মত-বিশ্লেষণ

আপন ঘরেই সহিংসতা, বাহির জগতের মানসিকতায় নারীর প্রাধান্য কতটা!

হোসনেয়ারা খাতুন: নারী ও সহিংসতা আজ সমাজের সর্বস্তরে বিস্তার করছে। নারী আজ অবহেলা, লালসা আর  উপহাসেরই নাম। আচ্ছা নারীর নিজ ঘর কোথায়? অনেকের মনে সংশয়। কেউ বলেন মৃত্যুর পর কবরই নারীর আসল ঘর, আসল ঠিকানা। এই বাক্যটা যারা ব্যবহার করেন তারা কিন্তু খুব সুখেই কথাটা বলেননি। এই সমাজে মূল্য না পেয়ে নারী উত্তর দেন তার আসল ঠিকানা কবরস্থান। এবার আসি একটু ভিন্ন আঙ্গিকেÑঅনেকে আবার বলেন, নারীর ঠিকানা বিয়ের আগে পিতার ঘর আর বিয়ের পর স্বামীর ঘর। যদি তাই-ই হয় তাহলে পিতা কেন জন্ম দেয়া নিজের মেয়েকে ধর্ষণ করে বলতে পারেন। আপনা ঘরে হলো না যে নারীর ঠাঁই। স্বামীর বাড়ি জীবনের চার ভাগের তিন ভাগই কাটানোর মনস্থির করে নারী বাবার বাড়ি থেকে পা বাড়িয়ে স্বামীর বাড়ি প্রবেশ করেন। কী মূল্য পান সেখানে? অবহেলা-অনাদার, যৌতুকের নির্যাতন কথায় কথায় সামান্য বিষয় নিয়ে গালিগালাজ, মারধরের নেই অভাব। আপন আপন বলে পরম ভালোবাসায় দাবি করা এই ঘরগুলোর কোনটাতে একজন নারী পেল মর্যাদা? এ তো গেল আপনা ঘর, বাহির জগতটা একটু দেখুন এবার! স্কুলে যাওয়ার পথে ইভটিজিংয়ের স্বীকার বছর পাঁচেক আগে ছিল নিত্যদিনকার ঘটনা। এখন আমরা বেশ উন্নত হয়েছি। শুধু ইভটিজিংয়েই সীমাবদ্ধ নয়, এটা তো খুবই ছোট মানের কাজ! এখন এই সমাজের পুরুষ নামের কিছু কাপুরুষ ছোট্ট শিশুটিকেও ছাড়ে না। এখন তারা বেশ একধাপ এগিয়ে গেছে। ধর্ষণ, খুন, গুম করে ফেলে নির্দ্বিধায়। এছাড়া নারী আজ প্রতিনিয?ত যৌন নির্যাতন, যৌন নীপিড়ন, বাল্যবিবাহ, পারিবারিক সহিংসতা, অ্যাসিড নিক্ষেপ, ধর্ষণের  হুমকি, যৌতুক ইত্যাদি সহিংসতার শিকার হচ্ছে। নারী ও নিরাপত্তা শব্দ দুটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত হলেও আজ সমাজে নারী আছে কিন্তু নিরাপত্তা নেই। নিজ ঘর থেকে শুরু করে অফিস-আদালাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ক্লিনিক, হসপিটাল কোথাও আজ নারী নিরাপদ নেই। অবাক করা বিষয় হলেও সত্য যে শুধু পুরুষ নয়, নারী আজ কিছু নারীর কাছেও নিরাপদ নয়।

নারী সহিংসতার মাত্রা অন্য সব দেশের তুলনায় শীর্ষে অবস্থান করবে। করোনা আমাদের অনেক কিছু শেখালেও নারীর প্রতি সহানুভূতিশীল ও সহনশীল হতে শেখায়নি। করোনার সময়েই সবচেয়ে বেশি নারী সহিংসতার চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে। ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে ২০ হাজার ৭১৩ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

ইউনিসেফের গবেষণায় পাওয়া যায়, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ কিশোরী নির্যাতনে শীর্ষে এবং সারা বিশ্বে সপ্তম স্থানে রয়েছে। প্রতি ঘণ্টায় ১ জন নারী সহিংসতার শিকার হয় এদেশে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ৮৭ শতাংশ নারী কোনো না কোনো সময় পরিবারের কোনো না কোনো সদস্যদের দ্বারা সহিংসতার শিকার হয়েছেন। নারীর প্রতি এত সহিংসতার কারণ তাহলে কি? কোনো মানসিকতা একজন পুরুষের মধ্যে কাজ করে? যার কারণে একজন নারী এভাবে সহিংসতার শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। নারীর প্রতি সহিংসতার প্রধান কারণ হলোÑপুরুষশাসিত এই সমাজে পুরুষতন্ত্র মানেই নারীর প্রতি ক্ষমতা দেখানো। নারীর প্রতি হাজার বছর ধরে এই সমাজ নানা নিয়ম-কানুন আর শর্তের বেড়েজাল দিয়ে রেখেছেন। সেসব নীরবে সহ্য করেই নারী সংসার করে যাচ্ছেন দিব্যি। এটাই তো শান্তি। কিন্তু নারী যখন এই নিয়ম-নীতি আর অসহনীয় শর্ত (বাল্যবিবাহ, যৌতুক, অকথ্য গালাগালি) সহ্য করতে না পেরে প্রতিবাদী হয়ে উঠল, তখন সহিংসতা হতে আর দেরি কি! নীরবে সহ্য করলেই তবে শান্তি এই নীতিতে আমরা বিশ্বাসী। স্বামীর অকথ্য গালিগালাজ, মারধর শেষমেশ তালাকের কলঙ্ক। মেয়েটির নিজ পিতাগৃহ থেকে শুরু করে প্রতিবেশীদের কাছ থেকেও অসহনীয় কথার ছুরি বইতে থাকে তালাকপ্রাপ্ত মেয়েটির ওপর। সইতে না পেরে হয় ঘর ছাড়েন, নয়তো পৃথিবীকে বিদায় জানিয়ে চলে যান চিরদিনের জন্য।

ক. ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে নারীকে পঙ্গু করে ও শিকল পরিয়ে ফেলে এই সমাজ; খ. বিভিন্ন পর্নোসাইট, ভারতীয় সিরিয়াল পরোক্ষভাবে একজন পুরুষের মস্তিষ্কে ধর্ষণের বীজ বপন করছে। মানুষের অবচেতন মন এগুলো গ্রহণ করে তার বাস্তব প্রয়োগে উম্মত্ত হয়ে পড়ে; গ. নারীর পোশাক, সৌন্দর্য আরও নানা বর্ণনা দিয়ে আজ নারীকে ধর্ষণের যৌক্তিক কারণ দাঁড় করিয়ে যাচ্ছেন নোংরা মানসিকতার পুরুষরা। তাহলে বোরখা পরা মেয়েটাও কেন রক্ষা পায় না লালসা থেকে!

ঘুম থেকে উঠেই গরম গরম খাবার প্রস্তুত, ঘর, কাপড় আর নানা কাজ সামলাতে ব্যস্ত যে নারী এই সমাজে সে পায় না কোনো প্রকৃত মূল্য। ঘর থেকে শুরু করে নারী আজ গার্মেন্টস, অফিস-আদালত, হাসপাতাল- ক্লিনিক, বিমান চালানো, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ইত্যাদি কাজে অবদান রাখছে। আর গ্রামে ফসল মৌসুমের সময় নারীর হাড় ভাঙা পরিশ্রম!

যে দেশে আজ নারীরা নিপীড়নের শিকার, এই দেশকে স্বাধীন করার জন্য পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভূমিকা রেখেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী এবং বিএলফের উদ্যোগে প্রায় ৩০০ তরুণীকে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। তারামন বিবি ১১নং সেক্টরে, কাঁকন বিবি ৫নং সেক্টরে সম্মুখ যুদ্ধ করেন এবং ছদ্মবেশে গুপ্তচরবৃত্তি করে তথ্য সরবরাহ করতেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় ৪ লাখ ৬০ হাজার নারী ধর্ষণের শিকার হন। এই দেশের জন্য জীবন বিলিয়েও নারী কেন আজও নির্যাতনের শিকার! নির্যাতনকারীর ও সাধারণ জনগণের মনে কি একবার এই ভাবান্তর আসে না?

নারীর প্রতি সহিংসতা দূরীকরণের কিছু উপায় হলোÑআইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। নারীর ক্ষমতায়ন ও তার যথোপযুক্ত ব্যবহার করতে হবে। নারীর প্রতি সহানুভূতিশীল ও সহনশীল হতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে হবে। ইসলাম ধর্মে নারীকে সর্বোচ্চ সম্মান দেয়া হয়েছে। পরকাল ভীতিই পারে নারীর প্রতি সহিংসতার মনোভাব দূর করতে।

সমাজকর্মী ও রাজনীতিকদের সমন্বিতভাবে নারী সহিংসতা দূরীকরণের কাজ করতে হবে। অন্যায় ও ন্যায়ের ভেদাভেদ শিক্ষা পরিবার থেকে জোরদার করতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থায়ও আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। ভারতীয় সিরিয়াল ও পর্নোসাইটগুলো বন্ধ করতে হবে। নীতি শিক্ষার চর্চা করতে হবে।

কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার পঙ্ক্তি না বললেই নয়Ñকোনো কালে একা হয়নিকো জয়ী পুরুষের তরবারি, প্রেরণা দিয়েছে, শক্তি দিয়েছে, বিজয়ী লক্ষ্মী নারী। এই লক্ষ্মী নারীর প্রতি ঘৃণ্য কামুকতার দৃষ্টি, নানা অনিয়ম, অন্যায় ভেঙে সম্প্রীতির মনোভাব নিয়ে সবাই একসঙ্গে একে অন্যের সহযোগী হয়ে নারীর প্রতি সহিংসতার মানসিকা দূর করে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে হবে। এখনই সচেতন হওয়ার সময়। না হলে ব্যক্তি, তথা সমাজ-দেশ মুখ থুবড়ে পড়বে। পিতাগৃহ থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরে নারীকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব আমাদেরই। নিজ ঘরেই (পিতাগৃহ, স্বামীগৃহ, ভাই, চাচা) যদি নারী নির্যাতিত হয় তাহলে নারীর মূল্য আর থাকে না বাহ্যিক জগতের মানুষের কাছে। তাই নারীর প্রতি সহিংসতা শিকড় উপড়ে ফেলতে পরিবার থেকে সমাজ, রাষ্ট্র সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন ও কঠোর হতে হবে।

শিক্ষার্থী

ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..