দিনের খবর শেষ পাতা

আবারও ৩২০টি বাস কিনতে চায় বিআরটিসি

রক্ষণাবেক্ষণ নেই

ইসমাইল আলী: ২০১০ সাল থেকে প্রায় এক যুগে এক হাজার ৫২৬টি বাস কিনেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। এর মধ্যে ভারত থেকে কেনা হয় এক হাজার ২৮টি। বাকিগুলো এসেছে চীন ও কোরিয়া থেকে। তবে কয়েক বছরের মধ্যে এসব বাসের একটি অংশ অচল হয়ে পড়েছে। রক্ষণাবেক্ষণে না থাকলেও বছরের পর বছর বাস কিনে যাচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি। এরই ধারাবাহিকতায় আবারও ৩২০টি সিএনজিচালিত বাস কিনতে যাচ্ছে বিআরটিসি।

সম্প্রতি এ প্রকল্পের প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (পিডিপিপি) প্রণয়ন করা হয়েছে। বাসগুলো কেনায় সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে ৪৩৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঋণ চাওয়া হবে। এজন্য বিআরটিসি থেকে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে চিঠি দেয়া হয়েছে। এতে বিআরটিসির জন্য ৩২০টি সিএনজি একতলা এসি বাস কেনার পিডিপিপি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) মাধ্যমে ইডিসিএফ কর্তৃপক্ষ বরাবর পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে অনুরোধ করা হয়।

পিডিপিপিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এরই মধ্যে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। তাই আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য দ্রুতই একটি আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা দরকার হবে। সারাদেশে দ্রুত নগরায়ণের ফলে শহরের ভেতরে ও আন্তঃজেলা রুটে বিশ্বস্ত, নির্ভরযোগ্য ও আরামদায়ক গণপরিবহন চাহিদা বাড়ছে। বর্তমানে বিআরটিসির বহরে এক হাজার ১০০ বাস চলাচল করছে। তবে পরিবহন খাতের চাহিদা পূরণে তা অপ্রতুল।

এর পরিপ্রেক্ষিতে বিআরটিসি ৩২০টি সিএনজিচালিত একতলা বাস সংগ্রহ করতে চায়। এর সঙ্গে ৩০ শতাংশ খুচরা যন্ত্রাংশও কেনা হবে। এজন্য ৬০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ) থেকে ৪৩৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঋণ নেয়া হবে। অবশিষ্ট ১৬৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা সরকারি তহবিল থেকে সরবরাহ করতে হবে।

যদিও এর আগে বিআরটিসির বাস কেনার অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। পুরোনো-নতুন মিলিয়ে সংস্থাটির বহরে বর্তমানে এক হাজার ৬৫০টি বাস থাকলেও এক হাজার ২৬৮টি সচল আছে। আর বিভিন্ন ডিপোতে বিকল পড়ে আছে ৩৮৬টি বাস। এর মধ্যে ১৭৮টি ব্যবহারের অযোগ্য ঘোষণার জন্য রাখা হয়েছে এবং ২০৪টির ভারী মেরামত করতে হবে।

সংস্থাটির তথ্যমতে, দুই দফায় সব মিলিয়ে ভারত থেকে এক হাজার ২৮টি বাস ও ৫৫০টি ট্রাক কেনা হয়। এর মধ্যে ২০১০ সালে ভারতের দেয়া এক বিলিয়ন ডলার ঋণের (এলওসি) আওতায় ২৯০টি দ্বিতল, ৮৮টি একতলা এসি ও ৫০টি জোড়া লাগানো বাস কেনা হয়। এতে ব্যয় হয় ৩৭ মিলিয়ন ডলার। এর সঙ্গে কর ও শুল্ক যোগ হয়।

দ্বিতীয় দফায় ভারত সরকারের সঙ্গে আরও দুই বিলিয়ন ডলার ঋণ চুক্তি করে সরকার। এর আওতায় ৬০০ বাস ও ৫৫০টি ট্রাক কেনা হয়, যা দেশে এসেছে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে। শুল্ক ও কর যুক্ত করে বাসগুলো কেনায় ব্যয় হয় ৪৬৭ কোটি টাকা। এসব বাসের মধ্যে জোড়া লাগানো বাসগুলো সবই বসে গেছে। দ্বিতীয় ও এসি বাসের একটি অংশও অচল হয়ে ডিপোতে পড়ে আছে, যদিও এগুলো ডিজেলচালিত।

এর আগে ২০১০ সালে চীন থেকে ২৪৫টি সিএনজিচালিত বাস কেনা হয়। এতে ব্যয় হয় ১১৪ কোটি টাকা। কিন্তু এখন সড়কে আর এই বাস দেখাই যায় না। বিআরটিসির কর্মকর্তারা বলছেন, চালু করার ছয় মাসের মধ্যে বাসে ত্রুটি দেখা দেয়। পাঁচ বছরের মধ্যে প্রায় সব বাস বাতিলের খাতায় চলে যায়। এর কিছু এখন লোহালক্কড় হিসেবে বিক্রি করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিআরটিসি।

এরপর ২০১২ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার দাইয়ু কোম্পানির কাছ থেকে ১০৩টি নন-এসি এবং ১৫০টি এসি একতলা বাস কেনে বিআরটিসি। এতে ব্যয় হয় ২৮১ কোটি টাকা। কোরিয়ার ঋণে ওই দেশ থেকে বাস কেনার শর্ত ছিল, কিন্তু এসব বাসও টেকেনি। কোরিয়া থেকে কেনা এসি ও নন-এসি বাসের মধ্যে ১০৩টি অচল পড়ে আছে বিভিন্ন ডিপোতে। ২৫টি বাস লোহালক্কড় হিসেবে বিক্রি করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিআরটিসি। এরপরও নতুন বাস কেনার উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এ বিষয়ে বিআরটিসির চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, বিআরটিসির বাস দ্রুত বিকল হয়ে পড়ার বিষয়টি সঠিক। কেন দ্রুত নষ্ট হচ্ছে, কোন বাস কত বছর টিকছেÑতা বিস্তারিত বের করার চেষ্টা চলছে। তবে কয়েক বছরের মধ্যে বিআরটিসির বহরের আরও কিছু বাস মেয়াদোত্তীর্ণ ও চলাচলের অনুপযুক্ত হয়ে পড়বে। তাই নাগরিক সেবা অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে নতুন বাস কেনা দরকার।

সূত্র জানায়, বিআরটিসি একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা। এর আয় থেকে কর্মীদের বেতন-ভাতাসহ যাবতীয় খরচ করার কথা। কিন্তু দ্রুত বাস নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং দুর্নীতি ও দেনার দায়ে ডুবতে বসেছে সংস্থাটি। সরকার ও বিভিন্ন দেশের কাছে সংস্থাটির ঋণের পরিমাণ ৭২৪ কোটি টাকা।

এদিকে বিআরটিসির বাস কেনার জন্য সরকার সাম্প্রতিক সময়ে নরডিক ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (এনডিএফ), কোরিয়ার ইডিসিএফ ও ভারতীয় সরকারের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছে। এর বাইরে যে টাকার দরকার হয়, তাও সরকার নির্ধারিত সুদে ঋণ দেয়। কিন্তু সরকার কোনোদিনই এই টাকা ফেরত পায় না। এমনকি বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার ঋণের কিস্তিও ঠিকমতো পরিশোধ করতে পারে না সংস্থাটি।

বিআরটিসির আয়-ব্যয়সংক্রান্ত নথি অনুসারে, ২০০৮-০৯ থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত এক যুগে বিআরটিসি আয় করেছে দুই হাজার ৭২৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে যাত্রী ও মালামাল পরিবহন ছাড়াও সংস্থার জমি-স্থাপনার ভাড়া, নিজস্ব কারখানায় বাইরের গাড়ি মেরামত করে এবং বেসরকারি চালকদের প্রশিক্ষণ দিয়েও আয় হয়। এ সময় সংস্থাটি ব্যয় করে দুই হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ পরিচালন আয় হয় প্রায় ৬৫ কোটি টাকা।

যদিও ৬৫ কোটি টাকা বাড়তি থাকলেও সেটা মুনাফা নয়, কারণ প্রতিবছরই অবসরে যাওয়া কর্মীদের গ্র্যাচুইটি, ছুটি নগদায়ন ও কন্ট্রিবিউটরি ফান্ডে ১০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করতে হয়। বাড়তি অর্থ দিয়ে এসব খাতের চাহিদা মেটাতে গিয়ে এখনও সংস্থাটির দেনা পড়ে আছে সাড়ে ২৬ কোটি টাকা।

বিআরটিসির বাস প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, বেসরকারি পরিবহন খাতকে পথ দেখাবেÑএই চিন্তা থেকে বিআরটিসির জন্ম হয়েছিল। কিন্তু দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিষ্ঠানটি নিজেই বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি আরও বলেন, দামি বাস কিনে অল্প দিনে নষ্ট হয়ে গেলেও কাউকে জবাবদিহি করতে হয় না, আয়-ব্যয়ের প্রতিটি পর্যায়ে দুর্নীতি রয়েছে, আয়ের একটা ভাগ নিয়ে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরাÑএভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারবে না। তাই বিআরটিসিকে নতুন বাস কিনে দেয়ার আগে এর পরিচালনায় স্বচ্ছতা আনতে হবে। সংস্থাটি ঢেলে সাজাতে হবে। প্রয়োজনে পিপিপি (সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব) মডেল অনুসরণ করা যেতে পারে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..