মত-বিশ্লেষণ

আমাজনের আগুন, ব্রাজিল ও বাকি বিশ্বের করণীয়

জ্যঁ পিসানি-ফেরি: সম্প্রতি ফ্রান্সের বিয়ারিৎজে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে আমাজনের রেইনফরেস্টে অগ্নিকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে ওই অঞ্চলকে পৃথিবীর ফুসফুস হিসেবে অভিহিত করেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ। সমগ্র বিশ্বের জন্য রেইনফরেস্টের সংরক্ষণের গুরুত্ব থাকায় ম্যাখোঁ বলেন, সবকিছু ধ্বংস করে ফেলার ব্যাপারটি কোনোভাবেই সমর্থন করতে পারেন না ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জায়ার বোলসোনারো। জবাবে ম্যাখোঁর বিরুদ্ধে একটি অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ
করার অভিযোগ তোলেন বোলসোনারো। তিনি বলেন, কোন ধরনের প্রমাণ ছাড়াই আমাজন বন নিয়ে জি-৭ সম্মেলনে আলোচনা উপনিবেশবাদী মনোভাবের পরিচায়ক।
পরে এই বিতর্ক আরও বিস্তৃতি লাভ করে। এখন ব্রাজিল আমাজন বন রক্ষা করতে ব্যর্থ হলে সম্প্রতি ল্যাটিন আমেরিকাভিত্তিক সর্ববৃহৎ অর্থনৈতিক জোট ‘মার্কোসর’-এর সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) স্বাক্ষরিত চুক্তি আটকে দেওয়ার হুশিয়ারি দেন ম্যাখোঁ। মার্কোসরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য দেশ ব্রাজিল।
ম্যাখোঁ ও বোলসোনারোর মধ্যকার এ বিরোধ সাম্প্রতিক দুটি বিষয়ের মধ্যকার উদ্বেগের বিষয়টি আরও বেশি দৃষ্টিগোচর করে তুলেছে। বিষয়টি হলো, বৈশ্বিক সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বেড়ে যাওয়া এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়া। এই দুটি পক্ষের মধ্যে আরও বিরোধ অনিবার্য। তারা যখনই মিলিত হোক বা না হোক, তা আগামীতে আমাদের পৃথিবীর ভাগ্য নির্ধারণ করবে।
বিশ্বের জনগণের জন্য আসলে নতুন কিছু নেই। উনিশ শতকের শুরুর দিকে সংক্রামক রোগ এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য বৈশ্বিক সহযোগিতামূলক বিষয় গড়ে উঠেছিল। তবে সহস্রাব্দে প্রবেশের সময় সম্মিলিত পদক্ষেপের বিষয়টি সেভাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি। তখন বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদদের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা পাওয়া বৈশ্বিক জনগণের সম্পদ তত্ত্ব নানা ধরনের সমস্যার ক্ষেত্রে প্রয়োগ হতে থাকে। জলবায়ু পরিবর্তন রোধ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা থেকে শুরু করে আর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার দেখা গেছে।
স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মনে করে, বৈশ্বিক সমাধান একমত হওয়ার ওপর নির্ভরশীল এবং তার প্রয়োগের ওপর বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলোর সমাধান নির্ভর করে। এজন্য বৈশ্বিক বাধ্যতামূলক সমঝোতা কিংবা আন্তর্জাতিক আইন বাস্তবায়ন ও প্রয়োগ হতে পারে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। ভবিষ্যতে বৈশ্বিক শাসন ব্যবস্থার অন্তর্ভূতকরণের মাধ্যমে এটি করা হতে পারে বলে মনে করা হয়।
তবে এটি একটি বিভ্রম হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। বিশ্বায়নের প্রতিষ্ঠানিক কাঠামো বৈশ্বিক শাসন ধারণার উন্নতি করতে ব্যর্থ হয়েছে, যেটি প্রত্যাশা করা হয়েছিল। ১৯৯৫ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান আলোর মুখ দেখেনি। যদিও বিরোধে মধ্যস্থতা করা ছাড়া তেমন কোনো ক্ষমতা নেই এটির। বিনিয়োগ তত্ত্বাবধান, প্রতিযোগিতা, কিংবা পরিবেশ রক্ষায় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা ক্রমেই মিলিয়ে যাচ্ছে। এর আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জোটবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা শুরু করেন, যদিও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আঞ্চলিক ব্যবস্থায় এবং বৈশ্বিক আর্থিক নিরাপত্তাজালে পুনর্গঠন শুরু হয়েছে।
একটি বৈশ্বিক প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে ওঠার পরিবর্তে এখন বিশ্ব একটি অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ প্রত্যক্ষ করছে। পিটারসন ইনস্টিটিউটের মনিকা ডে বোলে এবং জেরোমিন জেটেল মেয়ার জি-২০ জোটের ৫৫টি রাজনৈতিক দল নিয়ে একটি নিয়মতান্ত্রিক গবেষণায় দেখেন, সবাই জাতীয় সার্বভৌমত্বের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে এবং জোটবদ্ধতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন ২০০০ সালে এক লেখায় বলেন, বৈশ্বিক প্রশাসন ব্যবস্থার ধারণা ‘আমেরিকানিজম’-এর জন্য হুমকি। অনেকে এই ধারণাকে জোক বা মজার ব্যাপার হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। অনেকে এখন হাসাহাসি করছেন।
এটা সত্য যে, জাতীয়তাবাদ যুদ্ধে জয়ী হতে পারেনি। যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া এবং ইতালি ও অন্য দেশগুলোতে উগ্র-জাতীয়তাবাদীদের উত্থানের মতো ব্যাপার থাকা সত্ত্বেও গত মে মাসে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভীতি সৃষ্টিকারী পপুলিস্টরা জয়ী হতে পারেনি। জনগণের মধ্যে একটি বিষয় নিয়ে নিজেদের ভাষা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। তারা সমস্যা সমাধানে নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা দেখতে চান প্রয়োজনে সেটা ইউরোপিয়ানই হোক, কিংবা বৈশ্বিক পর্যায়ে।
এখনকার সময়ে আন্তর্জাতিক সম্মিলিত পদক্ষেপগুলো সর্বজনীন চুক্তিভিত্তিক বাধ্যবাধকতার আলোকে করা যায় না। তখন একটি প্রশ্ন সামনে আসে, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় কোন উদ্যোগটি ভালোভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে, যখন জাতীয় সার্বভৌমত্বের বিস্তৃত হওয়া ঠেকানোর বিষয়টি সামনে চলে আসে।
কিছু প্রক্রিয়া এরই মধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে কাজ করা শুরু করেছে। উদাহরণস্বরূপ বাণিজ্যের কথা বলা যায়, কিছু গ্রুপ সীমান্তের পেছনের প্রযুক্তিগত মানের মতো বিভিন্ন বিষয়ে সৃষ্টি হওয়া সমস্যাগুলো মোকাবিলা করছে। এছাড়া তারা পণ্য ও সেবার মধ্যকার পার্থক্যগুলোও দূর করছে। বড় ব্যবসায়ীদের বাজারে শক্তি প্রদর্শনের মতো ব্যাপারগুলো কর্তৃপক্ষ প্রতিযোগিতা দ্বারা মোকাবিলা করছে। যদিও জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বিশ্ব পিছিয়ে রয়েছে, তারপরও ২০১৫ সালের জলবায়ু চুক্তির মাধ্যমে অনেক দেশকে আইন করতে বাধ্য করেছে।
এছাড়া ক্লিন টেকনোলজিতে বেসরকারি বিনিয়োগ আনতেও উদ্বুদ্ধ করেছে।
কিন্তু সব বৈশ্বিক সমস্যা একই ধরনের নয়। এজন্য এ ধরনের কার্যক্রম কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সম্মিলিতভাবে কাজ করার বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে। যখন অনেক পক্ষ একসঙ্গে কাজ করতে চাইবে, তখন সহযোগিতা নিশ্চিত করতে ন্যূনতম স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির বিষয়টি প্রয়োজন হবে। অন্যদিকে এদিক থেকে যারা বিরত থাকতে চায়, তাদের শক্তিশালী প্রণোদনা দেওয়া কিংবা নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি এর প্রতিরোধে লাগানো যেতে পারে।
এখন আমাজনে আগুন লাগার বিষয়টিতে ফিরে যাই। ব্রাজিল ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বার্থ একই ধরনের নয়। ব্রাজিলের জন্য প্রান্তিক কৃষক, বড় কৃষি খাদ্য করপোরেশন ও ভূমির অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাকি বিশ্বের জন্য আমাজনের রেইনফরেস্টের পরিবেশগত ও জীববৈচিত্র্যের বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে সময়ও একটি কারণ, যেখানে দক্ষিণের দরিদ্র দেশগুলোর তুলনায় উত্তরের ধনী দেশগুলো ভবিষ্যৎকে বেশি গুরুত্ব দেয়। যদি ব্রাজিলের সিংহভাগ মানুষও রেইনফরেস্ট সংরক্ষণের দিকে গুরুত্ব দেয়, তাহলেও এটা বিশ্বাস করা প্রয়োজন যে, নৈতিক যুক্তি পরামর্শ এবং এ কাজের দিকে প্রবৃত্ত করানোর মাধ্যমে ব্রাজিল এবং অন্য অংশীদারদের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে নিয়ে আসা সম্ভব।
আমাজনের এই ইস্যুতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো অর্থ ও নিষেধাজ্ঞা। ২০০৮ সালের পর থেকে আমাজন ফান্ডে প্রায় ১০০ কোটি ডলার সরবরাহ করার মাধ্যমে রেইনফরেস্টের পরিবেশগত সেবা রক্ষায় ভর্তুকি প্রদান করেছে নরওয়ে, যে সেবা সমগ্র বিশ্ব ভোগ করছে। যদিও গত মাসে বোলসোনারোর নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভের কারণে এ অর্থ সরবরাহ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। ম্যাখোঁও বাণিজ্য চুক্তি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক চুক্তি করার ক্ষেত্রে ব্রাজিলকে এর প্রাকৃতিক সম্পদ সুষমভাবে রক্ষণাবেক্ষণে বাধ্য করার শর্তারোপ করার কথা বলেছেন।
এই দুটি বিষয়ই সমস্যাবহুল। অর্থ প্রদানের বিষয়টি একটি বড় আশার দুয়ার খুলে বসবে এবং একটি সমঝোতার বিষয়ের প্রয়োজন হবে যে, কে এই বোঝা বহন করবে। প্রতিবছর আমাজনের রেইনফরেস্ট যে পরিমাণ কার্বন শোষণ করে, তা নরওয়ের সরবরাহের তুলনায় শতগুণ বেশি। বলপ্রয়োগের বিষয়টিও কৌশলগত, বনভূমি উজাড় করা এবং বাণিজ্যের মধ্যে একটি তির্যক সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু বিকল্প আর তেমন কোনো পথ না থাকায় এ দুইয়ের মধ্যে কিছু সমন্বয় করে সম্ভবত সমাধানের বিষয়টি বের করতে হবে।
সময়ের এই পর্যায়ে এসে ম্যাখোঁ ও বোলসোনারোর ইস্যুটি শুধু একটি পাদটীকা হতে পারে। তবে বৈশ্বিক যেসব বিষয় জাতীয় সার্বভোমত্বের কারণে উদ্বেগ তৈরি করেছে, তা স্পষ্টতই বাধা সৃষ্টি করতে পারে। সে সমস্যা মোকাবিলায় বিশ্বকে একটি পথ খুঁজে বের করতে হবে।

অধ্যাপক, হার্টি স্কুল অব গভর্ন্যান্স (বার্লিন) এবং ব্রাসেলসভিত্তিক বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ব্রইজেলের সিনিয়র ফেলো

প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে অনুবাদ তৌহিদুর রহমান

সর্বশেষ..