মত-বিশ্লেষণ

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বাংলাদেশ

মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম: আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের পদচারণ দিন দিন বাড়ছে, এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। একই সঙ্গে বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়, মানি লন্ডারিং, সন্ত্রাসে অর্থায়ন ও ধ্বংসাত্মক অস্ত্রবিস্তার ঝুঁকি। তাই বর্তমান আন্তর্জাতীয়কৃত বিশ্বব্যবস্থায় শুধু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিষয়ক কমপ্লায়েন্স নীতিমালা দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পন্ন করা মোটেই যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি অর্থনৈতিক অপরাধ (ঋরহধহপরধষ ঈৎরসবং) সংক্রান্ত কমপ্লায়েন্স নীতিমালাও অত্যধিক গুরুত্ব বহন করে। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রধানতম ভূমিকা পালন করে আসছে এদেশের জš§লগ্ন থেকেই। কালের পরিক্রমায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম বছরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল মাত্র ২৩৭ কোটি মার্কিন ডলার, যা বর্তমানে প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মূলত আমদানিনির্ভর। চীন ও ভারতের সঙ্গেই আমদানি বাণিজ্যের সিংহভাগ সংঘটিত হয়। রফতানির পরিমাণ প্রায় ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হলেও বাংলাদেশ এখনও রফতানি বাণিজ্য ঝুঁকিতে রয়েছে। এই ঝুঁকির একমাত্র কারণ শুধু একটি পণ্যের ওপর রফতানি-নির্ভরতা। ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রফতানি বাণিজ্যে ৩২ বিলিয়ন ডলার আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। যদিও বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৭৫০টির মতো পণ্য রফতানি হয় বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে, কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে এসব পণ্যের রফতানির পরিমাণ খুবই কম। একটি পণ্যের ওপর রফতানি-নির্ভরশীলতা থাকায় বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্য ঝুঁকিতে থেকেই যাবে। রফতানি বাণিজ্য সম্প্রসারণে মূল ভূমিকা পালন করে বৈদেশিক বিনিয়োগ। একটি দেশ উৎপাদন ও প্রযুক্তিতে টেকসই
ভিত্তির ওপর তখনই দাঁড়িয়ে যায়, যখন ওই দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ কাক্সিক্ষত মাত্রায় থাকে। বৈদেশিক বিনিয়োগের মাধ্যমে উন্নত প্রযুক্তি আমদানি হয় এবং একটি দেশের জনশক্তি ধীরে ধীরে জনসম্পদে রূপান্তরিত হয়। ধরে নেওয়া হয় একটি দেশের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন ঘটাতে হলে বিনিয়োগের পরিমাণ হবে জিডিপির ৩২ শতাংশ। কিন্তু আমাদের দেশে এই বিনিয়োগ ঘুরপাক খাচ্ছে ২৬ থেকে ২৮ শতাংশের মধ্যে, যার সিংহভাগই হলো সরকারি বিনিয়োগ ও পুনর্বিনিয়োগ। পুনর্বিনিয়োগ হলো বর্তমান বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অর্জিত আয় তাদের দেশে ফেরত না নিয়ে আবার এ দেশে বিনিয়োগ করা। সংগত কারণেই রফতানি বাণিজ্যের সম্প্রসারণে কাক্সিক্ষত মাত্রা পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
আশির দশকে রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড) বাংলাদেশে সূচনা হওয়ার কারণে এ দেশে শিল্পের কিছুটা বিকাশ ঘটে এবং তৈরি পোশাকশিল্প উৎকর্ষ লাভ করে। পাশাপাশি অনেক পশ্চাৎ-সহযোগী (ইধপশধিৎফ ষরহশধমব) শিল্প গড়ে ওঠে, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দেশীয় উদ্যোক্তাদের। রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় যেসব বিনিয়োগ এসেছে, তার বেশিরভাগ দিয়ে তৈরি পোশাকশিল্প গড়ে উঠেছে। অর্থনীতিকে রূপান্তরের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় রূপকল্পের কাছাকাছি নিতে হলে রফতানি বাণিজ্য সম্প্রসারণ সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। তৈরি পোশাক ছাড়াও চামড়াজাত পণ্য ও ওষুধ রফতানির বিশাল সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের। বাংলাদেশের ওষুধশিল্প বর্তমানে অভ্যন্তরীণ বাজার চাহিদা মিটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ পৃথিবীর ৯১টি দেশে রফতানি হচ্ছে। কাঁচামালের সহজপ্রাপ্যতার কারণে চামড়াশিল্পের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে এ দেশে। পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি উন্নতি লাভ করেছে শুধু রফতানি-নির্ভর অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে। সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়া এ ক্ষেত্রে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য প্রকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে। আমদানি বাণিজ্য ও আমদানি-সংক্রান্ত বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক উন্নত দেশের চেয়েও ওপরে অবস্থান করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই সুনাম ধরে রাখতে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অফসাইট সুপারভিশন বিভাগ অনলাইন বৈদেশিক মুদ্রা পর্যবেক্ষণ সেলের মাধ্যমে নিয়মিত তদারক করে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল্য পরিশোধসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা বেচাকেনাকারী ব্যাংকগুলোর সামগ্রিক কর্মকাণ্ড। এতে বিশ্ব বাণিজ্যে বাংলাদেশের সুনাম দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার ফলে পৃথিবীর বৃহত্তম মুদ্রাবাজারের ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আমাদের ব্যাংকিং সম্পর্ক (ঈড়ৎৎবংঢ়ড়হফবহঃ ইধহশরহম জবষধঃরড়হংযরঢ়) বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একটি দেশের সুনাম বৃদ্ধির জন্য ওই দেশের মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে কী ধরনের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি শ্রদ্ধা ও পরিপালন নীতিমালা রয়েছে, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা অর্থনৈতিক অপরাধ-সংক্রান্ত পর্যবেক্ষক হিসেবে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইঋওট) খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে মুদ্রা পাচার (ঞৎধফব ইধংবফ গড়হবু খধঁহফবৎরহম) নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সরকার ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রকদের সতর্ক করে যাচ্ছেন। এরই ফলে একটি নীতিমালা তৈরির কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে, যাতে এই অর্থনীতিবিধ্বংসী তৎপরতা রোধ করা সম্ভব হয়।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ পাচার রোধে দ্রব্যের মূল্য যাচাই একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো শুধু বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর কোনো দেশেই মুল্য যাচাই-সংক্রান্ত স্থায়ী কোনো নীতিমালা এখনও গড়ে ওঠেনি। আর এ সুযোগটাই নিচ্ছে কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীরা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্রমসম্প্রসারণশীল গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সামগ্রিক নীতিমালা তৈরি আজকের বিশ্বব্যবস্থায় অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে, যে নীতিমালায় শুধু বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকবে না, পাশাপাশি এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অপরাধ দমন ও তথ্যপ্রযুক্তির বিষয়ে বিশদভাবে আলোচনা অত্যন্ত জরুরি।

ব্যাংক কর্মকর্তা

সর্বশেষ..