দিনের খবর প্রথম পাতা

আবরার হত্যাকাণ্ডে জাতিসংঘ ও যুক্তরাজ্যের নিন্দা

নিজস্ব প্রতিবেদক: বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার নির্মম ঘটনার নিন্দা জানিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ ও যুক্তরাজ্য। গতকাল আলাদা বিবৃতিতে এ হত্যাকাণ্ডের নিন্দার পাশাপাশি বিচার প্রক্রিয়ায় অবাধ ও সুষ্ঠু তদন্তের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘মুক্তভাবে নিজের মতপ্রকাশের জন্য বুয়েটের তরুণ ছাত্রকে খুন করার নিন্দা জানায় জাতিসংঘ। বাংলাদেশে শিক্ষাঙ্গনে চলমান বহু বছরের সহিংসতায় অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন, যেসব ঘটনায় দায়ীদের দৃশ্যত দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। সন্দেহভাজন হত্যাকারীদের গ্রেফতারে কর্তৃপক্ষের নেওয়া উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে সংস্থাটি স্বাধীন তদন্তের ওপর জোর দিয়েছে, যার ফলে ‘সুষ্ঠু প্রক্রিয়ায় বিচার’ এবং ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত হবে।
এদিকে বুয়েট হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ‘শোক’ ও ‘দুঃখ প্রকাশ’ করে ফেসবুক পোস্টে ব্রিটিশ হাইকমিশন বলেছে, ‘মুক্তবাক, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের পক্ষে যুক্তরাজ্যের নিঃশর্ত অবস্থান রয়েছে।’
উল্লেখ্য, গতকাল রোববার গভীর রাতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শেরে বাংলা হলের সিঁড়ি থেকে তড়িৎ কৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরারের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ফেসবুকে মন্তব্যের সূত্র ধরে শিবির সন্দেহে আবরারকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে বুয়েট ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা তাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ওই ঘটনায় বুয়েট ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেলসহ ১০ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তারাসহ মোট ১৯ জনের নামে চকবাজার থানায় মামলা করেছেন আবরারের বাবা।
এদিকে আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে বুয়েট শিক্ষার্থীদের আন্দোলন গড়িয়েছে তৃতীয় দিনে। আগের দিনের মতোই বুধবার সকাল থেকে বুয়েটের শহীদ মিনার চত্বরে শিক্ষার্থীরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। সেখানে এক সংবাদ সম্মেলন থেকে তুলে ধরা হয়েছে নতুন ১০ দফা দাবি।
১১ অক্টোবরের মধ্যে শেরে বাংলা হলের প্রভোস্টকে প্রত্যাহার, আবরারের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, জড়িতদের বুয়েট থেকে আজীবন বহিষ্কারের পুরোনো দাবির সঙ্গে অবিলম্বে আবরার হত্যা মামলার চার্জশিট প্রকাশ এবং ১৫ অক্টোবরের মধ্যে বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করার দাবি জানাচ্ছেন তারা।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে তিনজন এসব দাবি সাংবাদিকদের সামনে পড়ে শোনান। তাদের একজন প্রতিনিধি বলেন, ‘বেঁধে দেওয়া সময়ে দাবি পূরণ না করা হলে ১৪ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষাসহ সব একাডেমিক কার্যক্রম স্থগিত রাখতে হবে।’
১০ দফা দাবি হলো- ১. আবরার ফাহাদের খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, সিসিটিভি ফুটেজ ও জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুসারে শনাক্ত খুনিদের প্রত্যেকের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে; ২. সিসিটিভি ফুটেজ থেকে জড়িতদের শনাক্ত করে শুক্রবার বিকাল ৫টার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আজীবন বহিষ্কার করতে হবে; ৩. মামলার সব খরচ এবং আবরারের পরিবারের ক্ষতিপূরণ বুয়েট প্রশাসনকে বহন করতে হবে। শুক্রবার বিকাল ৫টার মধ্যে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক নোটিস জারি করতে হবে; ৪. দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্বল্পতম সময়ে আবরার হত্যা মামলার নিষ্পত্তি করার জন্য বুয়েট প্রশাসনকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। বুয়েট প্রশাসনকে সক্রিয় থেকে সব প্রক্রিয়া নিয়ামমতো পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং নিয়মিত ছাত্রদের তথ্য দিতে হবে; ৫. আবরার হত্যা মামলার অভিযোগপত্রের কপি অবিলম্বে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করতে হবে; ৬. বুয়েটে ‘সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতি’ নিষিদ্ধ করতে হবে। রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে দীর্ঘদিন ধরে বুয়েটে হলে হলে ‘ত্রাসের রাজনীতি’ কায়েম করে রাখা হয়েছে। জুনিয়র ব্যাচকে সব সময় ভয়ভীতি দেখিয়ে জোর করে রাজনৈতিক মিছিল-মিটিংয়ে যুক্ত করা হয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে যে কোনো সময় যে কোনো হল থেকে সাধারণ ছাত্রদের হল থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে হলে হলে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। এহেন কর্মকাণ্ডে সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা ক্ষুব্ধ। তাই ১৫ অক্টোবরের মধ্যে বুয়েটে সব রাজনৈতিক সংগঠন এবং এর কার্যক্রম স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে; ৭. বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কেন ৩০ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পরও ঘটনাস্থলে যাননি এবং ৩৮ ঘণ্টা পর উপস্থিত হয়ে কেন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিরূপ আচরণ করেছেন, কেন তিনি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে স্থান ত্যাগ করেছেন এসব বিষয়ে তাকে ক্যাম্পাসে এসে বুধবার দুপুর ২টার মধ্যে জবাবদিহি করতে হবে; ৮. আবাসিক হলগুলোয় র‌্যাগের নামে এবং ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর সব ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধ করতে হবে এবং এ ধরনের সন্ত্রাসে জড়িত সবার ছাত্রত্ব বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে আহসানউল্লাহ হল ও সোহরাওয়ার্দী হলের পূর্বের ঘটনাগুলোয় জড়িতদের ছাত্রত্ব বাতিল করতে হবে ১১ অক্টোবর বিকাল ৫টার মধ্যে; ৯. আগে ঘটা এ ধরনের নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশসহ পরবর্তী সময়ে তথ্য প্রকাশের জন্য একটি কমন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কোনো ওয়েবসাইট বা ফর্ম থাকতে হবে এবং নিয়মিত প্রকাশিত ঘটনা রিভিউ করে দ্রুততম সময়ে বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। সেই প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বুয়েটের বিআইআইএস অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে হবে। ১১ অক্টোবর বিকাল ৫টার মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রদর্শন করতে হবে এবং পরবর্তী এক মাসের মধ্যে কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু করতে হবে। নিরাপত্তার স্বার্থে সবগুলো হলের প্রত্যেক ফ্লোরের সবগুলো উইংয়ের দু’পাশে সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবস্থা করতে হবে; ১০. রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে আবাসিক হল থেকে ছাত্র উৎখাতের ব্যাপারে নীরব থাকা এবং ছাত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হওয়ায় শেরে বাংলা হলের প্রভোস্টকে ১১ অক্টোবর বিকাল ৫টার মধ্যে প্রত্যাহার করতে হবে।

 

সর্বশেষ..