মত-বিশ্লেষণ

আবাসন শিল্পে সিঙ্গাপুরের সামাজিক দায়বোধ হংকংয়ের লালসা

পিটার জি. ডি ক্রাসেল: হংকংয়ের রাস্তায় রাস্তায় বিদ্রোহ-বিক্ষোভ। তিন মাস গড়িয়ে গেল, চলছে তো চলছেই। যান চলাচলে বিঘ্ন, জনজীবনে এসেছে স্থবিরতা। এই অস্থিরতা কেবল রাশি রাশি অর্থনৈতিক প্রতিকূলতায় ভারি হয়ে উঠছে। কিন্তু প্রশ্ন থাকে, কেন বেশিরভাগ মানুষ এখনও এই স্থবিরতায় বিরক্ত নয়? এর একটি ভয়াবহ কারণ হলো, আবাসন সংকট নিয়ে ব্যাপক-বিস্তৃত অসন্তোষ। এই সংকটময় পরিস্থিতি মূলত টেনে এনেছে প্রচণ্ড লোভী আবাসন ব্যবসায়ী ও ভূস্বামীরা। এরা সুপ্রতিষ্ঠিত এবং রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
হংকংয়ের সঙ্গে সিঙ্গাপুরকে তুলনা করে দেখা যেতে পারে। এই উভয় এলাকাই তাদের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া পাবলিক হাউজিং ব্যবস্থাকে লালন করে আসছে। হংকংয়ে ১৬ শতাংশের কম সংখ্যক বা এক দশমিক দুই মিলিয়নের কাছাকাছি মানুষ ভর্তুকিপ্রাপ্ত ‘হোম ওনারশিপ’ ফ্ল্যাটে বসবাস করে। আর সিঙ্গাপুরে ৮০ শতাংশ বা প্রায় চার দশমিক পাঁচ মিলিয়ন মানুষ বসবাস করে পাবলিক হাউজিং কর্তৃপক্ষের নির্মিত ফ্ল্যাটে। সিঙ্গাপুরের হাউজিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বোর্ড ৯৯ বছরের সস্তা চুক্তিতে ফ্ল্যাট বানিয়ে বিক্রি করে। এই ফ্ল্যাটগুলো আবার পরবর্তী সময়ে পুনঃবিক্রি বাজারে বিক্রি হয়ে থাকে। এটাকে একেবারেই প্রাইভেট হাউজিংয়ের সঙ্গে তুলনা করা চলে। তাই সিঙ্গাপুরের জনগণ হংকংয়ের জনগণের চেয়ে অনেক বেশি পরিতুষ্ট।
সিঙ্গাপুরে একটি নববিবাহিত দম্পতি ৪০০ বর্গফুটের একটি নবনির্মিত ফ্ল্যাট কিনতে পারে এক দশমিক পাঁচ মিলিয়ন, হংকং ডলারের (১,৯১,০০০ মার্কিন ডলার) কমে। আর হংকংয়ে সিঙ্গাপুরের ওই ফ্ল্যাটের এক চতুর্থাংশের সমান বা ১২১ বর্গফুটের একটি গত বছর জানুয়ারিতে ফ্ল্যাট বিক্রি হয়েছে দুই মিলিয়ন হংকং ডলারে; হংকংয়ের তাই পো শহরের এই বিল্ডিংটি ২৯ বছর ধরে সরকারি মালিকানাধীন রয়েছে।
এখানেই দুটি দেশের আবাসন ব্যবসায় সমাজ সচেতন নীতি আর অর্থলিপ্সার মধ্যে পার্থক্য পরিষ্কার হয়ে যায়। সমাজ সচেতনতার বিষয়টি সর্বপ্রথম হংকং সরকার উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে সরকারের অন্যরা এই সুযোগে ঝোপ বুঝে কোপ মেরেছে। কিন্তু এই মুহূর্তে তাদের কী করার আছে।
ভূমি বণ্টনে সরকারি নিয়োগপ্রাপ্ত টাস্কফোর্স হংকংয়ের আবাসন চাহিদা একেবারে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছে। তবে ভবিষ্যৎ খুবই ভয়াবহ। দুই লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ সরকারি আবাসনের জন্য যখন অপেক্ষা করছে, তখন অনেক পুরোনো হাউজিং ব্লক প্রতিস্থাপন করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এদিকে ২০৩০ সালের মধ্যে জনসংখ্যা ৯ মিলিয়নে পৌঁছবে বলে ধারণা করা যায়। এসব সরকারি হাউজিং ব্লকের অনেক ইউনিট এমন কিছু লোক দখল করে আছে, যারা খুব ভালোভাবেই নিজেদের লগ্নিকৃত ভবনে বসবাস করার মতো সামর্থ্য রাখে।
এসব কারণে নাগরিক সমাজ ক্ষুব্ধ হয়েছে। যে ক্ষোভ তাদের দলে দলে প্রতিবাদে যোগ দিতে রাস্তায় টেনে এনেছে।
তাছাড়া টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে, এখানে ১২০০ হেক্টরের জমির ঘাটতি রয়েছে। এমনকি তার মধ্যে ৮০০ হেক্টর জমি জরুরিভিত্তিতে সংকুলান করার প্রয়োজন রয়েছে। কাজেই সরকার এখন ল্যান্টাও থেকে বিচ্ছিন্ন একটি কৃত্রিম দ্বীপ সৃষ্টি করতে চলেছে!
হংকংয়ের কি আদৌ এটার প্রয়োজন রয়েছে? তার চেয়ে ছয়টি নতুন উন্নয়ন অঞ্চলে ত্বরিত উন্নয়নের মাধ্যমে দুই হাজার ৫০০ হেক্টরের মতো জমি সরবরাহ করা সম্ভব ছিল। আমাদের এক হাজার ৩০০ হেক্টরের ব্রাউনফিল্ড (নগরীর আবাসন গড়ে তোলার মতো সম্ভাব্য এলাকা) জমির কথা ভুলে গেলে চলবে না। এখানে এক টুকরো তালি পট্টিমারা জমি অনেক ব্যয়বহুল, তবুও তা দ্বীপের মাঝে বাড়ি বানানোর চেয়ে অনেক বেশি সস্তা। এর সঙ্গে আরও এক হাজার হেক্টরের আবাদি ভূমি ও বহু একরের আবাসন গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। এ সম্ভাবনা নিয়েই এ দ্বীপটি হয়তো জেগে উঠবে। আর অবশ্যই এক্ষেত্রে সেসব আবাসন ব্যবসায়ীর দিকে না তাকালে চলবে না, যারা বিশাল একরের আবাসন গড়ে তোলার জন্য বসে আছে।
হ্যান্ডার্সন ল্যান্ড ডেভেলপমেন্টের রয়েছে ৬৫০ একরের এক বিশাল ভূমি ব্যাংক। সুন হুং কাই আরও বেশি ৪৪০ হেক্টর জমির মালিক। নিউ ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট ২৫০ হেক্টরের একটি ভূমি ব্যাংক গড়ে তুলেছে। তারা হয় এটাকে ব্যবহার করবে নইতো হারাবে; আর সেটাই তো হওয়া উচিত।
আবাসন ব্যবসায়ী ও ভূস্বামীদের সম্পদের লালসা এত ভয়াবহ পর্যায়ে উঠে গিয়েছে যে, তারা গড়পড়তা হংকংবাসীর বাড়ি কেনার অধিকারকেই অস্বীকার করে বসেছে। তারা মানতেই পারছে না যে, বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত পর্যায়ের মানুষ বাড়ি কিনতে পারে। এখানেই তারা ক্ষান্ত হয়নি বরং এই মধ্যবিত্ত শ্রেণি যদি কোথাও বাড়ি বানানোর উদ্যোগ নেয় তবে এই আবাসন ব্যবসায়ী ও ভূস্বামীরা তাদের কাজ জোরপূর্বক বন্ধ করে দেয়। ২০১৪ সালের আমব্রেলা মুভমেন্টের পর থেকে ফ্যাট অ্যাঞ্জেলেস, ল্যারুসি, মারস্যাডো, মারসিডিস মি, মিএসওয়াই পুন্টি, নিও, দি কিনেট ও ভ্যানিমাল নামের অনেক রেস্তোরাঁ, বার ও বিনোদনের স্থান তাদের দোয়ার বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
এর মধ্যে গ্রাপা’স সেলার সর্বশেষ উদাহরণ যারা তাদের ব্যবসা বন্ধ করে দিল। কেননা, এর জমির মালিক একটি ফুড কোর্টের কাছে ভাড়া দিয়ে তাদের ভাড়ার আয় বাড়াতে চেয়েছিল। গ্রাপা’স সেলার যে রাতে বন্ধ হলো, জুলাই মাসের ১৯ তারিখে সে রাতে ওখানে বসেই লাস্ট অর্ডার ব্যান্ডের কুইন্স রেডিও গা গা’র একটি গান শুনছিলাম। গানে মর্মার্থ আমার মনে এসে হানা দিয়ে বলল: শূকর মোটা হয়, বরা (খাসি করা গৃহপালিত শূকর ছানা) হয় বধ। কেননা তারা ভাড়ার বিল যে হারে বাড়াচ্ছে, তা এখন পুরোই ভীমরতিগ্রস্ত।
এখানে হংকংয়ের আবাসন ব্যবসায়ী ও ভূস্বামীদের রূপক অর্থে শূকর বলা হয়েছে। আর পথআন্দোলনের সবচেয়ে বড় দায় এদের নিতে হবে। এমনকি জনগণ যদি এসব শূকরের সুরক্ষা ও শক্তিদানকারীদের রক্তপিপাসায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে কুকুরের মতো উচ্চস্বরে ঘেউ ঘেউ করে তাতে কি অবাক হওয়ার কিছু থাকে? এক্ষেত্রে চিফ এক্সিকিউটিভ ক্যারি ল্যাম চেং ইউয়েতংগর ও তার রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও আইনবিষয়ক সহায়তাদানকারীদের নাম শূকরের সুরক্ষা ও শক্তিদাতা হিসেবে উঠে আসে।
আবাসন ব্যবসায়ী ও ভূস্বামীরা আবাসন ও জমির খূচরা মূল্য এমনভাবে নির্ধারণ করে, যেখানে মধ্য ও নিম্ন আয়ের হংকংবাসীর পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এসব ব্যবসা ও বাড়িকে তারা কারসাজির মাধ্যমে এই মধ্য ও নিম্ন আয়ের প্রবেশের অযোগ্য করে রেখেছে। এমনকি তারা তাদের ভাই-বোন ও মা-বাবার সঙ্গে কক্ষ ভাগাভাগি করে বাস করতে বাধ্য হয়। বলা চলে, তাদের বাধ্য করা হয়।
আজকের এই বিদ্রোহের বীজ রোপিত হয়েছিল স্বার্বভৌমত্ব পরিবর্তনের ঠিক পরেই। পরের বছরগুলোয় সৃষ্টি হওয়া দেউলিয়াত্ব মেটাতে সক্ষম হয়নি অনেকগুলো অর্থনৈতিক খাত ও শাখা। ১৯৯৮ সালের পরে গৃহস্থালি আয় বেড়েছে যৎসামান্য, কিন্তু এ সময়ের মধ্যেই সম্পদ-সম্পত্তির দাম বেড়ে হয়েছে আকাশচুম্বী। এটা ভূস্বামীদের ভুঁড়ি মোটা হতেও ছিল বড়ই সহায়ক; একই সঙ্গে তাদের বহুদিন ধরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত রাজনৈতিক শক্তিদাতারা হয়েছে হৃষ্টপুষ্ট।
সরকারে এখন প্রয়োজন তার অর্থনৈতিক কর্মপরিকল্পনা পরিবর্তন করে নেওয়া: বিশেষ করে তারা তাদের ভূমি রাজস্ব আদায় করেই অর্থনৈতিক কাঠামোকে শক্তিশালী করে নিতে পারে। এমনকি তারা তাদের আবাসন সংকটটিও এভাবেই মিটিয়ে ফেলতে পারবে। কেননা, এটা এমন এক সংকট, যা তাদের অর্থনীতির যে কোনো সময় ও খাতকে করছে প্রভাবিত। যদি চোখে আঙুল দিয়ে এই সংকট দেখিয়ে দিতে হয়, তবে আমাকে এখন সেখানকার আন্দোলনকারীদের ব্যবচ্ছেদ করতে হবে। এই আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে সরকারি কর্মচারী, আইন ও আর্থিক খাতসমূহ, শ্রমিক পরিষদসমূহ এবং বিমানবন্দর কর্মীরা। বলা চলে আবাসন ব্যবসায়ী ও ভূস্বামী ছাড়া এই আন্দোলনে সবাই শামিল হয়েছে।
এখন সরকারকে অবশ্যই আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একটি বসা-বৈঠক করে বহিঃসমর্পণ বিল ও ল্যান্টাও টুমরো ভিশন তুলে নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে। ল্যান্টাও ফান্ড পুনরাই বরাদ্দ করার মধ্যে দিয়ে সস্তা দরে আবাসন বণ্টন করতে পারলে একটি দীর্ঘ সময়ের জন্য এই আন্দোলনকে প্রশমিত করা চলে। ধীরে ধীরে আন্দোলনকারীরা রাস্তা ছেড়ে দেবে। একটি স্বাধীন ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন নিয়োগ দিয়ে এই আন্দোলনে যেসব দল ঘোলা জলে মাছ শিকার করছে তাদের বিরুদ্ধে একটি তদন্ত চালানো যেতে পারেÑতাতে ক্ষীরের স্বাদ আরও মিষ্টি হবে আশা করা যায়।

কৌশলগত বিশ্লেষক, সাম্প্রতিক সমাজ সমালোচক ও কাস্টম মেইড পলিটিকস সিরিজ বই ও ব্লগের লেখক

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট হতে
ভাষান্তর: মিজানুর রহমান শেলী

সর্বশেষ..