মত-বিশ্লেষণ

আবরার হত্যার দায় আমাদের সবার

মোশারফ হোসেন: অফিসে দুটি পত্রিকা রাখি বাংলা ও ইংরেজি। অবশ্য ব্যস্ততার কারণে অফিস সময়ে প্রথম পাতার শিরোনামের বাইরে আর কোনো সংবাদ পড়তে পারি না। আমার বসার কক্ষে একটি টিভি আছে। সেটিও চালু করা হয় কালেভদ্রে। অফিস সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও ব্যবহার করি না। গত সোমবার (৭ অক্টোবর) শাখায় ছিল প্রধান কার্যালয় কর্তৃক তিন দিনব্যাপী নিয়মিত অভ্যন্তরীণ পরিদর্শনের শেষ দিন। তাই আবরার হত্যার মতো আলোচিত ও অনভিপ্রেত ঘটনা আমার কানে পৌঁছায়নি এবং দৃষ্টিতেও আসেনি। রাত সাড়ে ৮টায় পরিদর্শন দলের বিদায় শেষে নিজ কক্ষে বসেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢু মারতে ইচ্ছে করল। কিন্তু ফেসবুক চালু করতেই নজরে আসে আমার ফেসবুক ফ্রেন্ডদের নানা প্রতিবাদী পোস্ট। যেমন, ‘আবরার হত্যার বিচার চাই’, ‘আমরা লজ্জিত’, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস ফর আবরার’ প্রভৃতি। কিন্তু তখনও বুঝতে পারিনি, কে এই আবরার, কে তাকে খুন করেছে, কেন খুন করেছে, কীভাবে খুন করেছে। ফেসবুক গুটিয়ে ক্লান্তি নিয়ে বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে আবারও মোবাইল ফোন নিয়ে ফেসবুকে ঢুকতেই দেখি, আবরারে আবরারে সয়লাব হয়ে গেছে ফেসবুক! জানতে পারলাম, আবরার দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের মেধাবী ছাত্র। দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রত্নসম একজন ছাত্রের নির্মম হত্যায় বুকের ব্যথাটা বাড়তে থাকল। এই আবরার কোনো এক বাবার কোনো সাধারণ সন্তান নয়। আবরার মানেই সেরাদের সেরা, আবরার মানেই বুয়েট, আবরার মানেই বাংলাদেশ। আজ যে বাড়ন্ত আবরারকে মেরে ফেলা হলো, সে আপনার-আমার সন্তান চাইলেই কি হতে পারবে? ব্যথাতুর বুকে অনলাইন পোর্টাল থেকে জানলাম, বাংলাদেশের একটি বড় রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠনের কিছুসংখ্যক ধরাকে সরাজ্ঞান করা ছাত্রনেতা নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে মেধাবী আবরারকে।
কোনো আঘাত যতক্ষণ পর্যন্ত না আমাদের নিজের গায়ে লাগে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা ব্যথা অনুভব করি না। নিজের গা আগুনে না পুড়লে জ্বালা অনুভব করি না। ঠিক একই কারণে আবরার হত্যার খবরটিও নিশ্চয়ই আমাদের অনেককে আলোড়িত করেনি। কারণ, আমরা স্বার্থপর। আপনে বাঁচলে বাপের নাম এটাই আমাদের নীতি-আদর্শ। আমরা নিজেরা পেট পুরে খেতে পারলেই সন্তুষ্ট, আমার পরেরজন খেতে পাবে কি পাবে নাÑসেদিকে আমাদের ভ্রুক্ষেপ নেই। কে বিপদে পড়ল, কে মরল তাতে আমার যেন কিচ্ছুটি যায় আসে না। আমি তো নিরাপদে আছি, বেঁচে আছি এটাই যথেষ্ট! এসব লেজগুটানো স্বার্থপর আর আত্মকেন্দ্রিক চিন্তার কারণেই আমাদের চোখের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করা হয়েছে বিশ্বজিৎকে। পুলিশি প্রহরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হাতুড়িপেটা করা হয় কোটা আন্দোলনের সমর্থক সাধারণ ছাত্রদের। একই ধারাবাহিকতায় আমাদের নির্লজ্জ চোখ, নির্লিপ্ত হাত আর নির্বাক কণ্ঠের সামনে রিফাতকেও কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। আমরা প্রত্যক্ষদর্শীরা কোনো প্রতিবাদ করিনি, বরং কে কার আগে ভিডিও করে নিজের ফেসবুকে আপলোড দিয়ে লাইক-শেয়ারের সংখ্যা বাড়াতে পারি, সে প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত ছিলাম। আমরা আমাদের নিজের আখের গোছানোয় ব্যস্ত, তাই এ ফাঁকে হায়েনা-শকুনেরা আমাদের সামনে বা পাশেই ছিঁড়ে খায় আবরারের মতো আমাদেরই আরেক ভাইকে। আমরা পাশ কাটিয়ে যাই, কিছু দেখেও না দেখার ভান করে দৌড়ে নিরাপদ স্থানে নিজেকে লুকাই। কিন্তু দুদিন পর এই হায়েনা-শকুনদের গোগ্রাস আমাকেও যে ছিঁড়ে খাবে না এ নিশ্চয়তা কি আমি দিতে পারি?
আর্থিক বিচারে রাজনীতি কোনো লাভজনক পেশা নয়। তাহলে অলাভজনক পেশা হওয়া সত্ত্বেও ক্যাসিনো সম্রাটদের অন্য কোনো আয়ের উৎস না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে দিনের পর দিন আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে সেটা দেখা কি তার রাজনৈতিক দলের নেতাদের কারও দায়িত্ব ছিল না? কোনো স্বার্থ যদি না-ই থাকে, তাহলে অলাভজনক রাজনীতির সংগঠনের সঙ্গে ছাত্ররাই-বা জড়িত কেন? কেউ বলতে পারেন, ছাত্ররা সমাজ পরিবর্তনের অন্যতম নিয়ামক, তাই রাজনীতিতেও তাদের প্রয়োজন আছে। আমিও মানলাম। তবে তারা কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যানারে না থেকে নিরপেক্ষ সংগঠন বা শক্তি হিসেবে সমাজ পরিবর্তন করুক না, কেউ মানা করছে না। কারণ, ইতিহাস বলে, রাজনৈতিক দলের পক্ষপাতদুষ্ট আমাদের ছাত্রসংগঠনগুলোর নিরপেক্ষতার কোনো নজির নেই। আর তাই সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনের কাউকে কখনও সরকারের কারও কুকর্মের বিরুদ্ধে সমালোচনা বা প্রতিবাদ করতে দেখা যায় না। একইভাবে বিরোধী দলের আশ্রয়পুষ্ট ছাত্ররাও শুধু সরকারের দোষটাই দেখতে পায়। তাই এই ছাত্ররাজনীতি অলাভের রাজনীতি নয়, মানুষের কল্যাণের রাজনীতি নয়, মঙ্গলের রাজনীতি নয়। বন্ধ হোক সব ধরনের ছাত্ররাজনীতি। বেঁচে যাক শত শত আবরারের প্রাণ।
সন্তান তার বাবার পরিচয়ে পরিচিত হবে এটাই নিয়ম। তবে সুযোগ্য সন্তান অনেক সময় তার বাবারও পরিচয় হয়ে ওঠেন। সুপ্রতিষ্ঠিত বা গুণধর সন্তানের বাবাকে মানুষ তার (বাবার) নিজ নামে না ডেকে বরং ‘অমুকের বাপ’ বলেই সম্বোধন করতে দেখা যায়। এতে বাবা নাখোশ হন না, বরং গর্বে তার বুক ভরে যায়। তাই সন্তানের সুকর্মের কৃতিত্ব সন্তানের পাশাপাশি তার বাবাও নিতে চান। আর তাই বাবাদের তাদের সন্তানকে বলতে শোনা যায়, ‘বাপকা বেটা’! কিন্তু সেই সন্তানই যখন কোনো অন্যায় করে, তখন সেই বাপই তাকে ‘অমানুষের বাচ্চা’ বলে গালি দেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তার সন্তানের কুকর্ম সমাজে জানাজানি হয় এবং সমাজ কর্তৃক ভর্ৎসনা করা হয়। ভাল’র স্তুতি আর মন্দের লোক দেখানো ভর্ৎসনাÑএটা যেন আমাদের প্রকৃতি ও মজ্জাগত স্বভাব। আমাদের দেশের রাজনীতিতেও তেমনই সংস্কৃতি চালু আছে। আমরা যখন কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের কোনো নেতা বা কর্মীকে কোনো কুকর্ম করতে দেখি, তখন তার দায়ভার রাজনৈতিক সংগঠনটি একবাক্যে অস্বীকার করে। তাদের বলতে শুনি, ‘আমি অমুককে চিনি না’ বা ‘অমুক আমাদের দলের বা সংগঠনের কেউ না’। বরং ফেসবুকে ওইসব দুষ্কৃতকারীকে এক রাজনৈতিক দল অন্য রাজনৈতিক দলের কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে নিজেদের দায়মুক্ত করতে দেখা যায়।
কিন্তু কথা হচ্ছে, বাবা সন্তানের সুকর্মের কৃতিত্ব নিলে সন্তানের কুকর্মের দায়ও নিতে হবে। আপনার সন্তানকে সুপথে পরিচালিত করে সুনাগরিক আর সুমানুষ হিসেবে গড়ে তোলা আপনার দায়িত্ব। তার মাঝে কোনো অন্যায় বা কোনো কুকর্ম দেখলে তা প্রতিহত করা, তাকে শাসন করা, না পারলে আইনের কাছে সোপর্দ করা বাবা হিসেবে, অভিভাবক হিসেবে আপনার দায়িত্ব। কিন্তু কজন বাবাকে আমরা দেখেছি তার ধর্ষক ছেলেকে অস্বীকার করতে, কজন বাবা তার সন্ত্রাসী-খুনি ছেলেকে পুলিশে সোপর্দ করেছেন? বিশ্বজিতের খুনিদের বাবাদের কেউ কি তাদের খুনি সন্তানের অপরাধ স্বীকার করে সেই সন্তানের ফাঁসি চেয়েছেন? না, বরং খুনি সন্তানকে বাঁচাতে সর্বোচ্চ চেষ্টাটি করেছেন। চাক্ষুষ প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও প্রধান প্রধান আসামিদের বাদ দিয়েই তৈরি করা হয় মামলার এজাহার-চার্জশিট। আজ আবরারের খুনিদের কোনো বাবা-মা কিংবা ভাই-বোন কি মিডিয়ায় এসে বলেছেন যে, খুনিদের একজন আমার সন্তান বা ভাই, আমি তার উপযুক্ত শাস্তি চাই। আমরাইবা কজন রাস্তায় ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ করেছি? প্রকাশ্য দিবালোকে সন্ত্রাসী হামলায় আক্রান্ত কাউকে কি উদ্ধারে ঝাঁপিয়ে পড়েছি?
এভাবে বাবার কাছে সন্তান আশকারা পাচ্ছে, সরকারের কাছে এমপি-মন্ত্রীরা আশকারা পাচ্ছেন, পুলিশের কাছে সন্ত্রাসীরা আশকারা পাচ্ছে, রাজনৈতিক দলের কাছে নেতাকর্মীরা আশকারা পাচ্ছেন, দর্শক সেজে থাকা এই আমাদের কাছে সমাজ আশকারা পাচ্ছে। আর এভাবেই দিনে দিনে আশকারা পাওয়ারা নিজেদের রাজাধিরাজ মনে করছে। নিজেকে যা খুশি, তা-ই করার লাইসেন্সপ্রাপ্ত মনে করছে। তাই যাকে খুশি তাকে ধরছে, মারছে, কোপাচ্ছে, প্রতিপক্ষ বা ভিন্নমতের হলে ওপারে পাঠিয়ে দিচ্ছে। তাই আবরার হত্যার দায় ছাত্রলীগের নয়, বুয়েট প্রশাসনের নয়, সরকারের নয়, আওয়ামী লীগেরও নয়। আমাদের অন্ধ চোখ, বধির কর্ণ, নির্বাক কণ্ঠ, ঝিমধরা হস্ত, বেঁকে যাওয়া মেরুদণ্ড, পঙ্গু পা এবং মরে যাওয়া বিবেকের আশকারা আর মদতে বেড়ে ওঠা অপরাধীদের দ্বারা আবরার হত্যার দায় আপনার, আমার, আমাদের সবার।

ব্যাংক কর্মকর্তা

[email protected]

ট্যাগ »

সর্বশেষ..