প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

আমদানি শুল্ক কম: অসম প্রতিযোগিতায় বিস্কুট চকোলেট উৎপাদকরা

 

নাজমুল হুসাইন: দেশি শিল্প সুরক্ষায় কয়েক বছর আগেও (২০০৮-০৯ অর্থবছর) বিস্কুট আমদানিতে শুল্ক ছিল ২০০ শতাংশ। বর্তমানে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার শর্ত পূরণে এ পণ্যের সম্পূরক শুল্ক কমছে। এখন বি¯ু‹ট আমদানিতে শুল্ক দিতে হয় মাত্র ৪৫ শতাংশ। একইভাবে বিদেশ থেকে তৈরি চকোলেটের আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ২০ শতাংশ। কিন্তু দেশে এসব পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রতি বছরই বাড়ে ট্যারিফের হার। সব মিলে দেশে সুবিধা বাড়ছে আমদানির বাজারে। ফলে অসম প্রতিযোগিতায় পড়েছেন দেশি উৎপাদকরা।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে ২০০৮ সালে ওই সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধির পর বিস্কুটের আমদানি কমে যায়। সে সুযোগে দেশে দ্রুত বিকশিত হতে থাকে বিস্কুট উৎপাদন। তখন অল্প সময়ে দেশে বিস্কুট উৎপাদনে সমৃদ্ধি লাভ করে অর্ধশত প্রতিষ্ঠান। যার ফলে দেশের চকোলেটের আরেক বড় বাজার ধরতে তা উৎপাদনও শুরু করে। তবে কয়েক বছর পর থেকেই ক্রমাগত কমতে থাকে এসব পণ্যের আমদানি শুল্ক। কমতে কমতে বর্তমানে তা এমন অবস্থায় দাঁড়িয়েছে যে, আমদানি থেকে উৎপাদনে এসব পণ্যের খরচ বেশি দাঁড়াচ্ছে। বাজারে আমদানি পণ্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পারছে না এসব কোম্পানি। ফলে এমন বৈষম্য বাধাগ্রস্ত করছে এ শিল্পের বিকাশ।

শুধু আমদানি বাড়াই এসব পণ্যের জন্য বড় আতঙ্ক, তা নয়। চোরাইপথেও দেশে প্রচুর চকোলেট, ক্যান্ডি, ওয়েফার ও বিস্কুট-কেক আসছে। আমদানির বড় বাজার ও বৈধতা থাকায় চোরাইয়ের এ প্রবণতাও বেশি। পার্শ্ববর্তী ভারতসহ মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, ইংলান্ড থেকে প্রচুর পণ্য দেশে প্রবেশ করছে। অবৈধ উপায়ে আসা এসব পণ্য শত শত টন। সব মিলে দেশে এই দুই পণ্যের বাজারের এক-তৃতীয়াংশ বেদখল হয়ে রয়েছে।

দেশে এসব পণ্যের বাজার নিয়ে বেশ কিছু তথ্য রয়েছে বাংলাদেশ অটো বিস্কুটস অ্যান্ড ব্রেড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের কাছে। তাদের তথ্যমতে, আগে আমদানির বাজার অনুকূলে থাকা অবস্থায় দেশে বিস্কুটের বাজার সম্প্রসারিত হয়েছে ১৫ শতাংশের বেশি। যা বর্তমানে থমকে রয়েছে।

সমিতির তথ্য মতে, দেশে বর্তমানে শতাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যাদের মধ্যে বৃহৎ পরিসরে এসব পণ্য উৎপাদনে রয়েছে প্রায় দুই ডজন কোম্পানি। অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, আল-আমিন ব্রেড অ্যান্ড বিস্কুট

লিমিটেড, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ, ইফাদ গ্রুপ, নাবিস্কো বিস্কুট অ্যান্ড ব্রেড ফ্যাক্টরি লিমিটেড, ফু-ওয়াং ফুড, গ্লোব, হক, ড্যানিশ, বনফুল, নিউ অলিম্পিয়া, রোমানিয়া, ডেকো ইত্যাদি কোম্পানি বাজারে সুপ্রতিষ্ঠিত। সব মিলে দেশে এসব পণ্যের বাজার প্রায় ৫০০ কোটি টাকার।

কোম্পানিগুলোর অবস্থা নিয়ে অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি শফিকুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, ‘২০০৮-০৯-এ কোম্পানিগুলোকে বাঁচাতে আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ২০০ শতাংশ করা হয়েছিল। যা এখন মাত্র ৪৫ শতাংশ। তাও আমদানির ক্ষেত্রে আন্ডার ইনভয়েস করা হয়। তাতে দেশি উৎপাদকরা নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে বিস্কুট তৈরি হয় যেসব দেশের কাঁচামাল দিয়ে, সেসব দেশ থেকেই বিস্কুট আমদানি করা হচ্ছে নামমাত্র ট্যাক্সে। এতে কোম্পানিগুলো কাঁচামাল আমদানি করে তাদের মতো কম খরচে পোষাতে পারছি না।’

এ অবস্থায় দেশে বিস্কুটের বাজারের দুই-তৃতীয়াংশ দখলে রয়েছে দেশি উৎপাদক কোম্পানিগুলোর। তবে চকলেট উৎপাদনে এ হার একেবারেই কম। দেশের বাজারে বিস্কুটের সব থেকে বড় অংশ অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের হাতে। আর দ্বিতীয় অবস্থানে এখন প্রাণ। এই দুই কোম্পানির দখলে দেশের প্রায় ৩৫ শতাংশ বাজার।

অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোবারক আলী বলেন, ‘প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়েই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। তবে সরকার সহায়তা করলে এ খাত আরও এগিয়ে যেত। শতভাগ বাজারে আধিপত্য করতে পারতো দেশি কোম্পানিগুলো। সুবিধা পেলে চকলেটেরও বড় বাজার তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।’

নিজের প্রতিষ্ঠান নিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর অলিম্পিক প্রায় ১০০ কোটি টাকার বিস্কুট ও বেকারি সামগ্রী বিক্রি করে। ২০২০ সাল নাগাদ আমরা এই বাজার দ্বিগুণ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এ জন্য স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি রফতানির বাজারে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে।’

২০১৫-১৬ অর্থবছরে তৈরি চকলেটের ক্ষেত্রে আমদানি শুল্ক কমানো হয়। ওই বাজেটে চকলেটের সম্পূরক শুল্ক ৩০ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ করা হয়। এতে চকলেট ও ওয়েফার আমদানিতে খরচ কমে আসে। ফলে বাজারে বিদেশি চকলেট আমদানি বাড়ছে।

দেশে প্রথম ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের আওতায় বাজারে আসে মিমি চকলেট। এছাড়া মিল্ক ভিটা দেশে তৈরি করছে চকলেট ও চকলেট বার। তবে বিদেশি চকলেটের সঙ্গে টিকে থাকা দুরূহ হয়ে বর্তমানে রুগ্ন হয়ে পড়েছে কোম্পানিগুলোর ব্র্যান্ড। এছাড়া বেসরকারি উদ্যোগে দেশে এ পর্যন্ত ডজনখানেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও বাজারে তেমন বিস্তার লাভ করতে পারেনি। অধিকাংশ কোম্পানি এখন সাধারণ ক্যান্ডি ও ওয়েফার উৎপাদন করছে।