মত-বিশ্লেষণ

আন্তর্জাতিক সিভিল সার্ভেন্টদের হালচাল

কামাল দরবেশ: ‘আন্তর্জাতিক সিভিল সার্ভিস’ ধারণাটির জš§ হয়েছিল এক শতাব্দী আগে। এটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর লিগ অব ন্যাশনস বা জাতিপুঞ্জ গঠিত হওয়ার সময়ের কথা। এর আগে পর্যন্ত সিভিল সার্ভিস ধারণাটির মাধ্যমে কেবল নিজ জাতি, রাষ্ট্র বা সাম্রাজ্যের জন্য সেবা দেওয়াকে বোঝানো হতো। কিন্তু লিগ প্রতিষ্ঠার পর একটি ছোট সচিব পরিষদ গড়ে তোলা হলো। এই পরিষদটি লিগের সদস্য সব রাষ্ট্রকে সেবা দিত। এভাবেই আন্তর্জাতিক সিভিল সার্ভিস ধারণার যাত্রা শুরু হয়েছিল। পরিষদটি তখন বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলার কাজ করত। তারপর চলে আসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্ব। এ যুদ্ধ শেষে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা করা হলো। প্রতিষ্ঠার পরই জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক সিভিল সার্ভিস ধারণায় নিয়ে এলো এক নতুন ধারণা ও তার চর্চাকৌশল। আগের ধারণার চেয়ে এই নতুন ধারণায় ছিল আরও বেশি শক্তিশালী উদ্দীপনা। কিন্তু আজকের দিনে বৈশ্বিক প্রচেষ্টার মধ্যে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন এবং নতুন ডিজিটাল প্রযুক্তি সম্প্রসারণ অনিবার্য হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি উচ্চ মানসম্পন্ন আন্তর্জাতিক সিভিল সার্ভেন্টের প্রয়োজন পড়ছে।

ধারণাটি জাতিসংঘ সনদের ১০০ ধারায় সন্নিবেশিত হয়েছে। ধারায় বলা হয়েছে, ‘সেক্রেটারি জেনারেল ও তার কর্মীরা কোনো সরকারের কাছ থেকে কিংবা এই সংগঠনের বাইরে কোনো কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো নির্দেশনা অনুসন্ধান বা গ্রহণ করবে না, যা তাদের দায়িত্বের কর্মনৈপুণ্য মূল্যায়ন করে।’ তাছাড়া ‘কেবল সংগঠনের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে একজন আন্তর্জাতিক কর্মকর্তা হিসেবে তারা এমন যে কোনো কাজ থেকে বিরত থাকবে, যা তাদের পদের দিকেই ফিরে আসে।’ তাই জাতীয় সরকার ছাড়া আন্তর্জাতিক সিভিল সার্ভেন্ট হিসেবে তাদের অন্য কারও সেবা দেওয়ার কথা নয়। যদিও জাতীয় সরকারগুলো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে সীমার মধ্যে সংজ্ঞায়িত করে, তবুও এই সিভিল সার্ভেন্টরা জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী সংগঠনের কাছেই দায়বদ্ধ থাকে। ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের কর্মীরা এই পর্যায়ে বিবেচিত হন। তারা কেবল তাদের সংগঠনের মাধ্যমেই সারা পৃথিবীর মানুষকে সেবা দেন। আর আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ পাসপোর্ট নিয়ে তারা সারা পৃথিবী ভ্রমণ করেন; অথচ নিজের দেশের নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিতে পারেন না। এই কর্মকর্তাদের বিশেষ কর্মকাণ্ডে বিভিন্ন জাতি-রাষ্ট্রের পারস্পরিক সহযোগিতায় বিশ্ব সুশাসন সম্প্রসারিত হয়। কিন্তু এর মাধ্যমে কোনো ইউটোপীয় কার্যক্রম প্রতিষ্ঠা পায় না। ইউটোপীয় কার্যক্রমে কেবল একটি বিশ্বসরকার প্রতিষ্ঠা পায়। বরঞ্চ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠন ও তাদের সিভিল সার্ভেন্টরা আন্তর্জাতিক সমন্বিত কার্যক্রমকে জোরদার করে। এক্ষেত্রে তারা ‘সাধারণ উপকরণাদি’কে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। কিন্তু কোনোভাবেই তারা বিশেষ কোনো ব্যক্তি বা সরকারের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কাজে অংশ নেয় না। এই নীতিটা ইউএনডিপির সাবেক জেনারেল সেক্রেটারি এবং ড্যাগ হ্যামার্সকজোল্ড ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ব্রুস জেঙ্কস প্রবর্তন করেন। গেইম থিওরি আমাদের শিখিয়েছে, কোনো জাতিরাষ্ট্রসমূহ যখন নিজেদের স্বার্থের দিকেই যৌক্তিকভাবে ধাবমান হয়, তখন তাদের সবার যোগ্যতা যদি হয় মানদণ্ডের নিচে, তবে তা সেখানেই গুটিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে টড স্যান্ডলার তার গ্লোবাল কালেকটিভ অ্যাকশন বইয়ে ২০১৪ সালে যুক্তি আরোপ করেন, নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো একটি কাঠামো দাঁড় করাতে পারে, যা পারস্পরিকভাবে লাভজনক ফলাফল আনতে সহায়ক হয়।

কিন্তু বাস্তবে নিরপেক্ষ ব্যবস্থাপনা সৃষ্টি করা কোনো সহজ কথা নয়। বিভিন্ন দেশের সরকার সব সময়ের জন্যই নিজেদের দেশের জাতীয় স্বার্থকে বিভিন্ন উপায়ে আন্তর্জাতিক সংগঠনের টেবিলে এগিয়ে দিয়ে প্রভাববিস্তার করতে চায়। আর নিজ দেশের জাতীয়তাবাদকে এগিয়ে দিতে বড় বড় আন্তর্জাতিক চাকরি লুফে নিতেও তারা চেষ্টা চালায়। এটাকে তার একটি নির্ভরশীল মাধ্যম বলে মনে করে। আমি যখন ইউএনডিপি’র প্রশাসক হিসেবে কাজ করতাম, তখন আমাকে এমন বহু অনুরোধের মুখোমুখি হতে হয়েছে। অনুরোধগুলো বিভিন্ন দেশের সরকারের প্রতিনিধিদের কাছ থেকেই আসত। তবে সাধারণত তারা একটি বিধিবদ্ধ নিয়ম মেনেই এসব অনুরোধ সামনে আনতেন। এমনকি বিশেষ কোনো ইস্যুর দিকে আমাকে নজর দিতেও বলতেন। যাহোক আমাকে কিন্তু এসব অনুরোধ প্রায়ই রাখতে হতো। এমনকি যে অনুরোধগুলো বিশ্বের পরাশক্তি দেশগুলো থেকে আসত, সে অনুরোধ রাখতেই হতো। বলতেই হবে, এ কাজগুলো জাতিসংঘ সনদের ধারা ১০০-এর স্পষ্ট লঙ্ঘন। তবে আমাকে প্রচুর সময় ব্যয় করতে হতো কেবল সরকারগুলোর এসব অনুরোধ ফিরিয়ে দেওয়া, কিংবা এসব কাজ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার জন্য। এসব সত্ত্বেও আমি যত দিন ইউএনডিপি ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে কাজ করেছি, তত দিনে একটি বিশেষ ধারণা আমার তৈরি হয়েছে। আর তা হলো এ দুটি প্রতিষ্ঠানের কর্মী ও ব্যবস্থাপকেরা ধারা ১০০ মেনে চলতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সক্ষম হন। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি দায়িত্বশীল হতে মনোনিবেশ ও প্রাধান্য দেওয়ার উপায়গুলো ছিল সঠিক ও স্বাভাবিক। তারা আসলেই কারও আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করেন না। উপরন্তু তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক মীমাংসা বা সমঝোতা করার ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী বা সাহায্যকারী হিসেব কাজ করেন। আন্তর্জাতিক সিভিল সার্ভেন্টরা এ রকম যেকোনো পরিস্থিতিতে স্বপ্রণোদিত হয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন এবং ওকালতি বা মধ্যস্থতায় অংশ নিতে পারেন। এক্ষেত্রে আমরা মৃত কফি আনানের কথা স্মরণ করতে পারি। তিনি এ রকম বিভিন্ন রাজনৈতিক সমঝোতা ও মধ্যস্থতার একজন প্রতীক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। তিনি ঘানার মতো একটি ছোট্ট রাষ্ট্র থেকে উঠে এসেছিলেন এবং জাতিসংঘে নিজের ক্যারিয়ার গড়ে নিতে সক্ষম হন। খোলা চোখেই দেখা যায়, আনানের পেছনে অবশ্যই কোনো আন্তর্জাতিক ক্ষমতা কাঠামোর সহায়তা ছিল না। এমনকি সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে তিনি তার নৈতিক কর্তৃত্বকেও প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। আর বিশেষ করে সারা বিশ্বের সুশীল সমাজের নেতাদের কাছে তিনি বিশেষ মর্যাদার আসন পেয়েছিলেন। এই শতকের শুরুতেই আনান সহস্রাব্দ উন্নয়ন অভীষ্ট চালু করার বিশাল উদ্যোগ নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। এতে করে উন্নয়ন সংস্থাগুলো একটি নতুন প্রেরণা লাভ করে। এই অভীষ্ট থেকেই বর্তমানে চলমান টেকসই উন্নয়নে ২০৩০ লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়িত হচ্ছে। সমালোচকেরা যুক্তি আরোপ করেন, আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর এত সব ‘স্বাধীনাতা’ চর্চা করা উচিত নয়। অথচ এই স্বাধীনতা এমন একটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, যার বৈধতা আসে সদস্য রাষ্ট্রের সম্মতিতে এবং সুশাসনের মাধ্যমে। আর আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য কিছু সাংবিধানিক ইউনিট যেহেতু জাতিরাষ্ট্রগুলোর থাকে, তাই এটা সব সময়ই জোটবদ্ধতার দিকে আকৃষ্ট হয়। তাছাড়া বৈশ্বিক সুশাসনের দিকেও তারা বেশ আগ্রহী হয়। সাধারণ কথায় বলতে হয়, এটা তাদের মধ্যে সহযোগিতার একটি সম্পর্ক বা প্রক্রিয়া। কিন্তু এই ধারণাটিকে আমি নিচু বলেই ভাবি। জলবায়ু নিরাপত্তা সংকট ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলোর নমুনা সৃষ্টি করছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও আইএমএফসহ জাতিসংঘের সমগ্র কাঠামোই সুশীল সমাজকে সঙ্গে নিয়ে ঝুঁকি বৃদ্ধির ব্যাপারে বিশ্ব সচেতনতা বাড়ানোর কাজ করছে। একই সঙ্গে তারা বিভিন্ন বিকল্প কার্যাবলির খরচ ও লাভের নিরপেক্ষ কারিগরি বিশ্লেষণ চালিয়ে যাচ্ছে, কিংবা সহায়তা করছে। উপরন্তু জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল এন্টনিয় গুতেরাস এবং তার পূর্বসূরি বান কি-মুন ও আনান জলবায়ু নিরাপত্তার সমর্থনে নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন। এসব প্রচেষ্টা একটি রাজনৈতিক পাটাতন তৈরি করে গেছে, যা আজ বিভিন্ন সরকারের মাঝে জলবায়ু-সম্পর্কিত বিভিন্ন সমঝোতা সৃষ্টি করছে। অন্তত আজকের দিনে এই কাজটি আগের চেয়ে অনেকটা সহজ হয়েছে। জাতীয় কোনো নির্দিষ্ট নীতিনির্ধারণে প্রচেষ্টা চালানো আন্তর্জাতিক সিভিল সার্ভেন্টের কাজ নয়। এমনকি বিশ্ব-উষ্ণতা মোকাবিলার বোঝা কীভাবে বিভিন্ন রাষ্ট্র নিজেদের মাঝে ভাগাভাগি করে নেবে, সে বিষয়েও নাক গলানো তাদের কাজ নয়। বরঞ্চ সাধারণভাব তাদের কাজ হলো বিজ্ঞানভিত্তিক বিভিন্ন অনুষঙ্গ, মানদণ্ড ও উপায়-উপকরণের সহায়তা দান করা, যা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে এবং যদি কোনো সদস্য রাষ্ট্র এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সম্মত হয়, তবে সে রাষ্ট্রের দেওয়া বিজ্ঞানভিত্তিক পরামর্শগুলোকে বাস্তবায়ন করে দেওয়া। এবার ৩০ বছর আগে ফিরে যাওয়া যাক, যখন শান্তি ও সহযোগিতাকে স্থায়িত্ব দেওয়ার জন্য বার্লিন প্রাচীর ধ্বংস করা হয়েছিল, আর নতুন এক বিশ্ব জোটবদ্ধতার ডাক দেওয়া হয়েছিল। আজও আমরা আমাদের কাক্সিক্ষত উদ্দেশ্য থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছি। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক সৃষ্টিতেও একই রকম বাজে অবস্থা। অথচ এগুলোই হলো জাতি-রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক সুশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যাহোক, বর্তমান যুগটিতে রয়েছে এমন সব সুযোগ-সুবিধা যা পৃথিবী আগে কখনও উপভোগ করেনি। তার মধ্যেও রয়েছে রাজনৈতিক সীমানা ও বিভিন্ন সংগঠনকে ছাপিয়ে যাওয়ার মতো সংকট। এ পরিস্থিতিতে সামগ্রিকভাবে সমন্বিত কোনো পদক্ষেপ নিতে গেলে এই আন্তর্জাতিক সিভিল সার্ভেনন্টদের সাহায্য-সহায়তা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়।

তুরস্কের সাবেক অর্থনীতিবিষয়ক মন্ত্রী

ইউএনডিপির সাবেক প্রশাসক ও ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো

প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে

ভাষান্তর: মিজানুর রহমান শেলী

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন
ট্যাগ »

সর্বশেষ..