প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু

বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ম্যারিনো রিগন পরিণত বয়সেই মারা গেছেন; তবু তার মৃত্যু আমাদের জন্য বেদনার। পরিচয়ে ফাদার হলেও তিনি ধর্মকর্মেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। মিশে গিয়েছিলেন এদেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও মানব কল্যাণমূলক কাজে। এখানে অক্লান্তভাবে কাজ করতে গিয়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার কাছে হয়ে উঠেছেন একজন প্রিয় মানুষ।

রিগনের জন্ম ১৯২৫ সালে ইতালির ভেনিসের অদূরে ভিল্লাভেরলা গ্রামে। ২৮ বছর বয়সে এদেশে তার আগমন। এরপর বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে স্থায়ী নিবাস গড়েন সুন্দরবন-সংলগ্ন মোংলার প্রত্যন্ত

শেলাবুনিয়া গ্রামে। দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা বিস্তার ও নারীর ক্ষমতায়নে অসাধারণ নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। রিগনের কর্মপরিধির বড় অংশজুড়ে রয়েছে শিক্ষামূলক কার্যক্রম। তার আপ্রাণ চেষ্টায় মোংলার সেন্ট পল্স উচ্চ বিদ্যালয়সহ দক্ষিণাঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয় অন্তত ১৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সুবিধাবঞ্চিত বহু ছেলেমেয়েকে নিরবচ্ছিন্ন পড়াশোনার সুযোগ করে দেন তিনি। নারীকে উদ্বুদ্ধ করেন আত্মকর্মসংস্থানে।

বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতি প্রসারেও বড় ভূমিকা রাখেন রিগন। প্রথম ইতালীয় অনুবাদক হিসেবে গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ ইতালীয় ভাষায় অনুবাদ করেন তিনি। রবীন্দ্রনাথকে ইউরোপের নানা জাতিগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দিতে কাজ করেছেন। পরিবার ও স্বজনদের নিয়ে ইতালিতে প্রতিষ্ঠা করেন রবীন্দ্র অধ্যয়নকেন্দ্র। এর তৎপরতায় ইতালিতে একটি সড়কের নাম হয়েছে রবীন্দ্র সরণি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জসীমউদ্দীন, সুকান্তসহ নামকরা বাঙালি কবিদের অনেক কবিতা, লেখা ইতালীয় ভাষায় অনুবাদ ও প্রকাশ করেন রিগন।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে গোপনে যুদ্ধপীড়িতদের আশ্রয় ও চিকিৎসা দিয়েছিলেন তিনি। এদেশের প্রতি তার ছিল গভীর মমতা। তার শেষ এ ইচ্ছাটি যেন ছিল স্বাভাবিক বাংলার মাটিতে সমাহিত হওয়া। ২০০১ সাল রিগনের হৃদযন্ত্রে অসুস্থতা ধরা পড়লে আত্মীয়স্বজন উন্নত চিকিৎসার্থে ইতালি যাওয়ার অনুরোধ করে তাকে। রিগন তখন বলেন, ‘মরলে বাংলার মাটিতেই মরব’। অবশেষে তিনি রাজি হন এ শর্তে ইতালিতে মৃত্যু হলে মরদেহটি বাংলাদেশে পাঠাতে হবে। স্বজনরা মেনে নেন তার শর্ত। সেখানে অস্ত্রোপচারের আগেও তার মিনতি ছিল, ‘আমার মরদেহ বাংলাদেশে পাঠাবে কিন্তু’।

মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াবে, এটি স্বাভাবিক প্রত্যাশা। তবু আমরা দেখি, মানুষের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করা লোক খুব কম। সেক্ষেত্রে ম্যারিনো রিগন এমন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, যাদের পাশে দাঁড়ানোর আগ্রহ সাধারণত কারও হয় না। উন্নত দেশে জš§গ্রহণ করেও বাংলাদেশের মতো একটি দুর্দশাগ্রস্ত দেশের সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য বলা যায় গোটা জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন তিনি।

আমরাও ম্যারিনো রিগনকে শুধু একজন খ্রিষ্টান ফাদার মনে করিনি। একজন বিদেশি হিসেবেও দেখিনি আমরা তাকে। ২০০৯ সালে এ অকৃত্রিম বন্ধুকে শিক্ষামূলক ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ নাগরিকত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এদেশের মানুষের হƒদয়ে ম্যারিনো রিগন বেঁচে থাকবেন বহুদিন। তার অবদান আমরা স্মরণ করব শ্রদ্ধাভরে আর তা হয়ে থাকবে অনুকরণীয়।