প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার প্রস্তুতি: শেষ মুহূর্তের তাড়াহুড়া

 

জাকারিয়া পলাশ: আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার বাকি আর মাত্র তিন দিন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১ জানুয়ারি মেলার উদ্বোধন করবেন বলে কথা রয়েছে। কিন্তু এখনও প্রস্তুতির বড় অংশ শেষ করতে পারেননি আয়োজকরা। এ নিয়ে গলদঘর্ম অবস্থা মেলার আয়োজক রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি)। এক মাস আগে থেকে প্রস্তুতি চললেও এখনও স্টল বুঝে পাননি অনেকে। ফলে উদ্বোধনের আগেই মেলার সাজসজ্জা সম্পন্ন করা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা। এছাড়া বেশকিছু স্টল এখনও বরাদ্দই হয়নি।

সূত্রমতে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ইপিবি যৌথভাবে প্রতিবছরই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার আয়োজন করে। এ বছর জানুয়ারিতে মাসব্যাপী মেলা চলবে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে। নিয়মানুযায়ী ইপিবি বিভিন্ন দেশি-বিদেশি কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানকে লটারির মাধ্যমে স্টল ও প্যাভিলিয়ন বুকিং দেয়। বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ করা হয় কেন্দ্রীয়ভাবে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার জন্য ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) দায়িত্ব পালন করছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব উদ্যোগে তাদের নামে বরাদ্দ দেওয়া স্টল ও প্যাভিলিয়নগুলো সাজিয়ে থাকে। তবে নিরাপত্তা ও বর্জ্যব্যবস্থাপনাসহ স্যানিটারি ব্যবস্থাপনা করা হয় ইপিবির উদ্যোগে কেন্দ্রীয়ভাবে।

সূত্র জানায়, ২২তম আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা শুরুর মাত্র তিন দিন বাকি থাকলেও এখনও বিদ্যুতের ওয়্যারিংসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি রয়েছে। তবে এরই মধ্যে বিদ্যুতের লাইন দেওয়া হয়েছে প্যাভিলিয়নগুলোতে। মেলা প্রাঙ্গণে কয়েক হাজার লোকের জন্য প্রয়োজনীয় টয়লেট স্থাপনের কাজও পিছিয়ে রয়েছে। গতকাল সরেজমিন দেখা গেছে, ভিআইপি পার্কিং, ফায়ার ব্রিগেডের জন্য নির্ধারিত স্থানও সাজানো হয়নি। মেলা চলাকালে পিডব্লিউডির যেখান থেকে পুরো বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাপনা করবে সেই ঘরটিও পড়ে আছে। সেখানে কয়েকটি লাইট নিয়ে শ্রমিকরা হাজির হলেও কাজ শুরু করতে পারছিলেন না।

এদিকে মেলা আয়োজনসংক্রান্ত শোভায়ন কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গতকাল পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে মাটি ভরাটের কাজ চলছে। ফলে সেসব জায়গায় গাছ লাগিয়ে শোভায়নের ক্ষেত্র তৈরি হয়নি। মেলার নিরাপত্তার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ফাইভ স্ট্রেঞ্জ সিকিউরিটি সার্ভিস নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে নিযুক্ত করেছে ইপিবি। ওই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এইচএমএম সাহেদুল ইসলাম শেয়ার বিজকে জানান, ‘তাদের ৮০ জন নিরাপত্তাকর্মী কাজ করবে মেলার নিরাপত্তায়।’ এছাড়া প্রায় ১২০০ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নিযুক্ত হবে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। তবে মেলার সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক ব্রিফিং করা হয়নি।

মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের স্টল ও প্যাভিলিয়ন নির্মাণে ব্যস্ত সময় পার করছে। এক প্যাভিলিয়নের উদ্যোক্তা সায়েদুল হক শেয়ার বিজকে বলেন, ‘এক মাস আগে মেলা প্রাঙ্গণ সাজানোর কাজ শুরু হলেও কার্যত আমরা এক মাস পাইনি। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্রে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন ছিল। সে জন্য অন্তত চার দিন আমরা কাজ করতে পারিনি। বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ প্রথম দিকে ছিল না। ফলে প্যাভিলিয়নের কাজের জন্য আমাদের বাইরে থেকে পানি বহন করে আনতে হয়েছে।’ মেলার প্যাভিলিয়ন প্রস্তুতির জন্য এক মাস সময় যথেষ্ট নয় বলে তিনি মত দেন।

ইপিবি সূত্রে জানা গেছে, এ বছর গত বছরের চেয়ে বিভিন্ন আকারের ২৮টি স্টল বেশি রাখা হয়েছে মূল পরিকল্পনায়। এর মধ্যে ৬৪টি প্রিমিয়ার প্যাভিলিয়ন (পিপি), ১৭টি জেনারেল প্যাভিলিয়ন (জিপি), ২৮টি ফরেন প্যাভিলিয়ন (এফপি), ৩৭টি প্রিমিয়ার মিনি প্যাভিলিয়ন (পিএমপি), ২৫টি জেনারেল মিনি প্যাভিলিয়ন (জিএমপি), আটটি ফরেন মিনি প্যাভিলিয়ন (এফএমপি), ৭৬টি প্রিমিয়ার স্টল (পিএস), ১৪টি ফরেন প্রিমিয়ার স্টল ও ২৯২টি জেনারেল স্টল রাখা হয়েছে। এছাড়া আটটি রিজার্ভ প্যাভিলিয়ন, ২৪টি খাবারের স্টল ও কয়েকটি রেস্তোরাঁ রাখা হয়েছে। গত বছরের তুলনায় খাবারের স্টলের সংখ্যা ও রেস্তোরাঁ দুটি করে কমানো হয়েছে।

সূত্রমতে, গত বছর ৩৮টি বড় প্যাভিলিয়ন বিদেশিদের জন্য থাকলেও এবার রাখা হয়েছে ২৮টি। তবে বিদেশিদের জন্য ছোট আকারের প্যাভিলিয়নের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। গত বছরে বিদেশিরা দুটি ছোট প্যাভিলিয়ন পেয়েছিলেন, এবার তাদের জন্য আটটি প্যাভিলিয়ন রাখা হয়। তার মধ্যে একটি এখনও বুকিং হয়নি। এদিকে সর্বমোট ৫৯৬টি স্টলের মধ্যে ৫৫৫টি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাকি ৪১টি স্টল কোনো প্রতিষ্ঠান বরাদ্দ পায়নি।

ইপিবি কর্মকর্তারা জানান, এ বছর বাংলাদেশের বাইরে ২০টি দেশ থেকে ৪৮টি স্টল বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৪টি স্টল বরাদ্দ নিয়েছে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান। দ্বিতীয় সর্বাধিক পাঁচটি স্টল বরাদ্দ নিয়েছে পাকিস্তান। এছাড়া ইরান চারটি, নেপাল ও সিঙ্গাপুর তিনটি করে, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়া ও তুরস্ক দুটি করে এবং চীন, ভারত, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, দক্ষিণ কোরিয়া, মরিশাস, জাপান, ভুটান, বাহরাইন, ভিয়েতনাম ও হংকং একটি করে স্টল বরাদ্দ নিয়েছে। এ বছর জার্মানি, ঘানা ও মরোক্কো থেকে কোনো প্রতিষ্ঠান আসেনি, যারা গত বছর ছিল। অন্যদিকে ভিয়েতনাম ও বাহরাইনের দুটি প্রতিষ্ঠান এবারের তালিকায় নতুন যুক্ত হয়েছে।

মেলা প্রাঙ্গণে বিদেশি অংশগ্রহণকারীদেরও দেখা গেছে প্যাভিলিয়নের সাজসজ্জায় ব্যস্ত সময় কাটাতে। অরিজিনাল হংকং ফ্যাশন জুয়েলারির নামে প্রতিষ্ঠানটির স্টলের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘মেলার প্রস্তুতির কাজ ঢের বাকি। এ অবস্থায় কারও সঙ্গে কথা বলারও সময় পাচ্ছি না।’ অপর একটি ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, ‘কাগজে-কলমে আমরা বেশ আগে বরাদ্দ পেলেও কাজ শুরু করতে পারিনি। আমরা প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস পাচ্ছিলাম না। তিন দিনের মধ্যে প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে পারব বলে মনে হয় না।’

এ প্রসঙ্গে ইপিবির উপপরিচালক (অর্থায়ন) মোহাম্মদ রেজাউল করিম শেয়ার বিজকে বলেন, ‘মেলার প্রস্তুতির কাজ কখনওই যথাসময়ে শেষ করা যায় না। মেলা শুরুর পর জমে উঠতেও অন্তত এক সপ্তাহ লাগে। আমরা আশা করছি যথা সময়ে মেলার প্রস্তুতি শেষ হবে। প্রস্তুতিতে বিলম্বের বিষয়ে তিনি বলেন, এর চেয়ে আগে শুরু সম্ভব ছিল না। তাছাড়া প্রস্তুতির কাজ পিছিয়ে নেই।’