এবারের আলু মৌসুমে আবারও বিপর্যয়ে পড়েছেন রাজশাহী জেলার তানোর উপজেলার আলুচাষিরা। দুর্ভাগ্য যেন তাদের পিছু ছাড়ছে না। চালুচাষে লাভ তো দূরের কথা, আবাদের খরচই উঠছে না। উল্টো চাষিদের পরবর্তী চাষের জন্য দ্বিগুণ দামে রাসায়নিক সার লাইনে দাঁড়িয়ে কিনতে হয়েছে।
দৈনিক শেয়ার বিজে রাজশাহী প্রতিনিধির পাঠানো সংবাদে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান আলু উৎপাদনকারী অঞ্চল রাজশাহীতে নতুন মৌসুমের আলু বাজারে উঠতে না উঠতেই পুরোনো আলুর বাজার ধসে পড়েছে। হিমাগার পর্যায়ে পুরোনো আলুর দাম গত এক সপ্তাহে কেজিতে ৮-১০ টাকা কমে ১১ টাকায় নেমেছে।
রাজশাহী বরেন্দ ভূমির উর্বর জমিতে আলু চাষের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। সত্তরের দশক থেকেই এ অঞ্চল আলু উৎপাদনে শীর্ষস্থানীয়। ২০২৪-২৫ মৌসুমে রাজশাহী জেলায় ৩৮ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১০ লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, জেলার বার্ষিক আলুর চাহিদা মাত্র ১ লাখ ১৩ হাজার টন। অর্থাৎ উৎপাদন চাহিদার ৯ গুণের বেশি। এ কারণে প্রতি বছরই দামের ওঠানামা হয়।
শুধু তাই নয়, রাজশাহীর মতো একই চিত্র মুন্সীগঞ্জ, বগুড়া, রংপুর, পঞ্চগড়সহ অন্যান্য আলু উৎপাদনকারী জেলায়। মুন্সীগঞ্জে হিমাগারে পুরোনো আলুর দাম নেমেছে ১০-১২ টাকায়। বগুড়ায়ও একই অবস্থা। কৃষকদের ভাষ্য, দেশে আলুর উৎপাদন বেশি হলেও রপ্তানি বা প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প না থাকায় প্রতি বছর এই সংকট দেখা দেয়। সরকার মৌখিকভাবে ২২ টাকা দরে আলু কেনার কথা বলেছিল। কিন্তু কোনো লিখিত নির্দেশনা আসেনি। বাজারে যেসব নতুন আলু এসেছে, কোনো কোনো এলাকায় সেগুলো এখনো পরিপক্ব হয়নি। চাষিরা বেশি দামের লোভে আগেভাগে তুলে বাজারে নিয়ে আসছেন। এ কারণেও পুরোনো আলুর চাহিদা কমে গেছে। দেশে প্রায় ৪০০টি হিমাগারে এখনো লাখ লাখ টন পুরোনো আলু মজুত আছে। সরকার যদি ঘোষিত দামে না কেনে, তাহলে কৃষক ও হিমাগার মালিক উভয়ই বড় লোকসানে পড়বে।
বিশ্বের অনেক দেশ কৃষিপণ্য রপ্তানির লক্ষ্যে চাহিদার অতিরিক্ত উৎপাদন করে। ওই সব দেশ বিশ্বের রপ্তানি বাজারে পণ্যগুলো রপ্তানি করে। দেশে গতবার অতিরিক্ত আলু উৎপাদিত হয়। এই হিসাব সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে ছিল। প্রশ্ন হলোÑতাহলে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো কী করল? অতিরিক্ত উৎপাদনের খবর জানার পরও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলো না কেন? কেন আন্তর্জাতিক বাজারে আলুর চাহিদা অনুসন্ধান করা হলো না। তবে কি সরকারের দাম নির্ধারণের মৌখিক ঘোষণা কৃষকের কাছে তামাশা হয়ে গেল না?
কৃষক ফসল ফলায় অন্যের ক্ষুধা নিবারণের জন্য। সামান্য লাভে তাদের এই জীবিকা। এই ফসলই যদি গলার কাঁটা হয়ে যায়, তাহলে কৃষক কি ফসল ফলানোর উৎসাহ পাবে?
সরকারের উচিত কৃষি উপকরণসহ যেকোনো ধরনের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। তা না হলে খাদ্য উৎপাদনের ধারাবাহিকতায় বিঘ্ন সৃষ্টি হবে। আর এর প্রভাব পড়বে সমগ্র সমাজে। আমরা মনে করি, চাষাবাদের সব স্তরকে অনিয়ম, দুর্নীতি, সিন্ডিকেটমুক্ত করতে হবে। যেন খাদ্যপণ্য উৎপাদনের প্রক্রিয়া ও সরবরাহ চেইনে কোনো সংকট তৈরি না হয়। আলুচাষিদের বিষয়ে সরকারের বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি।
প্রিন্ট করুন

Discussion about this post