দিনের খবর মত-বিশ্লেষণ

আমরা কি দুর্নীতিতে শীর্ষেই থাকব?

‘পাপীকে নয় পাপকে ঘৃণা করো’প্রবাদটি সেই শৈশব থেকে আমাদের পরিচিত। শিশুদের পাঠ্যবইয়ে অমন ধরনের প্রবাদ নিয়ে রচনাও দৃষ্টিগোচর হয়। কিন্তু পুঁথিগত বিদ্যার কতটুকু আমরা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করি। রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক সাহেদের করোনাভাইরাস টেস্টের ভুয়া রিপোর্ট প্রদানের ব্যাপারটা যখন ধরা পড়ল, তখন থেকেই শুধু এই দুর্নীতি নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। অন্যদিকে, জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা আরিফকে নিয়েও লঙ্কাকাণ্ড হয়ে গেল। নীতিবিরোধী কার্যকলাপ কি শুধুই ওই কয়েকজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ?  বিভিন্ন খাতে হাজার সাহেদ-সাবরিনা জনসম্পদকে লুটপাট করে চলছে হরহামেশাই।

দেশের বড় অনিয়মগুলোর মধ্যে আর্থিক কেলেঙ্কারি ও ঋণখেলাপি অন্যতম। সরকারের অর্থ শাখার বর্তমান নেতারা দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বলে আসছেন, দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ আর বাড়বে না। কিন্তু বাস্তবতা পুরোটাই বিপরীতে। ২০১৮ সাল শেষে যেখানে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা, সেখানে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৯ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২২ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলছে, প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও অনেক বেশি। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১৯ সালের প্রাক্কলিত হিসেব অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশেই খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি। এর ফলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সেক্টরে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও ভোক্তাদের আস্থা প্রতিনিয়ত কমে আসছে।

দুর্নীতি সূচকে এখনও বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম দিকে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ধারণা সূচকে ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যা¤িপয়ন হওয়ার রেকর্ড আমাদের পুরোনো কথা। অবশেষে ২০১৬ সালের দিকে ১৬তম অবস্থানে দাঁড়ালেও এখন পর্যন্ত সংখ্যাটা এর আশপাশেই ঘুরপাক খাচ্ছে প্রতি বছর। সংস্থাগুলো দুর্নীতি সূচক ধারণা প্রকাশ করে নানা খাতে অনিয়ম পর্যালোচনার পর একটি স্কোর প্রদান করার মাধ্যমে। সে হিসেবে বাংলাদেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অপকর্ম ঢুকিয়ে ফেলেছি আমরা। এর আগে দুর্নীতি কখনও পুরোপুরি দমন সম্ভব নয়, এমন আশাহত হওয়ার মতো কথাও বলেছেন অনেক অর্থনীতিবিদ।

বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেগুলোকে নীতিবাক্য তৈরির কারখানা বলা হয়, সেগুলোই যেখানে নিস্তার পায়নি, সেখানে অন্যান্য স্তরকে দুর্নীতি থেকে নিরাপদ রাখাটা এক অর্থে দুঃসাধ্য ব্যাপার। মনুষ্যত্ববান মানুষ গড়তে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুরু দায়িত্ব পালন করে, অথচ আমাদের শেখা ও কাজের মধ্যে কোনো মিল নেই। শিক্ষা অর্জন করে বড় বড় ডিগ্রিধারী গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সুশিক্ষার অভাব যেন রয়েই যাচ্ছে! সরকারি চাকরি দেওয়ার নাম করে এক ধরনের দালাল চক্র যে প্রতারণার ফাঁদ পাতে, তাতে আটকে পড়ে অনেক শিক্ষিত বেকার। পরে চাকরি তো দূরের কথা, চাকরি জন্য তারা যে ঘুষ দেয়, তাও ফেরত পায় না। সুতরাং আমাদের দ্বারা এমন কোনো কাজ যাতে না হয়, যা অপকর্মকে ত্বরান্বিত করে, সে বিষয়েও খেয়াল রাখা জরুরি।

দুর্নীতির চাকায় সব সময় চাপা পড়ে যায় সাধারণ মানুষ। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তিদের দখলদারি চিন্তা-ভাবনার ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে তাদের ওপরে। যেমন: প্রত্যেক বছর জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ মোকাবিলায় সরকার নদীর তীরবর্তী ও উপকূলীয় অঞ্চলের অধিবাসীদের জন্য মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প বরাদ্দ দেয়। সরকারের পাশাপাশি বিদেশি সহায়তাও পর্যাপ্ত থাকে। এরপরও সেসব অঞ্চলের মানুষের কষ্টের সীমা থাকে না। খাদ্য ও বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদার সঙ্গে সংগ্রাম করে তাদের বাঁচতে হয়। নৈতিকতার অবক্ষয়ের কারণে দেশে অপচারের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। যতক্ষণ পর্যন্ত আমলা ও রাজনৈতিক নেতারা মনে করবেন না যে, তারা সরকারের জন্য নয় বরং দেশের জনগণের জন্য কাজ করেন, ততক্ষণ পর্যন্ত দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো সম্ভব নয়।

প্রধানমন্ত্রী এর বিপক্ষে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করার পরও এর দুর্নীতি যেন কোনোক্রমেই থামছে না। কারণ অপরাধ করে পার পাওয়া যায় এমন ধারণা আমাদের সমাজে এখনও প্রতিষ্ঠিত। যেকোনো দুর্নীতি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই অপরাধে ক্ষমতাবান ব্যক্তি থেকে শুরু করে একজন দিনমজুরের জন্য আইন সমান।

অপকর্ম দেখলেই আমাদের বাধা দিতে হবে। নিজ পরিবারের সদস্যদের অসৎ উদ্দেশ্য প্রতিরোধ করতে হবে। সে ব্যক্তি হতে পারে নিজের মা অথবা বাবা। মানুষের আত্মবিবেকের সমৃদ্ধিও আসে পরিবার থেকে। শিশুর জšে§র পর তার সামাজিকীকরণে এটি প্রধান ভূমিকা পালন করে। সামাজিক এই গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন ‘পরিবার’কে ঠিক করতে পারলে সমাজও রক্ষা পাবে। তবেই সুখী সমৃদ্ধ দেশ গড়া সম্ভব।

সাজ্জাদ হোসেন

শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..