্রেণিবিভাগ করা হয় পৌর এলাকার আবর্জনা, বাণিজ্যিক এলাকার আবর্জনা ও শিল্প এলাকার আবর্জনা।

যেখানে শেষ গন্তব্যস্থল হিসেবে ময়লাকে মূলত মাটিচাপা দেওয়া হয়, সেখানে শ্রেণিবিভাগটা এরকম পচনশীল ও অপচনশীল। যে শহরে ময়লা পোড়ানো হয়, সেখানে শ্রেণিবিভাগটা এমন হতে পারে দহনযোগ্য, অদহনীয়, পুনর্ব্যবহারযোগ্য, প্লাস্টিক, পুরোনো কাপড়, খবরের কাগজ, পিইটি-বোতল, কাচের বোতল, ধাতব বস্তু, অতিরিক্ত বড় ময়লা ও ইলেকট্রনিক দ্রব্য। আবর্জনা ব্যবস্থাপনার জন্য এর গাঠনিক ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যগুলো জানা থাকা জরুরি। আবর্জনার গঠন সম্পর্কে জানার জন্য নিন্মলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো জানতে হয় আংশিক অনুপাত বিশ্লেষণ, বর্জ্য-কণার আকার বিশ্লেষণ, বর্জ্যরে জলীয় অংশ ও বর্জ্যরে ঘনত্ব।

আংশিক অনুপাত বিশ্লেষণে যেসব আলাদা রকমের উপাদান একত্রে মিশে আবর্জনা তৈরি হয়েছে সেগুলো চিহ্নিতকরণ এবং সেগুলোর (শতকরা) অনুপাত নির্ণয় করা হয়। এ ধরনের বিশ্লেষণ করার জন্য আবর্জনা ফেলার স্থান থেকে সদ্য ফেলা আবর্জনার নমুনা সংগ্রহ করে সেগুলোকে উপাদান অনুযায়ী ভাগ করা হয় এবং প্রতিটা ভাগের ওজন ও আয়তন পরিমাপ করা হয়। বিশ্লেষণ থেকে লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশের তুলনায় ইউরোপের বর্জ্যে খাবারের আনুপাতিক পরিমাণ কম। এর অর্থ এই নয় যে ইউরোপে খাবার-বর্জ্য কম ফেলা হয়, বরং অন্যান্য বর্জ্য, যেমন কাগজ ও কাগজজাত সামগ্রী, কাচ ও সিরামিক, ধাতব পদার্থ এগুলো এই অঞ্চলের চেয়ে অনেক বেশি ফেলা হয় বলে অনুপাতের হিসাবে খাদ্যজাত পদার্থের পরিমাণ কমে যায়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে অর্থনৈতিক কারণেই এ-জাতীয় পদার্থগুলোর ব্যবহার কম, তাছাড়া বর্জ্য হিসেবে ফেলার বদলে আবার ব্যবহারের জন্য ভাঙ্গারির দোকানে দিয়ে দেওয়া হয় বলেও ময়লা হিসেবে এগুলোকে ডাস্টবিনে তেমন দেখা যায় না। সুতরাং এলাকাভেদে ময়লার আংশিক অনুপাত ভিন্ন হয় এবং স্বাভাবিকভাবেই এই বৈশিষ্ট্যের কারণে ময়লা ফেলা ও ব্যবস্থাপনার লাগসই প্রযুক্তি/উপায় ভিন্ন হবে।

যদি আবর্জনা থেকে যান্ত্রিক উপায়ে বা ছাঁকনির/চালুনির সাহায্যে কিংবা বৈদ্যুতিক চুম্বকের সাহায্যে পুনর্ব্যবহারযোগ্য ময়লা আলাদা করা হয়, তাহলে বর্জ্য-কণার আকার সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন। সাধারণভাবে প্রতি একক ওজনের ময়লায় বড় আকারের তুলনায় ছোট আকারের কণার সংখ্যা বেশি থাকে। বর্জ্যরে জলীয় অংশ বের করার জন্য আংশিক বিশ্লেষণে আলাদা করা আবর্জনার ভাগগুলোকে ওভেনে শুকিয়ে আবার ওজন নেওয়া হয়। তারপর হারানো ওজনকে প্রথমের ওজনের শতকরা অংশ হিসেবে প্রকাশ করা হয়। অর্থাৎ % জলীয় অংশ = ১০০ x (প্রাথমিক ওজন শুকানোর পরের ওজন)/ প্রাথমিক ওজন।

এটা গেল নির্দিষ্ট অংশের/উপাদানের জলীয় অংশ নির্ণয়ের কৌশল। ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় ময়লার উপাদানগুলোর অনুপাত ভিন্ন হলেও আগের হিসাব করা প্রতি ধরনের/উপাদানের উপাত্ত থেকে পরীক্ষা ছাড়াই সামগ্রিক জলীয় অংশ বের করা যায়। এজন্য প্রতিটি উপাদানের জলীয় অংশ থেকে সেটা শুকালে কত ওজন হবে, সেটা বের করা হয়। তারপর সম্পূর্ণ ময়লার শুকানো ওজনকে মোট ওজন দিয়ে ভাগ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ ১০০০ কেজি আবর্জনাকে আংশিক বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, খাবার বর্জ্য ১৫০ কেজি, কাগজ ৪৫০ কেজি, কার্ডবোর্ড ১০০ কেজি, প্লাস্টিক ১০০ কেজি, বাগানের ময়লা ১০০ কেজি, কাঠ ৫০ কেজি, টিনের ক্যান ৫০ কেজি। মোট শুকনা ওজন ৭৯০ কেজি। সুতরাং সামগ্রিক আবর্জনার % জলীয় অংশ = ১০০ x (১০০০  ৭৯০)/১০০০ = ২১%।

আবর্জনা নিষ্কাশনের কার্যদক্ষতা বৃদ্ধি করার জন্য জলীয় অংশের হিসাব থাকাটা জরুরি। যদি ময়লা পোড়ানো হয়, তাহলে সেই ময়লাতে আগুন ধরানোর আগে শুকাতে কতটুকু সময় লাগবে, সেটা হিসাব করা যায় এবং সেই হিসেবে চুল্লিতে ময়লা দেওয়ার সর্বোৎকৃষ্ট হার বের করা যায়। এছাড়া ওই ময়লার তাপ-মূল্য কত, সেটাও আনুমানিক হিসাব করা যায়। ময়লার কিছু অংশ দিয়ে যদি কম্পোস্ট সার বানানো হয়, তাহলেও কম্পোস্ট তৈরির জন্য সর্বোৎকৃষ্ট জলীয় অনুপাত রক্ষার জন্য কতটুকু শুকনা বস্তু মিশাতে হবে, কিংবা কতটুকু পানি মিশাতে হবে, তা হিসাব করে বের করা যায়। এছাড়া বর্জ্যভূমিতে ময়লা ফেলা হলে সেখান থেকে কতটুকু নির্যাস বের হবে, সেটাও অনুমান করা সহজ হয় এবং সেই অনুপাতে বর্জ্যভূমির নিচ থেকে নির্যাস বের করার জন্য পাম্প চালানোর হার নির্ণয় করা যায়।

বর্জ্যরে ঘনত্ব নির্ণয়ের জন্য আংশিক বিশ্লেষণ করা উপাদানগুলোর ওজন নেওয়ার পাশাপাশি এগুলোর আয়তনও মাপা হয়। তারপর ওজনকে আয়তন দিয়ে ভাগ করলেই ঘনত্ব পাওয়া যায়। প্রতিটি উপাদানের ঘনত্ব থেকে আগের উদাহরণের মতো করেই যে কোনো অনুপাতে মেশানো ময়লার ঘনত্ব বের করা সম্ভব। মূলত বর্জ্য পরিবহন এবং নিষ্কাশনের জন্য ময়লার ঘনত্ব জানা খুব দরকার। ময়লা নেওয়ার প্রতিটি গাড়ি নির্দিষ্ট ভারবহন ক্ষমতা থাকে। এছাড়া গাড়িগুলোর আকারের সীমাবদ্ধতাও থাকে। কোনো এলাকায় প্রতিদিন কী পরিমাণ (ওজন হিসেবে) ময়লা উৎপন্ন হয় সেটা জানা থাকলে এবং ময়লার আংশিক বিশ্লেষণ থেকে এর ঘনত্ব জানা থাকলে ওই ময়লা সংগ্রহ করতে নির্দিষ্ট আকারের ও ক্ষমতার কতগুলো ট্রাক লাগবে, সেটা ময়লা ব্যবস্থাপনাকারী সংস্থা নির্ধারণ করতে পারে।

কোনো কোনো জায়গায় ময়লা সংগ্রাহক গাড়ির মধ্যে ময়লাকে চেপে আয়তন কমিয়ে ফেলার যন্ত্র থাকে। সেসব ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট আকারের প্রতিটি গাড়িতে কতটুকু ময়লা আনা হচ্ছে, সেটা ঘনত্বের উপাত্ত থেকেই হিসাব করা হয়। কত টন ময়লা আনা বা নিষ্কাশিত হলো, সে অনুযায়ী ময়লা ব্যবস্থাপনাকারী সংস্থাকে মূল্য পরিশোধ করা হয়ে থাকে। এছাড়া ওই ময়লা ফেলতে বর্জ্যভূমির আয়তন কত বড় হওয়া উচিত বা নির্দিষ্ট আকারের বর্জ্যভূমিতে কতদিন ধরে ময়লা ফেলা যাবে, সেটা নির্ধারণ করতেও ঘনত্বের উপাত্ত থাকা খুব জরুরি। আবর্জনা থেকে বিকল্প উপায়ে শক্তি আহরণ করতে হলে এটার রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য খুব ভালোভাবে জেনে রাখা জরুরি। এই উদ্দেশ্যে যেই রাসায়নিক বিশ্লেষণগুলো করা হয় তা সংক্ষেপে নিন্মরূপ:

এক. প্রক্সিমিটি বিশ্লেষণ: জলীয় অংশ  ১০৫ ডিগ্রি

 সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এক ঘণ্টা রাখলে কতটুকু জলীয় অংশ হারায় সেটা। উদ্বায়ী পদার্থ ৯০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় জ্বালালে অতিরিক্ত যে অংশটুকু হারায় সেটা। ছাই পোড়ানোর পর অবশিষ্ট অংশের পরিমাণ। আটকে থাকা কার্বন। দুই. আল্টিমেট বিশ্লেষণ: কার্বনের শতকরা পরিমাণ, হাইড্রোজেনের শতকরা পরিমাণ, অক্সিজেনের শতকরা পরিমাণ, নাইট্রোজনের শতকরা পরিমাণ, সালফারের শতকরা পরিমাণ, ছাইয়ের পরিমাণ, ছাই বিশ্লেষণ, ছাইয়ের গলন তাপমাত্রা নির্ধারণ, তাপশক্তির পরিমাণ নির্ধারণ। নির্দিষ্ট ওজনের প্রতিটি উপাদান পোড়ালে উৎপন্ন শক্তির পরিমাণ মাপা/নির্ধারণ করা হয়। তিনটি অবস্থায় শক্তি মাপা হয়, সেগুলো হলো যেভাবে ময়লা ফেলা হয় সেভাবে নিয়ে পোড়ালে কী হবে, শুকনা অবস্থায় পোড়ালে কী হবে এবং শুকনা অবস্থায় ছাই বাদ দিয়ে পোড়ালে কী হবে? বিভিন্ন কারণে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কোনো এলাকা থেকে উৎপন্ন ময়লার বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন হতে পারে। পরিবর্তনের কারণগুলোকে সংক্ষেপে নিন্ম লিখিতভাবে লেখা যায়: ক. প্রযুক্তির পরিবর্তনের কারণে, যেমন খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতি পরিবর্তন হলে কিংবা মোড়ক তৈরির প্রক্রিয়া/উপাদান বদল হলে। খ. বিশ্বের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ফলে তেলের দাম খুব বেড়ে গেল, এর বদলে হয়তো কয়লা ব্যবহaত হবে, তখন ময়লায় কয়লার ছাইয়ের পরিমাণ বেড়ে যাবে। একইভাবে অর্থনৈতিক কারণে বিকল্প পদার্থ ব্যবহার ময়লার গড়নকে প্রভাবিত করবে। গ. ময়লা ব্যবস্থাপনায় আবার ব্যবহার করা বা রিসাইকেল করার নিয়ম/সুবিধা শুরু হলে। ঘ. নতুন আইন প্রয়োগের ফলে। ঙ. ঋতুভেদে ময়লার ধরন আলাদা হবে। চ. এলাকার মানুষের আচরণগত/স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন হলে। এছাড়া ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় ভৌগোলিক পার্থক্যের কারণেও ময়লার গড়ন আলাদা হয়। 

ফ্রিল্যান্স লেখক

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..