Print Date & Time : 29 October 2020 Thursday 8:43 am

আনিসের এএসআরকে ২৫০

প্রকাশ: July 19, 2019 সময়- 09:58 pm

ছোটবেলা থেকেই আনিসুর রহমান রোবটপ্রেমী। বড় হতে লাগলেন, রোবট বানানোর শখ বাড়তে থাকল। তবে কীভাবে সেটি তৈরি করতে হবে, তা তো জানেন না। রোবট বানাবেন, আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে আরও শিখবেন ও জানবেন বলে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটিতে (বিইউ) ‘ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বা তড়িত কৌশল’-এ ভর্তি হলেন। নিজেই একটি ‘অটোমেটেড অ্যাঙ্গেল মিটার’ তৈরি করলেন।
যেসব বাড়িতে হোম সোলার সিস্টেম রয়েছে, সেই সোলার প্যানেলের সঙ্গে মিটারটি সংযুক্ত করতে হয়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সূর্য যেদিকে ঘুরবে, সোলার প্যানেলকেও মিটারটি সেদিকে ঘোরায়। মিটারের মাধ্যমে প্যানেলটি পূর্ণ সূর্যশক্তি লাভ করে। এ উদ্ভাবনটি তার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিল। তড়িৎ কৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আলিমুল হক দেখলেন, তার ছাত্র রোবট বানানোর জন্য খুব আগ্রহী। তিনি তাকে রোবট বানানোর জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ দিলেন। ফলে তার মনোবল আরও বেড়ে গেল। চার সংস্করণের মাধ্যমে এ বিশেষ রোবটটি বানানোর পরিকল্পনা করেছেন আনিস।
২০১২ সালের মে মাস থেকে কাজে নেমেছেন। ১১ মাস খাটুনির পর প্রথম পর্যায়ের রোবট তৈরি শেষ হয়েছে। অনেকেই দেখেছেন আর শিক্ষকরাও খুশি হয়েছেন। এখন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগের অধ্যাপক ড. উজ্জ্বল কুমার আচার্যী তার তত্ত্বাবধায়ক। শিক্ষকের দিকনির্দেশনায় আনিস রোবটের দ্বিতীয় ও আরও উন্নত ধাপ তৈরি করছেন। ড. উজ্জ্বলের সহযোগিতায় রোবটটি নিয়ে তার গবেষণাপত্র ‘আমেরিকান জার্নাল অব ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ’-এ ছাপা হয়েছে। নাম ‘ডিজাইন অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন অব এ রোবটিক আর্ম দি অ্যানিমেটর।’ কীভাবে এটি তৈরি করলেন? আনিস বলেন, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বিক্রি করে এমন দোকান থেকে দেশি প্রযুক্তি কিনেছি, বিদেশ থেকেও উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্র আনিয়ে সংযোজন করেছি। এগুলোর মধ্যে স্টেপার মোটর, ইনডাকশন মোটর, গিয়ার মোটর, ব্যাটারি, ডিপিডিটি সুইচ, গিয়ারে ঘূর্ণন গতি বাড়ানোর জন্য টর্ক কনভারশন নীতি, বিয়ারিং, ব্যারো বোর্ড প্রভৃতি রয়েছে। তার মতে, সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা এ প্রযুক্তিগুলো হয়তো ভালোভাবে বুঝবেন না, কিন্তু রোবট ও প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের কাছে এটি পরিচিত। আনিস বলেন, বন্ধুরা এ কাজে আমাকে নানাভাবে সাহায্য করেছে। পুরো রোবটটির মেশিন তিনি ল্যাবরেটরিতে বানিয়েছেন। ইলেকট্রনিকস ল্যাবরেটরিতে সেগুলো নিয়ে গবেষণা করেছেন। সিমুলেশন ল্যাবরেটরিতেও অনেক সময় কাটিয়েছেন। রোবটটির নাম রেখেছেন ‘এসআরকে ২৫০’। সেটির মানে? তিনি বলেন, এসআরকে মানে ‘অ্যানিমেটেড সার্ভিস রোবট’। ২৫০ সংখ্যাটি যোগ করার কারণ? চতুর্থ ধাপে উন্নতির পর এসআরকে ২৫০টি কাজ করতে পারবে।
রোবটটি আট কেজি ৯০০ গ্রাম ওজনের। লম্বায় তিন ফুট তিন ইঞ্চি, বাহু দুটির দৈর্ঘ্য দুই ফুট এক ইঞ্চি করে। বিদ্যুতের চার্জে চলাফেরা ও কাজ করে। দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা চার্জ দিলে আট থেকে ১০ ঘণ্টা কাজ করতে পারে। তিনি বলেন, যে কাজে একে ব্যবহার করা হবে, সেই কাজ অনুসারে এটির পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করা যাবে এটিই এর বিশেষত্ব। এটি কী কী কাজ করে? আনিসের উত্তর, ঘরের নানা জিনিস এক রুম থেকে আরেক রুমে আনা-নেওয়া করতে পারে। রান্নাঘরের খাবার ও খাবারের পাতিল এনে রাখতে পারে। রাঁধুনিকে রান্না শুরুর অ্যালার্ম বাজিয়ে সচেতন করতে পারে। এসি ও টিভি রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে চালু ও বন্ধ করতে পারে। ফ্রিজ খুলতে ও বন্ধ করতে পারে। শুধু তা-ই নয়, এটি দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে সহায়ক হবে। কোথাও ভূমিকম্প হলে দালানকোঠার ভাঙা অংশ সরানোর কাজে একে ব্যবহার করা যাবে। কারখানার ভারী জিনিসপত্র সরানোর কাজেও ব্যবহার করা যাবে।
‘এসআরকে ২৫০’কে এখনই ব্যবহার শুরু করা যেতে পারে বলে আশাবাদী আনিস। বলেন, কোকাকোলার কারখানায় ঘণ্টাপ্রতি ১০ হাজার প্লাস্টিকের বোতল তৈরি করা হয়। সেগুলো আনা-নেওয়ার কাজে জনবলের বদলে এ রোবটটিই যথেষ্ট। এখন তিনি রোবটের উন্নয়ন করছেন। মানবাকৃতির এ রোবটকে চাইলে আরও উন্নত করে অন্য গ্রহেও পাঠানো যাবে। সেটি তখন শিলাখণ্ড ও ভূপৃষ্ঠের ওপরের নানা কিছু তুলে নিয়ে তার সংরক্ষণাগারে রাখতে পারবে। সেগুলো সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জোগাড় করতে পারবে। পূর্ণরূপ পেলে এতে ক্রিস্টাল লেন্সের ক্ষুদ্র ক্যামেরা থাকবে। তখন সে মুহূর্তে চারপাশের ছবি তুলে ফেলবে। রোবট তৈরির পূর্বশর্ত এটি মানুষের ক্ষতি করবে না, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নেবে। এসআরকে-২৫০ তেমনই রোবট, বলেন আনিস।

সোহেল আহসান নিপু