সারা বাংলা

আমন ক্ষেতে কারেন্ট পোকার আক্রমণ, দিশাহারা কৃষক

শামসুল আলম, ঠাকুরগাঁও: কার্তিক মাসের আট দিন পেরিয়েছে। এরই মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ে আমন ধানের সবুজের সমারোহে ধীরে ধীরে ভরে উঠছে কৃষকের ধান ক্ষেত। সেই  সঙ্গে রঙিন হয়ে উঠেছে কৃষকের চোখ-মুখ। সোনালি ধানের সোনার স্বপ্ন দেখছিলেন প্রান্তিক কৃষক। কিন্তু আমনের মাঝামাঝি সময়ে ক্ষেতের কাঁচা ধান কেটে সাবাড় করে ফেলছে ইঁদুরের দল। আর নতুন করে কারেন্ট পোকার আক্রমণে দিশাহারা  হয়ে পড়েছেন এ অঞ্চলের কৃষক। এতে ব্যাপক ক্ষতির মধ্যে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুয়ায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় আমন আবাদের  লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় এক লাখ ৩৬ হাজার ৮৮৫ হেক্টর। আবাদ হয়েছে এক লাখ ৩৭ হাজার ৮৫ হেক্টর, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। এরমধ্যে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলায় আমন আবাদ হয়েছে ৫১ হাজার  ৫০৫ হেক্টর। জেলায় এবার বিভিন্ন জাতের আমন ধান আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ধানীগোল, সুমন, স্বর্ণ তেজ, শক্তি, কমলসহ আরও অন্যান্য জাতের ধান রয়েছে।

এছাড়া বিভিন্ন আগাম জাতের আমন ধানও চাষ হয়েছে। এর মধ্যে দেশীয় উদ্ভাবিত স্বল্প জীবনকালের ধান বিনা-৭, ব্রি ধান ৩৩ ও বিভিন্ন ধরনের উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড ধানের চাষ হয়েছে, যা মোট আবাদের শতকরা ১০ ভাগ বা ১৩ হাজার ২৬০ হেক্টর। কৃষি বিভাগের হিসাবে, চলতি বছর চাষকৃত জমি থেকে প্রায় চার লাখ ৫৬ হাজার ১৯ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হবে, যা ধানে ছয় লাখ ৮৪ হাজার ৪২৮ মেট্রিক টন। হিসাব অনুযায়ী, প্রতি একর ধান উৎপাদন হওয়ার কথা ৪৫ মণ।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার চিলারং ইউনিয়নের ভেলাজান গ্রামের কৃষক মো. রুহুল আমীন জানান, তিনি ১০ বিঘা জমিতে রোপা আমন ধানের চাষ করেছেন। জমিতে পাঁচ বিঘা আগাম ধান ধানি গোল ও বাকি পাঁচ বিঘা জমিতে সুমন স্বর্ণ জাতের ধান চাষ করেছেন। কিন্তু এ বছর বিপাকে পড়তে হয়েছে। হঠাৎ ধান কাটার শেষ সময়ে জমিগুলোতে কারেন্ট পোকা আক্রমণ করেছে। কীটনাশক স্প্রে করেও তেমন কাজ হচ্ছে না বলে জানান তিনি।

সদর উপজেলার আখানগর ইউনিয়নের ভেলারহাট গ্রামের কৃষক মানিক ইসলাম জানান, তিনি পাঁচ বিঘা জমিতে সুমন স্বর্ণা ও ধানি গোল জাতের ধানের চাষ করেছেন। শেষ সময়ে ধানক্ষেতের ভালোই ছিল। কিন্তু ধান ক্ষেতে কারেন্ট পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার ১০ শতাংশ জমির ধান কারেন্ট পোকায় খেয়ে ফেলেছে। ইঁদুরও আমার ধান কেটে ফেলছে। আশা করেছিলাম, বিঘায় ২৮-৩০ মণ ধান পাব। কিন্তু কারেন্ট আক্রমণে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছি।’

অপর দিকে ঠাকুরগাঁওয়ের রানী সংকৈল উপজেলার বনগাঁও ঝাড়বাড়ি গ্রামের কৃষক আইয়ুব আলী প্রায় ১২ বিঘা জমিতে আমন ধান আবাদ করেছেন। এর মধ্যে প্রায় দুই বিঘা জমির আমন ধান কারেন্ট পোকা নষ্ট করে ফেলেছে। একই এলাকার একরামুল মাস্টারের প্রায় এক বিঘা, মঞ্জুরুল আলমের দুই বিঘা, আইয়ুব আলীর ও বাহাদুরের দুই বিঘা জমির আমন ধানের ফসল নষ্ট করেছে কারেন্ট পোকা। তবে কীটনাশক স্প্রে অব্যাহত রেখেছেন তারা। এছাড়া জেলার সব উপজেলাগুলোতে কম বেশি কারেন্ট পোকার আক্রমণ দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে।

কৃষকরা জানান, পোকার আক্রমণ ঠেকাতে কীটনাশক প্রয়োগ করেও পুরোপুরি দমন করা যাচ্ছে না। প্রতি সপ্তাহে এক থেকে দুই বার কীটনাশক স্প্রে করতে হচ্ছে। তারা বলেন, ‘আমাদের ক্ষেতের ওপর এত পোকার আক্রমণে ধানের আশানুরূপ ফলন পাব কিনা জানি না। ধারদেনা করে ফসল আবাদ করছি। তাই যদি নষ্ট হয়ে যায়, কি করে আমরা খেয়ে পরে বাঁচব?’

কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ঠাকুরগাঁওয়ের মাঠে এবার ধান ক্ষেত দেখে কৃষকের পাশাপাশি তারাও খুব খুশি ছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কারেন্ট পোকার আক্রমণে কৃষকদের চিন্তিত না হয়ে ‘পাইমেট্রোজিন’ গ্রুপের কীটনাশক দিয়ে ধান ক্ষেতের গোড়া ও উপরে স্প্রে করার পরামর্শ দিয়েছেন। এ গ্রপের কীটনাশক দিয়ে স্প্রে করলে কারেন্ট পোকার আক্রমণ দূর হবে।

ঠাকুরগাঁও কৃষি বিভাগের উপপরিচালক মো. আফতাব হোসেন বলেন, ‘ধানসহ বিভিন্ন ক্ষেতে পোকার আক্রমণ থেকে ফসল বাঁচানের লক্ষ্যে কৃষকদের মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আশা করি এবারও ভালো ফলন পাব।’

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..